শহীদনূর আহমেদ ও ইয়াকুব শাহরিয়ার
টানা তিন দিনের ভারী বৃষ্টিপাতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ি ঢলে বাঁধ ভেঙ্গে জেলার বিভিন্ন উপজেলার হাওরের ফসল তলিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গত মৌসুমের ন্যায় ফের অকাল বন্যায় ফসল তলিয়ে যাওয়ায় জীবন জীবিকার করুণ পরিণতিতে জেলার কৃষকরা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন। জলাবদ্ধতার পানি আর কৃষকের চোখের পানি একাকার হয়ে নিরব হাহাকার কৃষকদের মাঝে। প্রকৃতির বৈরিতায় অভিযোগের ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন সর্বস্ব হারাতে বসা কৃষকেরা। কত স্বপ্ন ছিলো এ জেলার কৃষকদের মাঝে। স্বপ্ন ছিলো এবারের ফসল ঘরে তুলে আনন্দে সারা বছর কাটাবেন। সেই আনন্দ বৈশাখ না ঢুকতেই ফিকে হতে শুরু করেছে। মনের ভিতরে ঢুকরে কাঁদছে কৃষকেরা, শংকা কোনো ভাবেই পিছু ছাড়ছে না তাদের। যদি এভাবে চলে তাহলে ঋণের বোঝা বাড়বে বৈকি কমবে না। জলাবদ্ধতায় জেলার অনেক হাওরে ফসলে তলিয়ে যাওয়ার সত্যতা স্বীকার করেছেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ পরিচালক। এরকম বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে বলে আশংকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ইতোমধ্যে জলাবদ্ধতায় ডুবে গেছে জেলার কয়েকটি ছোটবড় হাওরের শতাধিক হেক্টর ফসলী জমি। পাহাড়ি ঢলে নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় হাওরের পানি অন্যকোনো রাস্তা দিয়ে
বের হতে পারছে না। ক্রমশ বাড়ছে পানি, যা ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বৃদ্ধি করছে। ডুবায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে কাঁচা ধানের গোড়ায় পচন ধরেছে। ভেঙ্গে পড়ছে হাওরগুলোর হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান। এতে একদিকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ কৃষক, অপরদিকে দেশের খাদ্য চাহিদায়ও ঘাটতি পড়তে পারে বলে আশংকা করেছেন কৃষকরা।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জে জলাবদ্ধতায় তলিয়ে গেছে উপজেলার বেশ কয়েকটি হাওরের বোরো ফসল। কৃষকদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, উপজেলার পাখিমারা হাওর, সংহাই হাওর, নাগডরা, দক্ষিণ হাওর, বড় হাওর, তেছার কোনা, নলুয়ার হাওরের কিছু অংশ, হাসনাবাজ হাওরসহ বেশ কিছু ছোটবড় হাওরে টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে ফসল তলিয়ে গেছে। উপজেলার অন্যতম নদী মহাসিংয়ে পানি আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি হওয়ায় নিষ্কাশন হচ্ছে না ঐ সকল হাওরের পানি। এতে এখনো যে জমি তলিয়ে যায় নি সেসব জমিও পড়েছে মারাত্মক হুমকির মুখে। তাই সব সময় আশংকায় দিন কাটাচ্ছেন এ উপজেলার কয়েক হাজার কৃষক পরিবার। পাখিমারা হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মহিবুর রহমান, আইনুল হক, আমিনুর, হজি মিয়া, বেলাল হোসেনসহ কয়েকজন বলেন- ‘টানা বৃষ্টিতে পাখিমারা হাওর ও বড় হাওরে দুই তিনশ কৃষকের জমি ইতোমধ্যে পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছে। বাড়তি পানি বের হওয়ার সঠিক কোনো ব্যবস্থ্ ানা হওয়ায় পিঁপড়াকান্দি, রাঙামাটি ও দক্ষিণবন্দের অনেক জমি ঝুঁকির মধ্যে আছে। ক্ষেতের একমাত্র ফসল হারিয়ে আমরা এখন নিঃস্ব।’
হাসনাবাজ গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সিরাজ মিয়া জানান- ‘আমাদের এলাকার হাওরগুলোতেও পানি ঢুকে ফসলের ব্যপক ক্ষতি হয়েছে। আমাদের আর কিছুই নেই। সরকার যদি জয়কলস ইউনিয়ন পরিষদ থেকে মির্জাপুর পর্যন্ত তল রাস্তা নামে পরিচিত রাস্তা উঁচু করে তৈরি করতো তাহলে ক্ষতির পরিমাণ কম হতো।’ কৃষক আশিকুর রহমান আশিক জানান-‘মির্জাপুর রাস্তার কালভার্ট বড় করে তৈরি করতো তাহলে পানি নিষ্কাশন হতো বেশি, ক্ষতি হতো কম।’
এদিকে, জামালগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতায় ফসলের ক্ষতি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পাঁকনার হাওর, হালির হাওর, ছনোয়ার হাওর, ডাকুমার হাওর, ঘুড়ি হাওরসহ কয়েকটি হাওরে ফসল তলিয়ে গেছে। উপজেলার কালাইখালী নদীর মুখ ভর্তি হওয়া ও অন্যান্য নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় হাওরগুলোতে জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করেছে। উপজেলার জাবেদ নূর নামের এক কৃষক বলেন- ‘কয়েক দিনের বৃষ্টিতেই আমাদের স্বপ্নের ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অসময়ে ফসল তলিয়ে যাওয়ায় ফসলের আশা ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। প্রতি বছরই ঋণ করে জমি চাষ করি। আর এই ফসল পানির নিচে চলে যায়। যদি এবছর ফসল ঘরে তুলতে না পারি তাহলে আমাদের অস্তিত্ব থাকবে না।’
সদর উপজেলার দেখার হাওর, কাঙলার হাওর ও খরচার হাওরসহ জলাবদ্ধতায় বেশ কয়েকটি স্থানে ফসল তলিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। টানা বর্ষণ যদি না কমে তাহলে হাওরগুলোর অবশিষ্ট জমিগুলোও তলিয়ে যাবে বলে আশংকা করছেন কৃষকরা। ক্ষতিগস্ত হবে কৃষকেরা। উপজেলার দেখার হাওর, কাঙলার হাওর ও খরচার হাওরে এখনো কিছু অবশিষ্ট ফসল আছে যেগুলোতে এখনো আশা জিইয়ে রেখেছেন কৃষকেরা। কিন্তু এতো বৃষ্টি হলে আমাদের এ আশাও আর থাকবে না। কৃষকরা জানান- গত বছরও তারা ঋণ করে জমি চাষ করেছেন। এবছর যদি ফসল ঘরে না তুলতে না পারেন তাহলে দাঁড়ানোর মতো কোনো অবস্থানও আর থাকবে না তাদের।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ পরিচালক জাহেদুল হক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানিয়ে বলেন- ‘ইতোমধ্যে জেলার প্রায় দুই হাজার হেক্টর বোরো ফসলী জমি জলাবদ্ধতা ও বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গিয়েছে। যেভাবে বৃষ্টি হচ্ছে, এর ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বাড়বে।