এবিএম ফজলুর রহমান
ভাষা-আন্দোলনের সঙ্গে বাঙালির সংগ্রামীর ঐতিহ্য ও গভীর আবেগ জড়িত। বায়ান্নতে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর, ওহিউল্লাহ, আউয়ালসহ অনেকে। এ বছর ভাষা-ভাষা-আন্দোলনের সত্তর বছর পূর্ণ হলো। ভাষা-আন্দোলনের সবচেয়ে বড় অর্জন স্বাধীন বাংলাদেশ। বাঙালির অহঙ্কারের একুশে ফেব্রুয়ারি বর্তমানে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা লাভ করেছে। ভাষা-আন্দোলনের নানাদিক নিয়ে অনেক লেখালেখি ও গবেষণা হয়েছে। নাটক, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, কবিতা, গান সবই রচিত হয়েছে এ আন্দোলনকে ঘিরে। ভাষাসংগ্রামীরা যেমন এ আন্দোলন নিয়ে স্মৃতিচারণামূলক লেখালেখি করেছেন, তেমনি বিভিন্ন গবেষকগণ রচনা করেছেন গবেষণাগ্রন্থ। বদরুদ্দীন উমর, আহমদ রফিক, বশীর আলহেলাল, সফর আলী অকন্দ, প্রিন্সিপ্যাল আবুল কাসেম, গাজীউল হক, আবদুল মতিন, এম আর আখতার মুকুল, আনিসুজ্জামান, রফিকুল ইসলাম, আতিউর রহমান, এম এ বার্নিক, মোসতফা কামাল, এম আর মাহবুব, মামুন সিদ্দিকীসহ অনেকেই এ নিয়ে গ্রন্থ লিখেছেন। নতুন প্রজন্মের গবেষকগণও ভাষা-আন্দোলন নিয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন। এখানে তুলে ধরবো একালের এক ভাষা-আন্দোলন গবেষক, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম আবদুল আলীমের কথা, যিনি একের পর এক গ্রন্থরচনা করে উন্মোচন করছেন ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসের অনালোকিত দিগন্ত। তিনি দুষ্প্রাপ্য ও অনালোকিত তথ্যের আলোকে গভীর অনুসন্ধানী দৃষ্টি দিয়ে রচনা করে চলেছেন ভাষা-আন্দোলন বিষয়ক নানা গ্রন্থ। এ ছাড়া নিজগ্রাম পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার গৌরীগ্রামে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘ভাষা-আন্দোলন গবেষণাকেন্দ্র’, যেখানে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করেছেন ভাষা-আন্দোলন বিষয়ক বহু গ্রন্থ, পত্র-পত্রিকা, আলোকচিত্র এবং দলিলপত্র। ভাষা-আন্দোলন নিয়ে এবারের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তাঁর তিনটি গ্রন্থ; সেগুলো হলো : ‘রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন : জেলাভিত্তিক ইতিহাস’, ‘রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনে রফিকুল ইসলাম’ এবং ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে ছাত্রলীগের ভূমিকা’। এ বিষয়ে তাঁর অন্য গ্রন্থগুলো হলো-‘ভাষা-আন্দোলন-কোষ’, ‘পাবনায় ভাষা-আন্দোলন’, ‘সিরাজগঞ্জে ভাষা-আন্দোলন’, ‘ভাষাসংগ্রামী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্’, ‘ভাষাসংগ্রামী এম এ ওয়াদুদ’, ‘বঙ্গবন্ধু ও ভাষা-আন্দোলন’, ‘আওয়ামী লীগ ও ভাষা-আন্দোলন’, ‘ভাষা-আন্দোলনে ছাত্রলীগ : কতিপয় দলিল’, ‘ভাষা-আন্দোলনে শেখ মুজিব : কতিপয় দলিল’ প্রভৃতি।
ভাষা-আন্দোলন নিয়ে তাঁর উল্লেখযোগ্য ও ব্যতিক্রমী গ্রন্থ ‘ভাষা-আন্দোলন-কোষ’। গ্রন্থটি ২০২০ সালে কথাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়, যেটির মুখবন্ধ লিখেছিলেন জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। ভাষা-আন্দোলন নিয়ে এটিই প্রথম কোষগ্রন্থ। ভাষা-আন্দোলনের ঘটনা, ভাষাশহীদেরা, এর পক্ষ-বিপক্ষের ব্যক্তিবর্গ, স্মৃতিবিজড়িত স্থান, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, পত্র-পত্রিকা, দুষ্প্রাপ্য ও দুর্লভ ছবি; এক কথায় ভাষা-আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত যাবতীয় বিষয় এ গ্রন্থে তুলে ধরা হয়েছে। কয়েক খণ্ডে পরিকল্পিত বৃহৎ পরিসরের এ গ্রন্থের দুটি খ- রচনা সম্পন্ন হয়েছে। আহমদ রফিক এটিকে ধ্রুপদী চরিত্রের গ্রন্থ বলে অভিহিত করেছেন। পবিত্র সরকার, শামসুজ্জামান খান, হাসান আজিজুল হক, কামাল লোহানী, আবুল আহসান চৌধুরী গ্রন্থটির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। পবিত্র সরকার বলেছেন : ‘এই কোষের যতখানি আমি দেখেছি, তাতে একটি পূর্ণাঙ্গ কোষগ্রন্থে যা যা থাকা দরকার তার কিছুই ড. আলীমের মনোযোগ এড়িয়ে যায়নি। ঘটনা, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি (তাঁরা পক্ষে-বিপক্ষে যেখানেই থাকুন), ঘটনাস্থল (নগর, গ্রাম, জেলা, অঞ্চল), নানা দেশের ভূমিকা, পত্রপত্রিকা, সংকলন, ছোটদের ও বড়দের দৃষ্টিভঙ্গি কী নেই এই কোষগ্রন্থে?’ ভাষা-আন্দোলন নিয়ে এম আবদুল আলীমের আরেকটি ব্যতিক্রমী ও প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন : জেলাভিত্তিক ইতিহাস’। এতদিন ভাষা-আন্দোলন নিয়ে যেসব গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোতে প্রধানভাবে স্থান পেয়েছে ঢাকাকেন্দ্রিক ভাষা-আন্দোলন। দু-একটি গ্রন্থ জেলাভিত্তিক ইতিহাস স্থান পেলেও তাতে রয়েছে তথ্যের অপ্রতুলতা। এম আবদুল আলীম বিপুল তথ্যসম্ভারে তাঁর রয়েল সাইজের ১২০০ পৃষ্ঠার গ্রন্থটিতে সর্বপ্রথম ব্যাপক ও বিস্তৃত পরিসরে ভাষা-আন্দোলনকে তুলে ধরেছেন। বিভিন্ন জেলার স্থানিক বৈশিষ্ট্য, রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা, আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট প্রভৃতি বিষয়ের সন্নিবেশে রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের জেলাভিত্তিক ইতিহাস তুলে এনেছেন। ৩০০০ টাকা মূল্যের এ বইটি প্রকাশ করেছে আগামী প্রকাশনী।
ভাষাসংগ্রামী গ্রন্থমালা সিরিজে তিনি বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন; যা মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থটি হলো ‘বঙ্গবন্ধু ও ভাষা-আন্দোলন’। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত এ বইটিতে বঙ্গবন্ধুর ভাষা আন্দোলনে অবদান সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে উঠে এসেছে। এছাড়া ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, এম এ ওয়াদুদ, রফিকুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ প্রমুখের ভাষা-আন্দোলনে অবদান নিয়ে তিনি স্বতন্ত্র গ্রন্থরচনা করেছেন। ভাষা-আন্দোলনের সময়কার রাজনৈতিক দল, ছাত্র ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নিয়ে তিনি বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এখন রচনায় হাত দিয়েছেন কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ফেডারেশন, গণতান্ত্রিক যুবলীগ, পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ তথা ভাষা-আন্দোলনে বামপন্থিদের অবদান-সম্বলিত গ্রন্থ। এ পর্যন্ত যে কাজটি রাষ্ট্রীয় বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে করা সম্ভব হয়নি সেই দুঃসাধ্য কাজ অর্থাৎ ভাষাসংগ্রামীদের তালিকা প্রণয়ন ও পরিচিতি নিয়ে গ্রন্থরচনার কাজেও তিনি হাত দিয়েছেণ। ইচ্ছা আছে খণ্ডে খণ্ডে ভাষা-আন্দোলনের দলিল সংকলনের। ভাষা-আন্দোলন গবেষণা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন : ‘ভাষা-আন্দোলন আমাদের আত্মপরিচয়ের সন্ধান দিয়েছে, জাতি হিসেবে বাঙালিকে বিশ্বদরবারে মাথা তুলে দাঁড়াবার শক্তি দিয়েছে। এ আন্দোলন নিয়ে ব্যাপকভিত্তিক গবেষণার এখনও পর্যাপ্ত সুযোগ রয়েছে। আমি গত এক যুগ সে কাজটিই করে চলেছি। কতটুকু সফল হয়েছি, তা নিয়ে কিছু বলতে চাই না, তবে এটুকু বলতে পারি যে, আমি গভীর অনুসন্ধানে বৃহৎ ক্যানভাসে ভাষা-আন্দোলনকে তুলে ধরার ব্রত নিয়েছি। পূর্বসূরিদের ঐতিহ্য শিরোধার্য করে নতুন ও দুষ্প্রাপ্য তথ্যের আলেঅকে ভাষা-আন্দোলনকে তুলে ধরা প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। কী ধরনের কাজ হচ্ছে গবেষক, পাঠক এবং মহাকালই তা বিচার করবে।’
এম আবদুল আলীমের জন্ম পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার প্রত্যন্ত গৌরীগ্রামে। পিতা আবদুল কুদ্দুস, পল্লিচিকিৎসক; মাতা জাহানারা বেগম, গৃহিণী। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম স্থান এবং স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় লাভ করেন প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান। বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। বর্তমানে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপনা করছেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান এবং মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ভাষা-আন্দোলন গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৪ সালে লাভ করেন ‘কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার’। এছাড়া নানা পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। ভাষা-আন্দোলন ছাড়াও বাংলা ভাষা, সাহিত্য, লোকসংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ প্রভৃতি বিষয়ে রচনা করেছেন তিরিশের অধিক গ্রন্থ। তিনি এক পুত্র এবং এক কন্যার জনক; স্ত্রী শবনম মোস্তারী খানম। ঢাকার বাইরের ভাষা আন্দোলন নিয়ে তার লেখায় মফস্বলের ভাষা সংগ্রামীদের আগামী প্রজন্মের কাছে নতুন করে পরিচিত করেছে।
লেখক : এবিএম ফজলুর রহমান, স্টাফ রির্পোটার দৈনিক সমকাল এবং এনটিভি, পাবনা এবং সভাপতি পাবনা প্রেসক্লাব।