বিন্দু তালুকদার
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ডলুরায় পুনরায় স্থল শুল্ক স্টেশন চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। এলক্ষে শুল্ক স্টেশনের প্রাথমিক অবকাঠামো নির্মাণ ও ভবিষ্যৎ কর্ম পরিকল্পনা নির্ধারণের লক্ষে আগামী ২৫ জানুয়ারি সিলেট কাস্টম, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট অফিস সুনামগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের সাথে এক সভা আহবান করেছে।
সিলেট কাস্টম, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট অফিসের কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম গত ১১ জানুয়ারি এক পত্রের মাধ্যমে সুনামগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের সভাপতিকে ওই সভায় উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন।
সিলেট কাস্টম অফিস সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জ অঞ্চলের ডলুরা শুল্ক স্টেশনের বিপরীত পার্শ্বে অবস্থিত ভারত অংশের বালাট স্থল শুল্ক স্টেশনটি চালুকরণের বিষয়টি নিয়ে গত ৮ ও ৯ জুন ভারতে অনুষ্ঠিত জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ অব ট্রেড এর সভায় ডলুরা শুল্ক স্টেশন চালু করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ওই সভায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বিবেচনা করবে মর্মে সিদ্ধান্ত নেয়ায় ডলুরা শুল্ক স্টেশন চালুর লক্ষ্যে স্থল বন্দর কর্তৃপক্ষ, নৌ- পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের সাথে একযোগে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলে মতামত প্রদান করেছেন সিলেট কাস্টম, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট অফিস।
সিলেট কাস্টম অফিস চিঠির মাধ্যমে সুনামগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের সভাপতিকে ডলুরা শুল্ক স্টেশন পুনরায় চালুকরণের লক্ষে প্রাথমিক অবকাঠামো নির্মাণ ও ভবিষ্য’ কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণের সভায় ডলুরা
শুল্ক স্টেশনের সংশ্লিষ্টদের নিয়ে উপস্থিত থাকার অনুরোধ করেছেন।
চিঠির অনুলিপি প্রদান করা হয়েছে, বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক, স্থল বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান,সিলেট চেম্বার অব কমার্স, সুনামগঞ্জ আবগারী ও ভ্যাট বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তাকে।
জানা যায়, সুনামগঞ্জের ডলুরায় ১৯৯৯ সালে একবার পরীক্ষামূলকভাবে এক বছরের জন্য শুল্কবন্দর চালু করতে দুই দেশের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হলেও সীমান্তের ওই পাড়ের আড়াই কিলোমিটার সড়ক নির্মিত না হওয়ায় আমদানী রপ্তানী করা হয়নি। এর মধ্যেই (২০০৮ সালে) সীমান্তের ওপারের সড়ক নির্মাণ এবং এপারে নৌ ও সড়ক পথের সুবিধা হয়েছে।
ইতোমধ্যে সুনামগঞ্জের ডলুরায় কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন পয়েন্ট স্থাপনের সম্ভাব্যতা উল্লেখ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান, পররাষ্ট্র সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব ও নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে আধাসরকারিপত্র দিয়েছেন সুনামগঞ্জের কৃতি সন্তান বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক। ওই চার উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ডলুরায় শুল্কস্টেশন স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে পত্র পাঠান পিএসসির চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক।
প্রসঙ্গত. সুনামগঞ্জের ডলুরায় কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন পয়েন্ট স্থাপনের দাবি দীর্ঘদিনের। কাস্টম এক্সসাইজ ও ভ্যাট কমিশনার’র সিলেট অফিস থেকে এই বিষয়ে এক বছর আগেই ইতিবাচক রিপোর্ট দেওয়া হলেও এর কোন অগ্রগতি হচ্ছিল না।
সুনামগঞ্জের ব্যবসায়ীরা মনে করেন ডলুরায় শুল্কস্টেশন চালু হলে ভারতের মেঘালয়সহ সেভেন সিস্টারস’এ (৭ টি রাজ্যে) এবং বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোর উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত হবে। পাশাপাশি তাদের উৎপাদিত পণ্যও কম খরচে এদিক দিয়ে আমদানী করা যাবে।
সুনামগঞ্জ শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদী পাড় হয়ে ১২ কিলোমিটার দূরেই ভারত সীমান্ত। সীমান্ত পার হলেই ভারতের মেঘালয় রাজ্যের বালাহাট জেলার সীমান্ত। ওপারের সেভেন সিস্টারস’এর সঙ্গে বালাহাটের রয়েছে উন্নত সড়ক যোগাযোগ। এপাড়ে মেঘালয়ের খাসিয়া পাহাড় থেকে নেমে আসা পাহাড়ী নদী চলতি সুনামগঞ্জ জেলা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীতে এসে মিলেছে। অর্থাৎ নদীপথে সারা দেশে মালামাল পরিবহনের সুযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি পৃথকভাবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান, পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক, স্বরাষ্ট্র সচিব কামাল উদ্দিন আহ্মেদ, নৌ-পরিবহন সচিব অশোক মাধব রায়’র নিকট পাঠানো আধাসরকারি পত্রে ড. মোহাম্মদ সাদিক উল্লেখ করেন,‘সুনামগঞ্জ জেলা শহর থেকে কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত সুনামগঞ্জ ও ভারতের বালাহাট সীমান্ত দিয়ে ডলুরায় বর্ডার হাট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হলে জানা যাবে বহুকাল পূর্ব থেকে এই জনপদের লোকজন সুনামগঞ্জ থেকে ডলুরা হয়ে মেঘালয়ের বালাহাটের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে আ্সছিলেন। ১৯৭১’এর মুক্তিযুদ্ধের সময় এই স্থানটি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ডলুরায় ঐতিহাসিক শহীদ মিনার ও স্মৃতিসৌধে বহু মানুষের সমাগমে সারা বছর উৎসবমুখর থাকে। বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ জেলার সঙ্গে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের যোগাযোগে এই ডলুরায় একটি ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস পয়েন্ট স্থাপিত হলে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষের বহুদিনের স্বপ্নপূরণ হবে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ রয়েছে ডলুরায় কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন পয়েন্টের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশ-ই অর্থনৈতিক দিক দিয়ে লাভবান হবে। প্রাচীন প্রাগজ্যোতিষপুর রাজ্য, কামরূপ রাজ্য এবং আসামের মেঘালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ ও ভাটি এলাকার মানুষের হাজার বছর ধরে গমনাগমনের যে ঐতিহ্য আছে, তা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হবে। যা এই দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটি পুনর্যোগাযোগের সূত্র হবে। বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ জেলা তথা ভাটি এলাকার মানুষকে ভারতের মেঘালয়ে যেতে হলে ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে সিলেটের ডাউকি কিংবা জকিগঞ্জের বর্ডার দিয়ে যেতে হয়। যা দীর্ঘদিন থেকে অনেক নারী-পুরুষের জন্য দুর্ভোগের কারণ। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের উৎপাদিত পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে পার্শ্ববর্তী সুনামগঞ্জ তথা বাংলাদেশের হাওড় বিধৌত ভাটি এলাকায়।
অন্যদিকে সুনামগঞ্জের মাছ-সবজীসহ উৎপাদিত পণ্যের চাহিদাও রয়েছে ভারতের মেঘালয় তথা আসামে। পণ্য ছাড়াও পূণ্যলাভের আকাঙ্খাও মানুষের মধ্যে ব্যাপক। ভারতের মেঘালয়ে অবস্থিত হজরত শাহ্ আরেফিন (র.)’এর আসন এবং বাংলাদেশের সুনামগঞ্জে অবস্থিত পূণ্যতীর্থ (পণাতীর্থ) দুই দেশের মুসলমান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের প্রাণে ভক্তির প্লাবন আনে। এই দুটি স্থানে ভক্তদের আসা যাওয়ার জন্যে ডলুরা ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস পয়েন্ট একটি যুগান্তকারী পয়েন্ট হবে।
চিঠিতে ড. সাদিক লিখেছেন, সুনামগঞ্জের ডলুরা পয়েন্ট বাংলাদেশ ও ভারতের জন্য শুধু অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়। দুই দেশের এই দূর সীমান্তের এই ইমিগ্রেশন পয়েন্ট উভয় দেশের মধ্যে একটি যোগাযোগ অবকাঠামোর নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে, এটি দুই দেশের জন্যই কল্যাণকর হবে।
আধুনিক পৃথিবীর নতুন সহ¯্রাব্দে প্রতিবেশী দেশসমূহের মধ্যে যোগাযোগ আরও নিবিড় এবং প্রশস্ত করার জন্যই ডলুরায় কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন পয়েন্ট স্থাপনের গুরুত্ব বিবেচনার জন্য সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের সহৃদয় সহযোগিতা চেয়েছেন পিএসসির চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক।
সুনামগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি খায়রুল হুদা চপল বলেন,‘সুনামগঞ্জ সীমান্তের ডলুরা থেকে চলতি নদী হয়ে ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই নৌ-যোগাযোগ ছিল। নৌ-পথে পরিবহন ব্যয় কম। এছাড়া এখন দুই পাড়েই সড়ক পথ হয়েছে। ডলুরায় শুল্কস্টেশন হলে অর্থনৈতিকভাবে ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ই লাভবান হবে। দুই পাড়ের সীমান্ত এলাকায় শিল্প কারখানাও গড়ে উঠবে। সিলেট কাস্টমস অফিস থেকে আগামী ২৫ জানুয়ারি ডলুরা শুল্ক স্টেশন পুনরায় চালুকরণের লক্ষে প্রাথমিক অবকাঠামো নির্মাণ ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণের সভায় ডলুরা শুল্ক স্টেশনের সংশ্লিষ্টদের নিয়ে উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন। এই শুল্ক স্টেশনটি চালু করার জন্য সুনামগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। বর্তমান সরকারের আমলে আমরা আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। আমরা আশা করছি এটা আবার চালু হবে।’
বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক বলেছেন,‘সুনামগঞ্জসহ দেশের অগ্রগতির বিষয়টি বিবেচনায় এনে এবং সুনামগঞ্জবাসীর প্রতি ভালবাসা থেকেই আমি ডলুরায় শুল্কস্টেশনের দাবি জানিয়েছি। এখানে কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন পয়েন্ট হলে সুনামগঞ্জ থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত পুরো ভাটির জনপদের মানুষ উপকৃত হবে’।