বিন্দু তালুকদার
সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার চোরের উপদ্রব রয়েছে বলে জানা গেছে। গত কয়েক বছর আগে ছাতকের বাতিরকান্দি গ্রামে ট্রান্সফরমার চুরি করতে গিয়ে বিদ্যুতের খুঁিটর উপর ঝলসে গিয়েছিল ছাতক পৌর শহরের বাগবাড়ির এক চোরের শরীর। তারপরও থেমে নেই ট্রান্সফরমার চুরি।
গত এক বছর আগে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের জয়সিদ্ধি বশিয়া খাউড়ি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের তালাবদ্ধ ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছিল। কিন্তু অর্থাভাবে ট্রান্সফরমার কেনা সম্ভব না হওয়ায় এক বছর ধরে বিদ্যুৎহীন রয়েছে বিদ্যালয়টি। তবে ওই একই রাতে পাশের বড়মোহা গ্রাম থেকে আরো দুইটি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছিল।
সরেজমিনে দেখা যায়, দক্ষিণ সুনামগঞ্জের গ্রাম এলাকার ট্রান্সফরমার চুরি ঠেকাতে ৪০ ফুট উঁচু পল্লী বিদ্যুতের খুঁটির উপরে ট্রান্সফরমারকে শেকল দিয়ে তালাবদ্ধ করা রাখা হচ্ছে। উপজেলা সদরের পাশ্ববর্তী তেঘরিয়া গ্রামের রাস্তা দিয়ে আসা-যাওয়া করলে দেখা পাওয়া যায় পাশের ট্রান্সফরমারগুলো শেকল দিয়ে তালাবদ্ধ। তেঘরিয়া গ্রামের লম্বা হাটির শৈলেস দাস ও মতিলাল দাসের বাড়ির সামনে পল্লী বিদ্যুতের লাইনের দুইটি খুঁটিতে তালাবদ্ধ ট্রান্সফরমার দেখা যায়। শুধু ওই দুইটি ট্রান্সফরমার নয় এই এলাকার আরো অনেক ট্রান্সফরমার চুরির ভয়ে একইভাবে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। গ্রাহকরা চাঁদা তুলে শেকল ও তালা কিনে এগুলো সংরক্ষণ করেন।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্রে জানা গেছে, গ্রাম পর্যায়ে একেকটি ট্রান্সফরমারের দাম ৪০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। প্রতিটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমারের ভেতর কপার তার (স্থানীয়ভাবে কয়েল হিসাবে পরিচিত) রয়েছে। এসব তার স্থানীয়ভাবে ৪-৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। তাই চোর চক্র ট্রান্সফরমার চুরি করে ভেতরের কপার তারটি কম দামে বাজারে বিক্রি করে দেয়। তার বের করে ট্রান্সফরমারের বক্সটি ফেলে দেয়। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আইন অনুযায়ী কোন ট্রান্সফরমার চুরি বা খোয়া গেলে গ্রাহক অর্ধেক ও সমিতি থেকে অর্ধেক দাম পরিশোধ করে নতুন ট্রান্সফরমার সংযোজন করা যায়। তাই কোন ট্রান্সফরমার চুরি হলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের ২০-৩০ হাজার টাকা গুণতে হয়।
তেঘরিয়া গ্রামের বাসিন্দা অবনী মোহন দাস বলেন,‘ ট্রান্সফরমার চোরের উপদ্রবে বিভিন্ন গ্রামের মানুষ অতীষ্ট। তাই বাধ্য হয়ে নিজেদের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সুরক্ষার জন্য খুঁটির সাথে ট্রান্সফরমারকে শেকল দিয়ে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। এছাড়া আর অন্য কোন উপায় নেই।’
সুনামগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্রে জানা যায়, সারা জেলায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাভূক্ত সোয়া লাখ গ্রাহক রয়েছে। এসব গ্রাহকদের বিভিন্নভাগে বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্যে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির রয়েছে প্রায় ছোট-বড় ৬ হাজার ট্রান্সফরমার। চুরি ঠেকাতে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি কর্তৃপক্ষ স্থানীয় গ্রাহকদের ট্রান্সফরমার সুরক্ষার জন্য তালাবদ্ধ করে রাখার সুপারিশ ও অনুরোধ করেন।
সুনামগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ১২ নং এলাকা (দক্ষিণ সুনামগঞ্জ) পরিচালক ফরিদুর রহমান বলেন,‘এক সময় আমাদের এলাকায় ট্রান্সফরমার চুরি হত। এখন মোটামুটি নিরাপদ, চুরি অনেকটাই প্রতিরোধ করা হয়েছে। কারণ গ্রাহকরা নিজেরাই ট্রান্সফরমারে তালার ব্যবস্থা করেছেন। গত এক বছর ধরে আর কোন চুরি হয় না। প্রায় এক বছর আগে জয়সিদ্ধি বশিয়া খাউরি উচ্চ বিদ্যালয়ের ট্রান্সফারটি চুরি হয়েছিল। তারা এখনও নতুন ট্রান্সফরমার লাগাতে পারেনি। এরপর নতুন করে এলাকায় ট্রান্সফরমার চুরির কোন খবর পাওয়া যায়নি।’
জয়সিদ্ধি বশিয়া খাউরি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিভাস চন্দ্র বিশ্বাস বলেন,‘ চুরি যাওয়ার ভয়ে আমাদের ট্রান্সফরামরটি আগেই তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু চুরের কবল থেকে সেটা রক্ষা করা যায়নি। প্রায় এক বছর আগে রাতের আঁধারে আমাদের বিদ্যালয়সহ বড়মোহা গ্রাম থেকে আরো দুইটি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছিল। আমাদের ট্রান্সফরমারটির মূল্য ৬০ হাজার টাকা, তাই ৩০ হাজার টাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিকে দিতে হয়। টাকা সংগ্রহ করতে দেরী হওয়ায় এখনও নতুন করে লাগানো হয়নি। এছাড়া চোরের ভয়তো রয়েছেই। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি থেকে বলা হয়েছে এখন লাগানোর পর চুরি হলে পুরো ৬০ হাজারই আমাদের দিতে হবে। তাই আমরা ভাবছি ট্রান্সফরমার বসানোর পর প্রহরীর ব্যবস্থা রাখতে।’
সুনামগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) সোহেল পারভেজ বলেন,‘তুলনামূলকভাবে সুনামগঞ্জ অঞ্চলে ট্রান্সফরমার চুরি অনেকটাই কম। সারা দেশের তুলনায় এই এলাকার অবস্থা এখনও যথেষ্ট ভাল। তবে সভা-সমাবেশের মাধ্যমে গ্রাহকদের মাঝে আমরা সচেতনতা সৃষ্টি করছি। ট্রান্সফরমার চুরির ফলে গ্রামাঞ্চলের সাধারণ গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। কারণ চুরি যাওয়া ট্রান্সফরমার নতুন করে প্রতিস্থাপন করতে হলে নিয়ম অনুযায়ী গ্রাহককে অর্ধেক ও সমিতির অর্ধেক টাকা দিতে হয়। মাত্র কয়েক হাজার টাকার কিছু কপার তারের জন্য অসৎ মানুষরা এসব কাজ করছে।’ এসব কেনা বেচায় ভাঙ্গারী ব্যবসার লোকজন জড়িত থাকতে পারে মন্তব্য করেন তিনি।