- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

‘তারা পানির অপেক্ষা কইরা বান বান্দে’

বিশেষ প্রতিনিধি
‘ইউএনও সাবে অনে (এখন) দৌঁড়াদৌঁড়ি করইন, আগে গুরুত্ব দিছইন না, যারা বান্দের কাম (কাজ) করে তারা পানির অপেক্ষা করে, পানি না আইলে বেশি টেকা লুটপাট করা যায়, পানি আইলে কৃষক মরে, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) দিয়া দিয়া যেগুনতে কোটি টেকা কামায়, বাঁধ ভাইঙ্গা হাওরে পানি ঢুকনে তারা খুশি অইয়া রেস্টুরেন্ট বইয়া আমুদ পূর্তি করের, তারা বুঝের বাঁধ যখন ভাঙছে, আগামী বছর বরাদ্দ বেশি পাইবো, ইগুনতেরে গুলি কইরা মারা দরকার।’
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার সরমঙ্গল ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের বড় কৃষক আব্দুস ছাত্তার বৃহস্পতিবার দুপুরে এমন মন্তব্য করেন।
তিনি জানালেন, বুধবার গভীর রাতে বৈশাখীর বাঁধ ভেঙে চাপতির হাওরের প্রায় ৬ হাজার হেক্টর ফসল ডুবেছে। বাঁধ নীচের দিকে দুর্বল হয়েছিল, উপরের দিকে শক্ত করেছে, এজন্য নীচের দিকে পানি ঢুকেছে। এই বাঁধ ভাঙায় উপজেলার তাড়ল ও জগদল ইউনিয়নের হাজার হাজার কৃষকের সর্বনাশ ঘটেছে বলে জানান তিনি। এই বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেবার দাবি এই কৃষক নেতার।
সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জিতেন্দ্র তালুকদার পিন্টু জেলার জামালগঞ্জের পাগনার হাওরপাড়ের গঙ্গাধরপুরের কৃষক। পাগনার হাওরপাড়ের করাইক্কার বাঁধের (৩৩ নম্বর পিআইসি) কাজ করিয়েছেন এই সাবেক ছাত্রনেতা। বললেন, উজানের ঢলে আসা পানি এখন পর্যন্ত কোন বাঁধ টপকায়নি। তাহলে বাঁধ ভাঙবে কেন। যেসব বাঁধ ভেঙেছে, তদন্ত করলে পাওয়া যাবে, অসময়ে দুর্বল বাঁধ করা হয়েছে। আমিও বাঁধের কাজ করেছি, যে কেউ বাঁধে এসে দেখতে পারেন। এখনকার পানিতে আমার করা বাঁধ ভাঙবে না।
শহরতলির গৌরারং ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান করচার হাওরপাড়ের কৃষক ফুল মিয়া বললেন, বাঁধ যদি পানির প্রথম ধাক্কাই না ফেরায়, তাহলে এই বাঁধ দিয়ে টাকা খরচের প্রয়োজনই বা কি।
হাওরের কৃষি ও কৃষক রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সুনামগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক চিত্ত রঞ্জন তালুকদার বললেন, কৃষককে যুক্ত না করায় দুর্বল বাঁধ হয়েছে। যারা বাঁধের কাজ করছে এরা বাঁধ ব্যবসায়ী। এদের কবল থেকে কৃষকদের বাঁচাতে হবে। বাঁধের পাশের গ্রামের কৃষকদেরই বাঁধ নির্মাণের দায়িত্ব দিতে হবে।
সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. রুহুল তুহিন বললেন, ভেঙে যাওয়া বাঁধগুলোর জন্য তদন্ত কমিটি করে বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে।
বৃহস্পতিবার পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপ—মন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জের ধর্মপাশার ক্ষতিগ্রস্ত চন্দ্রসোনার থাল হাওর পরিদর্শন করেছন। এসময় মন্ত্রী বলেছেন, হাওরের বাঁধের কাজে অনিয়মের ক্ষেত্রে কোন ছাড় নেই। এর আগে অনিয়ম দুর্নীতির কারণে প্রথম শ্রেণির ২২ ঠিকাদারকে পানি উন্নয়ন বোর্ডে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। হাওরে যেহেতু ফসল ডুবেছে সেজন্য রোববারে মন্ত্রণালয়ে গিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে দেব। উচ্চ পর্যায়ের এই তদন্ত কমিটি সুনামগঞ্জে এসে সুষ্ঠু তদন্ত করবে। তদন্তে হাওরের বাঁধে কাজে কোন সরকারি কর্মকর্তা কিংবা পিআইসি কেউ অনিয়মে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রসঙ্গত. সুনামগঞ্জের দুই লাখ ২২ হাজার ৮০৫ হেক্টর জমির বোরো ফসল রক্ষার জন্য এবার ৭২৭ টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে ৫৩৭ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এসব বাঁধে ১২২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত জেলার প্রায় দেড়শ ছোট বড় হাওরের মধ্যে ১২ টির ফসল উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে ডুবেছে। বেশিরভাগ হাওরে পানি ঢুকেছে বাঁধ ভেঙে।
এদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে ও উজানে (ভারতের চেরাপুঞ্জি— মেঘালয়) বৃষ্টি না হওয়ায় জেলার নদ নদীতে পানি কমেছে। বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জ শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর ষোলঘর পয়েন্টে পানি বিপদ সীমার দশমিক ৫৯ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

  • [১]