বিশেষ প্রতিনিধি ও আমিনুল ইসলাম ( টাঙ্গুয়া ঘুরে এসে)
সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার পাড়ের বাঘমারা বাঁধ রক্ষার লড়াই চলছে গত পাঁচ দিন ধরেই। জেলা প্রশাসকসহ জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা ওই বাঁধেই দিন রাত কাটাচ্ছেন। মঙ্গলবার সরেজমিনে এই বাঁধে গেলে বাঁধের কাজে থাকা কৃষকরা বললেন, বাঁধ নির্মাণকারীদের ভুল ও লোভের খেসারত দিচ্ছেন সকলে। কৃষকরা বললেন, এই বাঁধের কাজ একসময় ইউনিয়ন পরিষদ কিংবা উন্নয়ন সংগঠনের আর্থিক সহায়তায় করতেন স্থানীয় কৃষকরাই। ওই সময় বাঁধ করা হতো নদীর তীর থেকে একটু সরিয়ে। পানি উন্নয়ন বোর্ড যখন থেকে কাজ করছে, নদীর তীর ঘেষে করছে, গত পাঁচ বছরই এটি নদীর একেবারে পাড়ে করা হচ্ছে। চার বছর নদীর পানি এতো বেশি না হওয়ায় বুঝা যায় নি তারা এটি ভুল করছেন। মূলত কম কাজ করে বেশি টাকা লোপাটের নেশা থেকেই বাঁধটির এই অবস্থা হয়েছে। এখন দিন রাত কাজ করেও বাঁধ টিকানো যাবে কি না কেউ জানে না।
টাঙ্গুয়ার পাড়ের এই বাঁধটি পড়েছে তাহিরপুরের উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নে। কিন্তু ফসল রক্ষা হয় দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের গুরমার এক্সটেনশন অংশসহ বেশ কয়টি ছোট ছোট হাওরের।
দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান খসরুল আলম বললেন, বাঁধটি ২০১৭ সালের প্রলয়ংকরীর বন্যার আগে পর্যন্ত নির্মাণ হতো ইউনিয়ন পরিষদের আর্থিক সহায়তায়। একসময় উন্নয়ন সংগঠন সিএনআরএস’এর আর্থিক সহায়তায়ও বাঁধটি নির্মাণ করেছেন কৃষকরা।
বাঁধের পাশের গ্রাম রামসিংহপুরের কৃষক তারা মিয়া বললেন, বাঁধটি নির্মাণের তদারকিতে ২০১৬-১৭ ইংরেজিতে আমিও ছিলাম। তখন পর্যন্ত বাঁধ নির্মাণ হয়েছে নদীর পাড় থেকে ৩০-৪০ ফুট ভেতরের দিকে। গেল পাঁচ বছর ধরে বাঁধের পুরোনো অংশের মাটি কেটে নতুন বাঁধে দেওয়া হয়েছে। এটি করা হয়েছে বেশি লাভের আশায়। বাঁধের পাড়ে কাজ করে নদীর দিকে লম্বা স্লোফ করা হলে বাঁধ মাপযোগ করার সময় বেশি মাটি হিসাবে আসবে, এমন ধান্দা থেকে এভাবে কাজ করা হয়।
হুকুমপুরের আজিমুল ইসলাম বললেন,‘ইবারতো এক দেড় ফুট মাটি বান্দে দিছে, স্লোফ নদীর নীচ পর্যন্ত গেছে, নদীর দিকে বাঁধ দেখলে বুঝা যায় ৩০-৪০ ফুট উঁচা বাঁধ করা অইছে, আসলে মাটি পড়ছে এক দেড় ফুট, এই রকম ধান্দা করার লাগি গত চাইর বছর ধইরাই নদীর দিকে বাঁন্দ বাড়ায়, পাড়ের দিকে কাজ করে না, ইবার কয়েক দিন আগে বান্দের কাম করছে, ঘাষঔ লাগাইছে না, এখন নদীত পানি আইছে, দুর্বল বান্দ গিলিলার (খেয়ে নিচ্ছে) নদীয়ে, সবের দৌঁড়াদৌঁড়ি শুরু অইছে বান্দ আটকাইবার লাগি।’
বাঁধ রক্ষার কাজে থাকা সন্তোষপুরের রণি সরকার, রতন সরকার, রঞ্জিত সরকার একই ধরণের মন্তব্য করলেন।
সন্তোষপুরের কাজল সরকার জানালেন, বাঁধের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি করা হয়েছে অনেক দূরের গ্রাম থেকে। এখন বাঁধে কাজ করতে হচ্ছে তাদের। তারা এখানে টাকার জন্য আসেন নি। এসেছেন নিজের জমির ফসল রক্ষার চেষ্টা করতে। জমির ধান পাকা শুরু হয়েছে। এখন ধান কাটবেন না বাঁধ রক্ষা করবেন। দুই চিন্তায় ঘুমোতে পারছেন না তারা। অনেকে রাতেও কাজ করছে এই বাঁধে। বাঁধের কাজে থাকা সন্তোষপুরের কৃষক বুলবুলও একই ধরণের মন্তব্য করলেন।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মিছবাহ্ উদ্দিন পলাশ বললেন, পিআইসি দেবার সময় আমাদের জিজ্ঞেসও করে নি। এখন ডিসি সাহেব ও ইউএনও সাহেবের অনুরোধে কৃষকদের ডেকে এনে কাজে লাগিয়েছি আমরা। এখন টাকা দিলেও শ্রমিক পাওয়ার উপায় নেই। যারা কাজ করছে, তাদের নিজেদের জমি আছে বলেই এই বাঁধে এসে দিনে রাতে কাজ করছে। যারা বাঁধের টাকা হাতিয়েছে, তারা কোন মানুষকে বাঁধে এনে কাজে লাগাতে পারে নি।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আলী আহমদ মুরাদও ক্ষুব্ধ। বললেন, বাঁধে ঘাষ পর্যন্ত লাগায় নি। অত্যন্ত দুর্বল বাঁধ হয়েছে। আগে আমাদের জিজ্ঞেস করা হয় নি। এখন রাত দিন নিজের টাকা খরচ করে বাঁধে থাকতে হচ্ছে আমাকে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তাহিরপুরের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান বললেন, হাওরের ভেতরের দিকেও গভীরতা আছে, তবে নদীর চেয়ে কম, তবুও বাঁধটি ভেতরে সরানো যেত, কিন্তু আমি নতুন এসেছি, এসে এই দিকেই পুরাতন বাঁধ দেখেছি। এখন নতুন বাঁধ করতে হলে আরও বেশি টাকা বরাদ্দ লাগবে, তাতে আরেক প্রশ্ন ওঠবে। বাঁধের কাজ নির্দেশনা মোতাবেক হয়েছে দাবি করে তিনি জানালেন, পিআইসি করার সময় তিনি নতুন হওয়ায় বুঝতে পারেন নি পিআইসিতে যুক্ত কৃষকের বাড়ি বাঁধের পাশে নয়। বাঁধে দুর্বা লাগানো হলো না কেন এমন প্রশ্নের উত্তর দেন নি এই প্রকৌশলী।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, বাঁধটি রক্ষার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রতিদিন দিনের বেলায় আমি এবং তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রায়হান কবির সরেজমিনে উপস্থিত থেকে এখানে কাজ করানোর চেষ্টা করছি। আমি অন্যত্র গেলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক কেউ এখানে থাকছেন। রাতে তাহিরপুরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আলা উদ্দিন এখানে কর্মরত লোকজনের সঙ্গে থাকছেন। মানুষের দিন রাতের যুদ্ধে আশা করছি হাজারো কৃষকের ফসল রক্ষা হবে। তিনি জানান, বাঁধের কাজে এবং পিআইসি গঠনে অনিয়ম হয়ে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, গুরমা এক্সটেনশন বাঁধে ১৩ টি পিআইসি এবার বাঁধের কাজ করেছে। বরাদ্দ ছিল প্রায় আড়াই কোটি টাকা।