- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

ঢাকা সিটি নির্বাচনে ভোটারদের অনাগ্রহ কেন?

ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের বিজয় অর্জন করা কোনো আশ্চর্যজনক ঘটনা নয়। বরং এই বিজয়টিই ছিল স্বাভাবিক। নির্বাচিত মেয়ররা যে দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন সেই দল অর্থাৎ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বর্তমান মেয়াদের মাত্র ১ বছর অতিক্রম করেছে। এই মেয়াদে দলটি আরও চার বছর ক্ষমতায় থাকবে। সুতরাং ঢাকার মানুষ এমন ব্যক্তিকেই মেয়র নির্বাচিত করবেন ক্ষমতাসীন দলের সাথে যাঁর সংযোগ রয়েছে। কারণ সকলেই জানেন উন্নয়নের জন্য সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা অপরিহার্য। বরং আশ্চর্যের বিষয় হল, রাজধানীর মত একটি সুবিধাজনক এলাকায় অবাক করার মতো কম ভোটার উপস্থিতি। নির্বাচনের দিন শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার প্রদত্ত ভোটের হার মোট ভোটের ৩০ শতাংশের বেশি নয় বলে মন্তব্য করেছিলেন। ভোট গণনা শেষে জানা গেল এই হার শতকরা ২৯ ভাগ। রাজধানীবাসীর ভোটের প্রতি এই অনীহার বিষয়টি শনিবারের প্রধান আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়। অনেকেই ভোটের প্রতি ভোটারের আস্থা হ্রাস পাওয়ার বিষয়ে গবেষণা পরিচালনারও আহ্বান জানিয়েছেন। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে ভোটের প্রতি জনআস্থা ও আগ্রহ গড়ে তোলা আবশ্যকীয় বলে তাঁরা মন্তব্য করেছেন। যদিও স্বল্প ভোটার উপস্থিতির বিষয়ে দিন ও রাতভরই অনেক আলোচক নানা যুক্তি উপস্থাপন করে টিভি পর্দাকে সরব করে রেখেছিলেন তবুও হঠাৎ করে ভোট প্রয়োগের এই আশঙ্কাজনক নি¤œহারের সর্বজনগ্রাহ্য উত্তর কেউই দিতে পারেননি।
গণতন্ত্র ও উন্নয়ন এখন পরস্পর বিরোধী অবস্থানে চলে যাচ্ছে বলে অনেকেই বলে থাকেন। উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্র অপরিহার্য কিনা এ নিয়েও তুমুল বিতর্ক চলতে পারে। কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যতক্ষণ পর্যন্ত প্রচলিত থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত তো ওই পদ্ধতির উপরই আস্থা রাখতে হবে। গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা টিকিয়ে রাখতে হলে নির্বাচন নিয়ে ভোটার আগ্রহ থাকা বাঞ্ছনীয়। রাজনীতি ও নির্বাচন নিয়ে যদি সাধারণ ভোটাররা অনাগ্রহী ও নিস্পৃহ হয়ে উঠেন তাহলে এর ফল কখনও ভাল হতে পারে না। জনপ্রতিনিধি যদি ভোটের উপর নির্ভরশীল না থাকেন তাহলে তিনি জনবিচ্ছিন্ন হতে বাধ্য। এতে জনগণের প্রতি জনপ্রতিনিধির জবাবদিহিতার অভাববোধ তৈরি হয়। একসময় স্বল্প ভোটে নির্বাচিত ব্যক্তি নিজেকে সবকিছুর উর্ধ্বে ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার এই সংকটটি ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। এই সংকট মোকাবিলা করে নির্বাচনকে জনপ্রিয় অবস্থায় ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব রাজনীতিবিদদেরই।
ঢাকা সিটি নির্বাচন নিয়ে বিএনপি বক্তব্যে অনেক অভিযোগ করলেও কার্যত নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রগুলোকে ঘিরে তাদের তৎপরতা ছিল একেবারেই হতাশাজনক। যে কারচুপির অভিযোগ তারা জোরোশোরে তুলেছেন তা প্রতিহত করতে রাজপথে তাদের কাউকেই খোঁজে পাওয়া যায়নি। এমন নিরুপদ্রপ পরিবেশে প্রতিপক্ষ যদি সুযোগ নিয়েও থাকে তাতে বিএনপি নিজেদের ব্যর্থতাকে আড়াল করতে পারবে না। ইতিহাস শিক্ষা দেয়, জাতীয় রাজনৈতিক সংকটে রাজনৈতিক দলগুলোই আদর্শ পরিস্থিতি তৈরিতে অগ্রগামী ভূমিকা রাখে। বিএনপির অভিযোগ মতে নির্বাচনে নানা প্রকারের কারচুপি হয়ে থাকলে সেটি প্রতিহত করা অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল হিসাবে তাদেরই দায়িত্ব। নিজেরা নিরাপদ অবস্থানে থেকে সবকিছুর দায়িত্ব সাধারণ মানুষের উপর চাপিয়ে দেয়া আর প্রতিপক্ষকে দোষারোপ করে আর যাই হোক নিজেদের অবস্থানকেই কেবল দুর্বল থেকে দুর্বলতর করা যায়।
আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, মানুষ রাজনীতির প্রতি ক্রমশ আগ্রহ হারাচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে অর্থনীতির তেজিভাব, ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকা-, সংঘাত-সংঘর্ষহীন স্থিতিশীল পরিবেশ; প্রভৃতি মিলিয়ে সাধারণ মানুষ এক ধরনের স্বস্তিতে রয়েছেন। তারা রাজনৈতিক কর্মকা-ের চাইতে অর্থনৈতিক কর্মকা-ে জড়িত থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করছেন। উন্নত বিশ্বের বহু দেশেও সাধারণ মানুষের এমন রাজনৈতিক অনাগ্রহ লক্ষণীয়। এই জায়গায় উন্নয়ন ও গণতন্ত্রকে বিপরীতে মেরুতে ফেলে দেয়।
সবকিছু মিলিয়ে আমরা গণতন্ত্র ও উন্নয়নÑ দুই ধারাকেই সমান্তরাল ও শক্তিশালী অবস্থানে দেখতে আগ্রহী।

  • [১]