- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

তদন্তেও সত্যতা মিলেছে

বিশেষ প্রতিনিধি
শাল্লা উপজেলায় মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপহার গৃহহীনদের গৃহ নির্মাণে অনিয়মের বিষয়টি জাতীয়ভাবেও আলোচিত হচ্ছে। ঘর নির্মাণে অনিয়মের জন্য যে ক’জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, এরমধ্যে শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল মুক্তাদীর হোসেন একজন। জেলা প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশনার এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে করা তদন্তেও অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। শনিবারও ওখানে সরেজমিনে পরিদর্শনে গেছেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মো. ফজলুল কবীর ও সুনামগঞ্জের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মো. জাকির হোসেনসহ চার কর্মকর্তা।
নি¤œমানের ইট, বালু, পাথর ব্যবহার, ঘর নির্মাণের মালামাল পরিবহনের টাকা গৃহহীনদের উপর চাপিয়ে দেওয়া, মিস্ত্রির টাকা গৃহহীনদের দিতে বাধ্য করাসহ নানাভাবে অসহায় মানুষজনের কাছ থেকে টাকা নেবার অভিযোগের সত্যতা মিলেছে দফায় দফায় করা তদন্তে। সম্প্রতি তৈরি করা অসংখ্য ঘরে বড় আকারের ফাটলও দেখা দিয়েছে এই কারণে ক্ষুব্ধ প্রকল্পের উর্ধ্বতনরা।
সুনামগঞ্জের শাল্লার ১৪৩৫ গৃহহীন পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর উপহার গৃহ নির্মাণ করে দেবার কথা প্রথম পর্বেই।
জানা যায়, গেল ২৩ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথম পর্যায়ের উপহারের ঘরের উদ্বোধনের সময় শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যে পরিমান ঘরের কাজ শেষ হয়েছে দেখান, বাস্তবে জেলা প্রশাসক সেই পরিমান ঘরের কাজ শেষ দেখতে পান নি। এরপরই অনিয়মের বিষয়টি সামনে আসে।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে একজন সহকারি কমিশনারকে ওখানে নিয়োগ দেওয়া হয় দ্রুত কাজ সম্পন্ন করতে সহযোগিতার জন্য। বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে একজন সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে ওখানে সংযুক্তি দেওয়া হয়। এরপরও ঘরের কাজে থেমন কোন অগ্রগতি হয় নি।
এই কর্মকর্তারা ওখানে যোগদানের আগেই ১৪০ টি ঘর ডিজাইন পরিবর্তন করে নির্মাণ করা হয়। ৬ টি ঘর অন্য উপজেলায়, ৬ টি ঘর ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গায়, ১৫৩ টি ঘর পূর্বে বন্দোবস্ত দেওয়া ভূমিতে, ৫৮ টি ঘর পানি উন্নয়নের বোর্ডের জমিতে নির্মাণ করা হয়।
ঘরের কাজ শেষ হতে না হতেই বেশ কিছু ঘরে দেখা দেয় বড় বড় ফাটল। ব্যবহারের আগেই কোনো কোনো ঘরের রান্নাঘর ও বাথরুমের অংশ ধসে পড়ে। খসে পড়ে দরজা জানালাও। উপজেলার ভেড়াডহর, সেননগর, আটগাঁও, মুজিবনগর সহ বেশ কয়েকটি গ্রামে কয়েক’শ ঘর নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম হয় ।
উপজেলার বাহাড়া ইউনিয়নের ভেড়াডহর গ্রামের প্রধানমন্ত্রীর উপহারের সুবিধাভোগী বেনু বৈষ্ণব বলেন, ঘরের কাজ এখনো শেষ হয় নি। সড়কে থাকছি এতদিন। এখন অন্যের বাড়িতে গেছি। আমরা যে কষ্টের মাঝে পড়ছি ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়।
এই গ্রামের নগেন্দ্র বৈষ্ণব বলেন, আমি গরিব মানুষ। টুকরি দোকানদারি কইরা খাই। এই কয়টা মাস আমার ৩টা ছোট বাচ্চা লইয়া সীমাহীন কষ্ট করছি। আমার ঘরের সামনের অংশ ফাইট্টা গেছে। এখন জোড়াতালি দিতাছে। আমি মানতাম নায়। এই ঘর ভাইঙা পড়বে? আমার ঘর আবার নতুন কইরা বানাইয়া দেউক।’
শাল্লা সদরের অদূরে শান্তিপুর গ্রামের মানিক মিয়া বললেন, শান্তিপুর গ্রামের খায়রুল মিয়া ও রুবেল মিয়ার ঘরে বড় ফাটল দেখা দিছে।
মেঘনাপাড়া গ্রামের রাজকুমার দাস বললেন, ঘর করার সময় মালামাল সব নিজের টেকায় আনছি, মিস্ত্রির খরচ, মিস্ত্রিকে এক মাস খাওয়ানো, রড সব নিজের টেকায় কিনছি, সব মিলাইয়া টেকা দিছি প্রায় ৩০ হাজার, মেম্বারে কয়দিন আগে মালামাল আনার পরিবহন খরচ ৪ হাজার, পরে আরও ৫০০সহ মোট সাড়ে ৪ হাজার টাকা ফেরৎ দিছে, কইছে ইউএনও সাবে টেকা ফেরৎ দিছইন।
শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল মুক্তাদীর হোসেন বলেন, গৃহহীনদের ঘর নির্মাণে অন্যান্য উপজেলা এবং শাল্লার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। অন্য উপজেলায় ঠিকাদাররা গৃহনির্মাণ করেছে। এই উপজেলা প্রত্যন্ত হওয়ায় এখানে বেশিরভাগ উপকারভোগীরা মালামাল পরিবহন করেছে। পরিবহনের বরাদ্দ শুরুতে আসে নাই, এজন্য দিতে পারি নাই, পরে এসেছে এবং ১৪৩৫ ঘরের প্রত্যেককেই চার হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ৫৭ লাখ ৪০ হাজার টাকাই গেল ৬ জুন গৃহহীনদের দিয়েছি ।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন,‘আমি যোগদানের আগেই এই জেলায় বরাদ্দ পাওয়া ৩ হাজার ৯০৮ ঘরের মধ্যে এক হাজার ৫৮১ টি উপহারের ঘর শাল্লায় প্রদান করা হয়। গত ৩রা জানুয়ারি সুনামগঞ্জে যোগদান করি আমি, যোগদান করার ১৫ দিনের মধ্যেই শাল্লায় ঘর নির্মাণের অগ্রগতি নিয়ে সন্দেহ হয়। পরে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় এই উপজেলার উপহারের ঘর নির্মাণ নিয়ে নেতিবাচক সংবাদ হয়। এরপর বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে জেলা প্রশাসনের সকল কর্মকর্তা, জেলার ১১ উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সকল সহকারি কমিশনারগণকে নিয়ে আমরা ওখানে গিয়ে বিভিন্ন ভাগে ভাগ হয়ে প্রত্যেকটি ঘরে যাওয়ার চেষ্টা করি। পরবর্তীতে একবার ওখানে ২৮ জন, আরেকবার ২০ জন কর্মকর্তাসহ ৪ বার আমরা ওখানে যাই। কাজের অসঙ্গতি সংশোধনের উদ্যোগ নেই। গণমাধ্যমে সংবাদ দেখে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও ৩ সদস্যের তদন্ত টিম আসেন। তারাও অনেকগুলো ঘরের অনেক বিষয় সংশোধন করার কথা বলেন। শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ত্রুটি বিচ্ছুতি সংশোধনের পত্র দিয়ে, কেন তিনি ত্রুটি করলেন এবং ডিজাইন পরিবর্তন করে ঘর করলেন ব্যাখ্যা তলব করা হয়। এক পর্যায়ে তিনি গরিব মানুষকে ঘরের মালামাল পরিবহনের টাকা ফেরৎ দিয়েছেন মর্মে মাস্টার রোল দাখিল করেন। আমরা তাকে শোকজ করি। তিনি শোকজের জবাব দিয়েছেন। জবাবসহ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি পাঠিয়েছি।

  • [১]