উপেক্ষা বা অস্বীকারের সংস্কৃতি যেন আমাদের রক্তে-মাংসে মিশে গেছে। বিশেষ করে যার যে দায়িত্ব সেখানে কোন ব্যত্যয় ঘটার খবরকে সংশ্লিষ্টরা কেবল উপেক্ষাই করেন না বরং নানা ধরনের কথার মারপ্যাঁচে অস্বীকার করার চেষ্টা করেন। যেমন তাহিরপুরে এমওপি সারের সংকট রয়েছে। কৃষকরা বেশি দামে এই সার কিনছেন। কিন্তু উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সারের দাম বাড়ার বিষয়টি জানেন না। তাঁর কাছে কেউ অভিযোগ করেনি। কৃষি কর্মকর্তার কাছে কেউ অভিযোগ করবে তারপর তিনি জানতে পারবেন, বিষয়টি ঠিক এরকম হওয়ার কথা ছিল না। বরং কৃষি সম্প্রসারণের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক রাখার কারণই ছিল তারা নিজেরা কৃষি সংশ্লিষ্ট খবরাদি রাখবেন। প্রতিটি ইউনিয়নে তাঁদের কর্মী রয়েছে (উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তা)। রয়েছেন স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিবৃন্দ। এর উপর সারের সরকারি ডিলাররা তো আছেনই। তো তাহিরপুরের বিভিন্ন বাজারে এমওপি সারের বেশি দামের খবরটি কৃষি অধিদপ্তর জানতে পারলেন না, এটি ঠিক আমরা মানতে পারি না। এই সিস্টেম বা চেইনটি কি তাহলে সঠিকভাবে কাজ করছে না? বাজারে সরবরাহের চাইতে চাহিদা বেশি হলেই যেকোন জিনিসের দাম বাড়ে। বুঝা যায় বোরো আবাদের এই ভরা মৌসুমে বিভিন্ন প্রকারের সারের চাহিদা এখন বেশি। হাওরাঞ্চলে কখন সারের চাহিদা বেশি থাকে সেটি কৃষি অধিদপ্তরও জানেন। প্রয়োজন ছিল চাহিদা মৌসুমে পর্যাপ্ত পরিমাণের সারের সরবরাহ নিশ্চিত করা। সেটি করা যায়নি। তাই ভিন্ন পথে সংগৃহিত সার বিক্রি হচ্ছে বেশি দামে। সারের অপ্রতুল সরবরাহ ও দাম বাড়ার জন্য স্থানীয় কৃষি অধিদপ্তর নিজেদের দায় এড়াতে পারেন না।
বোরো মৌসুমে পর্যাপ্ত সারের মজুদ নিশ্চিত করার জন্য দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর এর আগেও সম্পাদকীয় স্তম্ভে কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু এই আহ্বান জানানো যে অরণ্যে রোদনের নামান্তর তা বেশ বুঝা যায়। সরকার আমদানিকৃত সারে অনেক টাকা ভর্তুকি দিয়ে থাকেন। সরকারি ডিলার ছাড়া বাজারে আর কোন উপায়ে সারের বিপণন করার নিয়ম নেই। তাহিরপুরে সরকারি ডিলারের কাছে এমওপি সার নেই। কিন্তু বাজারে গোপনে এই সার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ডিলারের বাইরে বাজারে যে সার রয়েছে সেটি কোন না কোন ভাবে অসাধু পন্থায় বাজারে এসেছে। অর্থাৎ সরকার ভর্তুকি দিয়ে কৃষকদের শস্য উৎপাদনে যে সহায়তা দিয়ে থাকেন তাও অসাধু বাজার ব্যবস্থা খেয়ে নেয়। কৃষকের লাভ নেই। আমরা এর আগে দেখেছিলাম, হাওরাঞ্চলে সারের যে চাহিদা নিরূপিত হয় সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত সারের পরিমাণ তার চাইতে কম। চাহিদার চাইতে সারের বরাদ্দ কম কেন? এই ঘাটতি মিটানোর জন্য সরকারের কাছে পুনরায় বর্ধিত বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল কি?
কৃষকরা এখন যে জাতের ধান উৎপাদন করেন তা সার নির্ভর। সার ছাড়া ফলন সম্ভব নয়। সুতরাং ধান উৎপাদনে সার একটি অপরিহার্য উপকরণ। সারা জেলার চাহিদা মোতাবেক পর্যাপ্ত পরিমাণ সারের সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। তাই আমরা অনুরোধ করি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে জেলার প্রয়োজন মোতাবেক বিভিন্ন জাতের সারের উপযুক্ত মজুদ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হোক। নতুবা কৃষক ধান উৎপাদনে অবাঞ্ছিত খরচের সম্মুখীন হয়ে লোকসানে পড়বেন। একই সাথে বোরো ধান চাষের অপরাপর ঝুঁকির জায়গাগুলোওÑ যেমন, ফসলরক্ষা বাঁধ, সেচ, কীটনাশক প্রভৃতি বিষয়গুলোকেও সমান গুরুত্ব দেয়া হোক। সম্প্রতি দেশে খাদ্য ঘাটতির যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তা এক কথায় উদ্বেগজনক। এই উদ্বেগ দূর করার জন্য ধানের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর আর কোন বিকল্প নেই।