- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

তদবিরের চাপে মাঠ প্রশাসন প্রসঙ্গে

ইকবাল কাগজী
গত শুক্রবারের (১১ সেপ্টেম্বর ২০২০) সমকালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে । প্রতিবেদনটির শিরোনাম : ‘তদবিরের চাপে মাঠ প্রশাসন’। প্রশাসন এরকম তদবিরের চাপে ছিল এবং আছে, বলা যায়, সেই আদ্যিকাল থেকেই। তবে চাপে পড়ে যে চিড়েচেপ্টা হয়ে যায়নি বরং শরীরস্বাস্থ্যে নাদুসনুদুস হয়েছে তার অনেক নিদর্শন আশেপাশেই বাগানে প্রস্ফোটিত পুষ্পের মতো কী চমৎকার সুশোভিত হয়ে আছে, যে-কেউ ইচ্ছে করলেই অবলোকন করে নয়নমন সার্থক করে তুলতে পারেন।
একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। বাংলা ট্রিবিউনের ৪ ডিসেম্বর ২০১৯-এর একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম, ‘কোটিপতি পিয়ন !’ সংবাদে বলা হয়েছে, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর সাবরেজিস্ট্রে অফিস সহকারী (পিয়ন) ইয়াসিন মিয়া সব মিলিয়ে বেতন পান ২৮ হাজার ৭৭৫ টাকার মতো। অথচ জেলা শহরে তার নামে তিনটি বাড়ি রয়েছে। বেনামে রয়েছে একাধিক ফ্লাটসহ বিপুল পরিমাণ সম্পদ। শুধু শহরে থাকা তার সম্পদের আনুমানিক মূল্য ৪-৫ কোটি টাকা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবরেজিস্ট্রি অফিসের একাধিক কর্মচারি জানিয়েছেন, অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমেই পিয়ন পদে চাকরি করে বিপুল পরিমাণ ধন-সম্পদের মালিক হয়েছেন ইয়াসিন। অডিটে ইয়াসিনের কোটি কোটি টাকা অনিয়মের বিষয়টি প্রকাশের পর থেকেই তিনি পলাতক রয়েছেন।’
এখন প্রশ্ন হলো, এই আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার নিষিদ্ধ প্রকরণ কীভাবে এই সমাজে সিদ্ধ হলো, যেখানে আইন করা আছে, অবৈধ উপায়ে কেউ উপার্জন করতে পারবে না, এই কাজে ব্যাপৃত হলেই সরকারের নির্দিষ্ট প্রশাসনিক বিভাগ কতৃক প্রতিকাতিরোধ (প্রতিকার+প্রতিরোধ) করা হবে এবং ক্ষেত্রবিশেষে কৃত অপরাধের জন্যে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। অথচ একজন ঠিকই অবৈধ উপায়ে বিপুল ধনসম্পদ উপার্জন করে শেষে ধরা পড়ার ভয়ে পালিয়ে গেছেন। সংবাদ বলছে, এই ইয়াসিনের অপরাধমূলক কাজে ব্যাপৃত থাকার বিষয়ে ‘নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক’ সাধারণ লোকেরা জানত, যারা কারও অপরাধমূলক কাজের অনুসন্ধানে কোনও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ব্যাপৃত থাকার জন্যে বৈতনিক ভারপ্রাপ্ত নয়। কিন্তু অপর দিকে আইনের লোকেরা কি এই ইয়াসিনের অপরাধমূলক কাজের বিষয়ে জানত না, যারা প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক মানুষের অপরাধমূলক কাজের সন্ধান করা এবং তার প্রতিকাতিরোধের ব্যবস্থা করার কাজে বৈতনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত ? যেখানে প্রতিকার ও প্রতিরোধ হওয়ার কথা সেখানে প্রতিকার কিংবা প্রতিরোধ কীছুই হয় নি, অপরাধ সংঘটিত হয়েছে অবাধে। এর তাৎপর্যটা একটু খতিয়ে দেখা বোধ তরি অসমীচীন হবে না।
আমাদের সমাজে কোনও অপরাধ সংঘটনের আগে সে-টাকে প্রতিহত করার সামাজিক নিয়মবিধির প্রয়োগপরিপ্রেক্ষিত বিশ্লেষণে তিনটি পক্ষ পরিলক্ষিত হয়। এই নিরীখে সমাজে তিন ধরণের মানুষ থাকে। অপরাধী, অপরাধ নিরোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত বৈতনিক ও অপরাধ নিরোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত নয়। অপরাধ সমাজবিরোধী কর্ম। ব্যক্তির যে-কাজকে সমাজ রহিত করে রেখেছে তাই অপরাধ। ইসলামী সমাজে নারীপুরুষের বিবাহবহির্ভূত শারীরিক সম্পর্ক রহিত করে রাখা হয়েছে বলে সেটা
অপরাধ। আবার পাশ্চাত্যের অধিকাংশ রাষ্ট্রে বিবাহবহির্ভূত যৌনসম্ভোগ রাষ্ট্রানুমোদন সাপেক্ষে রহিত নয় বলে অপরাধ নয়। আমাদের সমাজে বৈধ আয়ের বিপরীতে আয়বহির্ভূত সম্পদ রাষ্ট্রানুমোদিত নয় বলে বৈধ নয়। ঘোষের টাকা আয়বহির্ভূত সস্পদ সৃষ্টি করে। ঘোষের টাকা রাষ্ট্রানুমোদিত নয় বলে ঘোষগ্রহণ একটি আইনত দ-নীয় আপরাধ। ইয়াসিনের বেতন তাঁর উপার্জিত আয়। এই বেতন বা উপার্জিত আয় থেকে তাঁর সম্পদের পুঞ্জিভবনের বহরটা যেমন ছোট হওয়া স্বাভাবিক সে-টা তেমন ছোট নয়, বরং সেটা অস্বাভাবিক বেশি বড় এবং সম্পদের এই বেশি হওয়াটা প্রতিপন্ন করে যে, তাঁর উপার্জিত আয় অন্তত শত গুণ বেশি হওয়া দরকার, কিন্তু ইয়াসিনের ক্ষেত্রে, অর্থাৎ তাঁর চাকরি থেকে আয়ের পরিমাণটা নিতান্ত কম। সুতরাং সহজেই প্রতিপন্ন হয় যে, ইয়াসিন আয়বহির্ভূত সম্পদ আহরণ করেছেন, তাই তিনি এতো টাকা কিংবা এতো সম্পদের অধিকারী। সমাজ গজিয়ে উঠা বাস্তব এই প্রপঞ্চটিকে লক্ষ্য করেছে এবং বিবেচনাও করেছে, প্রতিকার করতে সচেষ্ট হয়েছে, বিবেচনা করে আইন প্রণয়ন করেছে। কিন্তু এই সমাজটা পুঁজিবাদী, দুর্বলতাটা এখানেই। পুঁজি যে-সমাজে কার্যকর থাকে, সে-সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করে পুঁজিই, সেখানে ব্যক্তির নি¤œপর্যায় থেকে রাষ্ট্রীয় উচ্চপর্যায় পর্যন্ত সর্বত্র নির্বিচারে সম্পদ আহরণ প্রাধান্য পায়। সে-জন্য দখল-বেদখল, প্রতারণা, খুন এবং এমনকি দাঙ্গা-যুদ্ধ পর্যন্ত সংঘটিত হয়, বলতে গেলে কালের প্রেক্ষিতে যা অনিবার্য হয়ে উঠে।
ধর্মীয়, নৈতিক, রাজনৈতিক-সামাজিক চর্চা ও কোনও ঘোষণা কিংবা প্রতিশ্রুতির পেছনে কোনও না কোনও শ্রেণির স্বার্থ বিদ্যমান থাকে। সমাজ আইন প্রণয়ন করে এবং কার্যত সে-আইনটা শ্রেণিবিভিক্ত সমাজের বাস্তব পরিসরে সকল স্তরশ্রেণির মানুষের সমকল্যাণে কার্যকর হয় না এই জন্য যে, আইনেরও একটা শ্রেণিচারিত্র্য থাকে এবং সে-শ্রেণিচারিত্র্যটা সমাজে অধিপতি শ্রেণির আনুকূল্য করে। কারণ আইন প্রণেতা তারাই। প্রতিটি সমাজে সমাজকে শাসনশোষণ করার স্বার্থেই আইন প্রণয়ন করা হয়ে থাকে। বলা হয়, আইন আইনের পথে চলে। আসলে আইন তার নিজের গতিতে চলে না, আইনকে চালানো হয়, অধিপতি শ্রেণি সবসময় আইনের লাগাম ধরে থাকে। উদাহরণ উপস্থিত না করেও বলা যায়, সমাজে তার প্রচুর নিদর্শন পরিলক্ষিত হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতেই সমাজপ্রগতির গতি থেমে পড়তে থাকে এবং গতি শেষ পর্যন্ত স্থবিরতায় পর্যবসিত হয়। সে-স্থবিরতাকে গুঁড়িয়ে দিতে হয়, কালে কালে বিদ্রোহী মানুষের পক্ষ থেকে সেটাকে গুঁড়িয়ে দিয়ে সমাজের গতিকে মুক্ত করে দেওয়া হয়, সমাজ এগিয়ে চলে। যুগে যুগে বিপ্লবীরা তাই করেছেন এবং এখনও করছেন। হতাশ হওয়ার কোনও কারণ নেই।
সমাজের অভ্যন্তরে অপরাধী অপরাধ করতে সদা সক্রিয় থাকে কিন্তু অপরাধ নিরোধে দায়িত্বপ্রাপ্তরাও সক্রিয় থাকেন। এটা একটি সমাজনির্দিষ্ট নিয়ম। কিন্তু এই নিয়মের ভেতরে দ্বান্দ্বিকতার নিয়মানুসারে সক্রিয়তার বিরোধী প্রবণতা নিষ্ক্রিয়তা কার্যকর থাকে। যখন এই নিষ্ক্রিয়তা প্রবল হয়ে উঠে তখনই ইয়াসিন আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার সুযোগ লাভ করে, প্রকারান্তরে ‘অপরাধ নিরোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত নয়’ সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাক্ষী হয়ে উঠে এবং কেবল প্রত্যক্ষ করে নয়নমন সার্থক করে তাঁদের সক্রিয়তা প্রতিপন্ন করেন। আমাদের সমাজের এটি একটি দুর্বলতা। এই দুর্বলতাটি সমাজের অধিপতি শাসকশ্রেণি তাদের স্বার্থে জিইয়ে রেখেছে। তারা আইন প্রণয়ন করেছে এমন দুরভিসন্ধিতে যাতে জনসাধারণ আইন প্রয়োগে কিংবা রাষ্ট্র শাসনকাজে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিতে না পারে। এই দুর্বলতার ফাঁকে অপরাধী ও অপরাধ দমনে নিয়োজিতরা অপরাধকর্ম ও অপরাধনিরোধকে আর্থিক স্বার্থোদ্ধারের একটি উত্তম উপায়ে পর্যবশিত করেছে। সামাজিক এই স্থবিরতাকে কাটিয়ে উঠতে না পারলে দুর্নীতির লাগাম টানা কারও সাধ্য নয়। ইয়াসিন কিংবা সাহেদ করিমকে ঠেকানো যাবে না। সামাজিক দুর্বত্তায়ন চলতেই থাকবে এবং প্রকারান্তরে ‘তদবিরের চাপে মাঠ প্রশাসন’-এর ঘুম হারাম হয়ে যেতেই পারে, যেমন হচ্ছে।
কেউ বলতেই পারেন, সমাজে অপরাধ সকলে একসঙ্গে করে না। এমন কথা বরং সামাজিক দুর্বৃত্তায়নকে উৎসাহিত করে। বিষয়টি একটু খতিয়ে দেখা যাক। একটি অপরাধমূলক কাজ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয় নি, এই বাস্তবতাটি বাস্তব হতে পারে তখনই যখন আইনের লোকেরা হয় কাজে অবহেলা করেছেন, না হয় অপরাধীর কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে অপরাধীকে অপরাধ করার সুযোগ করে দিয়েছেন, এবং অপরাধী যথারীতি সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছে। যখন কোনও কারণে বিষয়টি সমাজের পক্ষে আর উপেক্ষার বিষয় থাকে না তখন কার্যত সেটার বিরুদ্ধে জনগণের মধ্যে সাড়া জাগে, এবং তখন অপরাধ দমনে দায়িত্বপ্রাপ্তরা কাযর্ত সাময়িকভাবে হলেও কাজে নামেন। হয় অপরাধীকে পালিয়ে যাবার সুযোগ করে দেন অথবা আইনের হাতে সোপর্দ করেন। আটক করার ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগে যে-কেউ পালানোর সুযোগ নিতেই পারেন। এ রকম ব্যাখ্যা যে-কেউ করতেই পারেন। আর করলে, তাঁর যুক্তিকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়ারও কোনও উপায় নেই। অনুমানটি সত্য হওয়ার সম্ভবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমরা জানি বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সরকারি মদদে বিদেশে চলে যেতে সহায়তা করা হয়েছিল, চাকরি দেওয়া হয়েছিল, আইন করে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। এই এতসব কর্মকা-ের ভেতরে কখন কোথায় সমুদ্রে নি¤œ চাপ সৃষ্টি হওয়ার মতো ‘তদবিরের চাপ’ তৈরি হয় সেটা অনুমান করাও দুষ্কর।
বিগত ৬ জুন ২০২০, দৈনিক নয়া দিগন্তের একটি সংবাদ শিরোনাম ছিল, ‘উন্নয়ন প্রকল্পে লুটপাট’। সংবাদের শুরুতেই লেখা হয়েছে, ‘উন্নয়ন প্রকল্পে কেনাকাটার মাধ্যমে রাষ্ট্রের অর্থ লুটপাট চলছে। প্রকল্পের জন্য কেনা পণ্যের দামের সাথে বাজরদরের অকাশপাতাল ফারাক। এভাবে আকশচুম্বি মূল্য দিয়ে লুটপাট করা হচ্ছে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ। যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের প্রস্তাবনায় প্রতিটি লিফটের দাম ২ কোটি টাকা, এসির দাম ৫২ লাখ টাকা, সিকিউরিটি ও গেট লাইট প্রতিটি ১২ লাখ টাকা ও সভা কক্ষের টেবিল ১২ লাখ টাকা দাম ধরা হয়েছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এ ধরনের অবাস্তব দামের প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে বলে কমিশন সূত্রে জানা গেছে। এর আগে হাসপাতাল ও রূপপুর প্রকল্পে এমন আজগুবি দামে পণ্য কেনার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লুটপাটের দৃষ্টান্তও দেশবাসীর সামনে আছে। […] এব্যাপারে পরিকল্পনা কমিশনের অর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) আবুল কালাম আজাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, এসব ব্যয় প্রস্তাব অসৎ লোকদের দ্বারা করা হয়। প্রকল্প তৈরির ক্ষেত্রে কিছু লোকের অসততা কাজ করে। তারা এসব ইচ্ছাকৃতভাবে করে। যদি কোন ফাকে পাস হয়ে যায় তাহলে তাদের ভাগ্য খুলবে। তবে পিইসি আমার কাছে, এসব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আমি দেখব। তিনি বলেন, একটা লিফটের দাম কোনোভাবেই প্রায় ২ কোটি হতে পারে না। মূল দাম সর্বোচ্চ ২৫ লাখ হতে পারে। তার সাথে ভ্যাটসহ অন্যান্য চার্জ থাকলে সেটাসহ আরো কিছু বেশি হতে পারে। আর এসি কিভাবে ৫২ লাখ টাকা ধরা হয় ? এটা ৫২ হাজার টাকার বেশি হবে না। তিনি বলেন, আমরা সব সময় বলি প্রাক্কলনের সময় ইন্টারনেট থেকে কোম্পানি ও মডেলসহ পণ্যের নাম যুক্ত করতে হবে । কিছু অসৎ লোকের কারণে এসব হচ্ছে।’
এই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পরিকল্পনা কমিশনের অর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) সরকারি অর্থলুটপাটের চক্রান্ত সম্পর্কে অবগত আছেন। অর্থাৎ তিনি জানেন ‘এসব ব্যয় প্রস্তাব অসৎ লোকদের দ্বারা করা হয়। প্রকল্প তৈরির ক্ষেত্রে কিছু লোকের অসততা কাজ করে। তারা এসব ইচ্ছাকৃতভাবে করে। যদি কোন ফাকে পাস হয়ে যায় তাহলে তাদের ভাগ্য খুলবে।’ এবং দুর্নীতির প্রতিকারের কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘তবে পিইসি আমার কাছে, এসব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আমি দেখব।’ তাঁর অবলম্বিত প্রতিকারের ব্যবস্থা দুর্নীতি নির্মূলের কোনও ইঙ্গিত বহন করে না, যে-কারও স্বাভাবিক বুদ্ধিতে মনে হতেই পারে যে, গোপনে গোপনে তদবিরের হস্ত প্রসারিত হবে এবং তদবিবের চাপ বাড়বে। একটি পত্রিকা লিখেছে, ‘প্রভাবশালী স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক নেতাদের নানা তদবির ও অন্যায় চাপে হিমশিম খাচ্ছেন জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। অযৌক্তিক ও অন্যায় আবদার মেটাতে অপারগ হলে তাদের বিরুদ্ধে হামলা এবং মামলার ঘটনা ঘটছে।’
এমন অবস্থা বোধ করি আজকের নয়। ব্রিটিশ আমল থেকেই চলছে এবং কালক্রমে রেওয়াজে পরিণত হয়েছে এবং স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশ আমলে রেওয়াজ শেষ পর্যন্ত দাবির আকার নিয়েছে, এখন সে-দাবি না মানলে বা কোনও প্রকারে পূর্ণ না হলে প্রতিকার স্বরূপ মামলা-হামলা পর্যন্ত গড়াচ্ছে। এই মামলা ও হামলা বিষয়ের মধ্যে মামলাটি কিন্তু আবার প্রশাসনিক বিষয়েরই অন্তর্গত। অনেক ক্ষেত্রেই প্রশাসনের একাংশের কাছে যৎকিঞ্চিৎ উপরি আয়ের লোভে মামলামচ্ছবে মশগুল থাকার অভ্যস্ততা বিদ্যমান। যে যা-ই বলুন, আমাদের দেশের প্রশাসনে বরাবরের মতো তদবিরের রেওয়াজ প্রচলিত ছিল এবং আছে। অতীতে বর্তমানের আকারে তেমনটা প্রকট ছিল না, এখন প্রকটাকার ধারণ করেছে, এইটুকু মাত্র তফাৎ। বিষয়টি অস্বীকার করার কোনও কারণ আছে বলেও মনে হয় না বা কেউ অস্বীকার করবেন এমনটাও নয়। কিন্তু এই তদবিরের বিষয়টিকে বিদ্যমান আমলাতান্ত্রিকতা থেকে উচ্ছেদ করার কোনও কার্যক্রম কেউ গ্রহণ করতে পারবেন বলেও মনে হয় না। কারণ তদবিরপছন্দ আমলাতান্ত্রিকতার সঙ্গে তদবিরওয়ালা রাজনীতিকতা একে অন্যের সঙ্গে একটি গভীর ও অবিচ্ছেদ্য গাঁটছড়ায় বাঁধা পড়ে আছে। এই গাঁটছড়াটিকে ছিন্ন করতে হলে প্রথমেই পুঁজিবাদী অর্থনীতির ভেতরের ব্যক্তিস্বার্থ সংশ্লিষ্ট যাবতীয় কার্যক্রমের বিলুপ্তায়ন কার্যকর করতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না যে, একজন প্রদীপকুমার দাশ ওসি হয়ে সম্পদ আহরণের লোভে খুনি হয়ে উঠতে কসুর করেন না। এবং অপরদিকে এই একই কারণে একজন উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে রাতের বেলা তাঁর বাসভবনে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে হয়। দুজনই প্রশাসনের অংশ, একজন খুনি হয়ে উঠেছেন, অন্যজন খুন হতে হতে হয় তো রক্ষা পেয়ে যাবেন (তিনি সুস্থ হয়ে উঠুন)। এই প্রসঙ্গে একটি কথা এখানে উদ্ধৃত করা নিতান্ত আবশ্যক বলে প্রতিপন্ন হচ্ছে, কথাটি হলো : রাষ্ট্র-সমাজ পরিচালকের ভূমিকায় অধিষ্ঠিত আমলা ও রাজনীতিবিদের দুই শ্রেণির দ্বন্দ্ব বৈরিতায় পর্যবশিত হলে দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীকে প্রতিনিয়ত এমন হামলার হুজ্জত পোহানোর জন্যে প্রস্তুত থকতে হবে। সম্প্রতি দ্বন্দ্বটা এতো তীব্রতা অর্জন করেছে যে, বর্তমানে নির্বাহীদের রক্ষার্থে সশস্ত্র দেহরক্ষী অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। যে-কোনও বিবেচনায় বর্তমান পরিস্থিতিতে এটাই বাস্তবতা। ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা দেশের ভেতরে এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি যে বিকাশের পূর্ণতাকে স্পর্শ করেছে তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ উপস্থিত করেছে অনেক আগেই।
দেশ এই জটিলতা থেকে কী করে বেরিয়ে আসবে তার কোনও সুনির্দষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া ও বাস্তবায়ন করা বোধ করি কোনও ব্যক্তি বিশেষের কাম্ম নয়। কিন্তু এর একটা নিরসন চাই। শেখ হাসিনার বিভিন্ন কার্যক্রমে ইতোমধ্যে সে-নিরসন প্রচেষ্টার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। কিন্তু দেশের সর্বস্তরের মানুষ, বিশেষ করে নীতিনির্ধারকরা ও তাঁর পার্শচররা তাঁর সঙ্গে একমত হলেও একাত্ম হয়ে কাজ করতে অপারগ হচ্ছেন। তাঁরা ব্যক্তিস্বার্থের নিগড় ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারছেন না। তাঁরা নিজেরা রাজনীতিকে উত্তম একটি ব্যবসা মনে করেন। অবস্থা এমন যে, রাজনীতি এখন রাজনীতিবিদের হাতে আলাদিনের আশ্চর্য চেরাগ হয়ে উঠেছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনও একটি উপজেলার ছাত্র লীগের সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদক পর্যন্ত কয়েক বছরের ব্যবধানে শত কেটি টাকার মালিকে পরিণত হচ্ছে। গণমাধ্যমে এমন খবর প্রকাশিত হচ্ছে। দেশের বাস্তবতা প্রকৃতপ্রস্তাবে এই। এমতাবস্থায় সকলে মিলে এর সমাধান করতে হবে ও বাস্তবায়নের প্রচেষ্টায় ব্রতী হতে হবে এবং এই সামষ্টিক প্রচেষ্টার ভেতরে বর্তমানে প্রচলিত সামষ্টিক স্বার্থবৈরী অর্থনীতিকে প্রচলিত রাখলে সমস্যানিরসনমুখি প্রদত্ত দিকনির্দেশনা পরিপূর্ণরূপে ব্যর্থ হবে, নির্বাহীরা ক্রমাগত হামলা-মামলার শিকার হতেই থাকবেন, প্রকারান্তরে সমান তালে তদবির বাড়তেই থাকবে । অর্থাৎ সামষ্টিক স্বার্থবিরোধী অর্থনীতি প্রচলিত রেখে নির্বাহীদের উপর হামলা-মামলা ঠেকানো যাবে না, তদবিরও বাড়বে বৈ কমবে না।

  • [১]