বিশেষ প্রতিনিধি
প্রায় এক মাস পর স্কুলের পোশাক ছাড়াই শূন্য হাতে বিদ্যালয়ে (আব্দুল আহাদ—সাহিদা চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়) প্রবেশ করছিলেন অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী জামিল হোসেন ও নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সিনহা বেগম। ঢলের পানিতে বসতঘর, ঘরের আসবাবপত্রসহ অন্যান্য সামগ্রীর সঙ্গে এই দুই শিক্ষার্থীর বই, খাতা, কলম, স্কুলব্যাগ ভেসে গেছে। বুধবার স্কুলে প্রবেশের সময় দু’জনেই চিন্তিত ছিল শিক্ষকরা কি বলেন, ধমক খেতে হয় কি-না এই ভাবনায়। স্কুলে প্রবেশের সময় এই প্রতিবেদককে বললো, স্যারদের কাছে, আমাদের অবস্থা জানাতে এসেছি।
বই পাওয়া যাবে, স্কুল ড্রেসও কোনো না কোনভাবে মিলবে, আশ^স্ত করায় দুজনেই ফেল ফেল করে এই প্রতিবেদকের মুখের দিকে চেয়েছিল। তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে স্কুলের বারান্দায় দেখা মিললো, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মানিক মিয়ার সঙ্গে।
সাংবাদিক পরিচয় পেয়েই মানিক মিয়া ১৬ জুন গভীর রাতের বন্যার ভয়াবহতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বললেন, ‘কাঠের দরজা লাগাইল আছিল, তালা দেওয়া দরজা পানির দেক্কায় (ধাক্কায়) কড়ায়াসহ ছুইটট্টা গেছে, গলা সমান পানি, শুক্রবারে আইয়া (এসে) দেখি চেয়ার—টেবিল ভাসতেছে, শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার সামগ্রী, বইপত্র সব শেষ, ঘরের নীচ ভাইঙ্গা (ভেঙে) বালু—মাটি বাইরের দিকে যার, কয়েকটা চেয়ার বাইরে গেছিল, অগুন (এগুলো) ঢুকাইয়া নৌকায় বাড়িত গেছি, নিজেই বাছমু (বাঁচবো) কি—না হউ (সেই) চিন্তায় আছলাম, ইস্কুলে আরেকবার আইতাম (আসতে) পারমু (পারবো) ইটা বুঝছি না, পানি কমতি শুরু অইবার পরে আইয়া কিছু কিছু কইরা শুকাইছি, সবতাঔ নষ্ট অইগেছে।’
নবম শ্রেণির ৬৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে বুধবার এই বিদ্যালয়ে এসেছিল ৩ জন, এরমধ্যে একজনের পরনের কাপড় ছাড়া কিছুই নেই। দশম শ্রেণির ৬১ জনের মধ্যে ছয় জন এসেছে, এরমধ্যে দুই জনের পরিবারের কিছুই নেই, অষ্টম শ্রেণির ৫৬ জনের মধ্যে উপস্থিত ছিল ১০ জন, দুইজনের পরিবারের বসতঘরসহ কিছুই নেই। সপ্তম শ্রেণির ৪৪ জন শিক্ষার্থীর তিনজন এসেছে, এদেরও একজনের পরিবারের কিছুই নেই। ষষ্ট শ্রেণির উপস্থিত সাত জনের দুজনের পরিবারের সবকিছু হারিয়েছে।

বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক রূপক তালুকদার বললেন, স্কুল লাইব্রেরী’র সকল বইই নষ্ট হয়ে গেছে। কমপক্ষে পাঁচ লাখ টাকার বইপত্র ছিল। বিদ্যালয়ের এবং এলাকার অভিভাবক শিক্ষার্থীদের করুণ অবস্থা। পরিবেশ স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শহীদুর রহমান বললেন, কম্পিউটার, লেপটপ, আসবাবপত্র, দরজা, জানালা সবকিছুই ডুবেছিল। শিক্ষার্থীদের অবস্থাও খারাপ। আমরা বিদ্যালয়ে এসেছি, শিক্ষার্থীদের সাহস দিচ্ছি। ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেবার জন্য তালিকা শিক্ষা অফিসে দিচ্ছি আমরা। বিদ্যালয়ের অবকাঠামো মেরামত করাও জরুরি।
বন্যায় এমন ভয়াবহ ধংসযজ্ঞ কেবল একটি বিদ্যালয়ে নয়। পুরো জেলার প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের বৃহৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চর মহল্লা উচ্চ বিদ্যালয়ের এক হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে কমপক্ষে একশ শিক্ষার্থী বইপত্র বন্যায় ভেসেছে দাবি করেছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।
বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মুন্নি, রিমা, মোস্তাক ও তমা জানালো, বইপত্র ও স্কুলড্রেস কেনার সামর্থ তাদের অভিভাবকের নেই। বিদ্যালয়ে এসেছে, স্যারকে (প্রধান শিক্ষককে) বইপত্র ভেসে যাওয়ার কথা জানাতে।
এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অশোক তালুকদার জানালেন, স্কুলের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নষ্ট হয়েছে। আসবাবপত্র ও অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে কমপক্ষে পাঁচ লাখ টাকার।
মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জেলার ২৩১ মাধ্যমিক, ৩৩ টি কলেজ ও ৯২ মাদ্রাসার সবকটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দাবি করে জানালেন, শিক্ষার্থীদের জন্য চট্টগ্রাম থেকে বই আসা শুরু হয়েছে। কাল থেকে বিতরণ শুরু করার চেষ্টা চলবে।