- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

তালগাছ প্রকল্পের অস্তিত্ব নেই

বিশেষ প্রতিনিধি
প্রাকৃতিক দুর্যোগ বজ্রপাতে প্রতিবছরই জেলায় অসংখ্য জেলে ও কৃষকের মৃত্যু ঘটে। গত কয়েক বছরে হাওরে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত সময়কে সুনামগঞ্জে বজ্রপাতের মৌসুম বলা হয়। হাওরাঞ্চলের এই জেলায় বজ্রনিরোধক দ- স্থাপনের কোন বড় প্রকল্প এখনো গ্রহণ করা হয় নি। তালগাছ প্রকল্পের নামে কেবল টাকার অপচয় হয়েছে। এর কোন অস্তিত্ব দৃশ্যমান নয়।
বজ্রপাত ঠেকাতে ২০১৭ সালে তিন হাজার, ২০১৮ সালে এক লক্ষ এবং ২০২২ সালে ৫০০ তালগাছ এই জেলায় কাগুজে রোপন করা হয়েছে দেখানো হলেও এসব তালগাছের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া কঠিন। বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে গেলবছর সীমিত আকারে বজ্রনিরোধক দ- এবং সামান্য কিছু মাল্টি পারপাস সেড নির্মাণের কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের দায়িত্বশীলরা।
সরকারি হিসেবে গত পাঁচ বছরে এই জেলায় বজ্রপাতে ৫৯ জন মারা গেছেন জানানো হলেও বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা আরও বেশি। সর্বশেষ গেল রবিবার একই দিনে জেলার ছাতক, দোয়ারাবাজার ও তাহিরপুরে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।
দোয়ারাবাজারের লক্ষীপুরের ১৩ বছরের শিশু মিলন মিয়াও এদিন বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই মারা যান। এসময় স্থানীয় তিনটেঙ্গি হাওরে ভাগ্নে মিলনের সঙ্গে মামা নিজাম উদ্দিনও গুরুতর আহত হন।
নিজাম উদ্দিনের ভাই জসিম উদ্দিন জানালেন, বৈশাখ মাসে আবহাওয়া কখন খারাপ হয় গ্রামের মানুষ কেউই আগে থেকে জানে না। তারা দিন মজুর, কাটা ধান ক্ষেত থেকে খুঁটে খুঁটে ধান তুলে আনার জন্য গিয়েছিল তার ভাই ও ভাগ্নে। ঈদের পরদিন ২৩ এপ্রিল সকাল সাড়ে দশটার দিকে বৃষ্টি আসার আগেই তিনটেঙ্গি হাওরে বজ্রপাতে তার ভাগ্নে মারা যায় এবং ভাই আহত হয়।
জসিম বললেন, ‘আকাশ খারাপ দেখলেই হাওরে (তিন টেঙ্গি হাওরে) দৌড়াইয়া গিয়া ওঠার জায়গা নাই।’
তিনটেঙ্গি হাওরের পাশের বীর মুক্তিযোদ্ধা হেলাল-খসরু হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ফারুক আহমদ বললেন, ২০১৮ সালে প্রশাসনের নির্দেশে ছয় মাস চেষ্টা করে শিক্ষার্থীদের দিয়ে স্থানীয়ভাবে বীজ সংগ্রহ করে হাওরের পাড়ে পাড়ে সড়কে একশ’ এর মত তালবীজ লাগানো হয়েছিল, এর একটি গাছ হয়েছে বলে আমার চোখে পড়ে নি। কেউ যদি বলে তালগাছ হয়েছে, তাহলে সরেজমিনে এসে যাচাই করতে হবে বলে জানালেন তিনি।
লক্ষীপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আমিরুল হক অবশ্য দাবি করলেন, ২০১৮ সালে পাঁচ হাজারের মত তালগাছ পুরো ইউনিয়নে লাগিয়েছিলেন তারা। মরে যাবার পরেও কয়েক’শ তালগাছ ইউনিয়ন পরিষদের সড়কসহ বিভিন্ন সড়কে বড় হয়েছে। এখন গাছগুলো তিন-চার ফুট উঁচু হয়েছে।
দেশের অধিক বজ্রপাতপ্রবণ ১৫ জেলার মধ্যে সুনামগঞ্জ একটি। ২০১৫ সালে বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা দেয় সরকার। এরপরই বজ্রপাত রোধে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু এই পর্যন্ত গ্রহণ করা কোন উদ্যোগেই প্রাণহানি ঠেকাতে পারে নি। ২০১৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে জেলায় এক লক্ষ তালগাছ লাগানোর সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ রয়েছে। তাল বীজ ক্রয়, রোপন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতিটি উপজেলায় সাধারণ ও নির্বাচনী খাত হতে টিআর বা কাবিটা কর্মসূচিতে তালগাছ রোপনের প্রকল্প গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করেন তিনি। এই চিঠি সকল সংসদ সদস্য ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের দেওয়া হয়।
হাওরের জেলা সুনামগঞ্জের বেশিরভাগ গ্রামাঞ্চলে তালগাছ লাগানোর প্রকল্প নিয়ে হাস্যরস করেন স্থানীয়রা।
বুধবার দুপুরে সুনামগঞ্জ শহরতলির মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের তালগাছ লাগানো এলাকাগুলোয় গিয়ে একটি তালগাছের চিহৃও পাওয়া যায় নি।
মোল্লাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মৃণাল কান্তি দাসের দাবি মোতাবেক, সবচেয়ে বেশি তালগাছ লাগানো এলাকা ইউনিয়নের বুড়িস্থল-আলমপুর সড়কে গিয়ে দেখা গেছে ওখানে একটি তালগাছেরও অস্তিত্ব নেই।
সড়কের পাশের বুড়িস্থল গ্রামের রুহেুল আহমদ হাসতে হাসতে বললেন, ‘আপনি তালগাছ দেখতা আইছইন, তালগাছতো ই-এলাকাতঔ নাই, বুড়িস্থল-আলমপুর সড়কে কয়েকটা লাগানো অইছিল একবার, ইগুনতো একটাও বাচ্ছে না, কেউ বাঁচানোর চেষ্টাও করছে না, ইতাতো সরকারি টেকার অপচয়।’
পাশে দাঁড়ানো ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ বাদে সাধকপুরের আনন্দ বিশ^াস জানালেন, ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ডের বুড়িস্থল-আলমপুর সড়কে, আপনি যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন একশ’এর মত তালগাছ স্থানীয় ইউপি সদস্যকে নিয়ে লাগিয়েছিলাম, একটাও বাঁচানো যায় নি। এরকম সকল ওয়ার্ডেই তালগাছের চারা লাগানো হয়েছিল। কোথাও তালগাছ আছে কী-না জানতে চাইলে, তিনি না সূচক জবাব দিলেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য সাখাওয়াত হোসেন রাজিম বললেন, আমার সময়ে তালগাছের চারা লাগানো হয় নি। এর আগের ইউপি সদস্য (আমারই ভাই) কিছু তালগাছের চারা লাগিয়েছিলেন, একটাও বাঁচে নি।
তিনি জানালেন, তালগাছ রোপন করার আগে এই মাটি এরজন্য উপযোগি কি না পরীক্ষা করতে হবে। গাছ লাগানোর পর পরিচর্যাও করতে হবে। এভাবে কোটি কোটি টাকা অপচয় করা ঠিক হয় নি বলে মন্তব্য তার।
একাধিকবার ফোন দিয়েও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নুরুল হক ফোন রিসিভ না করায় এই প্রসঙ্গে তার বক্তব্য জানা যায় নি।
ইউপি সচিব মৃণাল কান্তি দাস জানালেন, তিনি এই বিষয়ে ইউপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেছেন, চেয়ারম্যান জানিয়েছেন তালগাছের চারা দেবার সময়ই ৭০ ভাগই মরা ছিল। গেল বছর সাড়ে চারশ থেকে পাঁচশ এবং এর আগে আরও কিছু চারা এসেছিল। সবই তারা বিতরণ করেছেন, চারা লাগানোও হয়েছে। কিন্তু কোন গাছই জীবিত নেই। এই অবস্থার জন্য তিনি মাটিও এলাকায় বন্যাজনিত কারণের কথা উল্লেখ করলেন।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. সফিকুল ইসলাম বললেন, তালগাছ বড় হবে, বজ্ররোধকের কাজ করবে, এটি অনেক সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। অনেক তালগাছ লাগানো হয়েছে বাস্তবে একটিরও অস্তিত্ব নেই। পানি আসলে হিজল এবং করচ ছাড়া অন্য কোন গাছ বাঁচে না। এজন্য তালগাছ লাগাতে এখন আর কোন বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না। গেল তিন বছরে তালগাছ লাগাতে কত টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, এই তথ্য জানাতে পারেন নি তিনি। বললেন, তিনি তখন এই স্টেশনে ছিলেন না, এই তথ্য জানাতে হলে সময় লাগবে।
উপজেলা পর্যায়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানালেন, একটি তালগাছের চারা কমপক্ষে ১০০ টাকায় কিনতে হবে। সেই হিসাবে ২০১৭ সালে তিন হাজার তালগাছে ৩০ লাখ টাকা, ২০১৮ সালে একলক্ষ তালগাছে এক কোটি টাকা এবং ২০২২ সালে ৫০০ তালগাছে ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তালগাছের চারার মূল্য বেশি হলে. এই খরচের হিসাব আরও বাড়বে।
এদিকে, বজ্রপাতে মৃত্যু ঠেকাতে হাওরে আধুনিক বজ্র নিরোধক দ- স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জেলার ৬ উপজেলায় ইতিমধ্যে ২৪ টি বজ্রনিরোধক দ- স্থাপন করা হয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বললেন, জেলায় বজ্রনিরোধক দ- স্থাপনের জন্য দুই কোটি টাকা বরাদ্দ এসেছিল। এরমধ্যে ৬ উপজেলায় বজ্রনিরোধক দ- স্থাপন করা হয়েছে। বন্যার কারণে বাকি ৪ উপজেলার অর্থ ফেরৎ গেছে। তিনি জানালেন, এই বজ্র নিরোধক দ- মাত্র ৩০০ ফুট এলাকা নিরাপদ রাখে। এই বিষয়টি মাথায় নিয়ে হাওরাঞ্চলের সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জের জন্য দুইশ’ কোটি টাকার ছাউনিসহ বজ্রনিরোধক দ- স্থাপনের প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। এই প্রকল্পের অনুমোদন হলে হাওরে হাওরে এ জাতীয় কাজ হবে।
জেলা স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক জাকির হোসেন জানান, তারা একটি বিশেষ প্রকল্প থেকে বড় হাওরে ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৮ ফুট উঁচু তিনটি আশ্রয় কেন্দ্র করেছেন। আরও ১২টির নির্মাণ কাজ চলছে। এগুলো বজ্রপাত ও বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি, বর্ষাকালে বিশুদ্ধ পানির জন্য এবং দুর্যোগে আশ্রয় নেবার জন্য কাজে আসবে।
জেলা প্রশাসক দিদারে আলম মোহাম্মদ মাকসুদ চৌধুরী বললেন, হাওরে তালগাছ লাগানোর বিষয় আমার জানা নেই। আমি আসার আগেই এটি হয়েছে। বজ্রপাত থেকে রক্ষায় কীভাবে কাজ করা যায়। কিংবা একটি আশ্রয় কেন্দ্রে একাধিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে কীভাবে রক্ষা পাওয়া যায়, সেটি নিয়ে কাজ করবো আমরা।

  • [১]