- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

তাহিরপুরে কয়লা কুড়ানো শ্রমিকদের দুর্ভোগ, সর্বোচ্চ সংবেদনশীলতা প্রদর্শন করুন

তাহিরপুরের সীমান্তবর্তী নদী, ছড়া ও খাল বেয়ে বয়ে আসা ‘বাংলা কয়লা’ কুড়িয়ে বহু গরিব মানুষ পরিবার পরিজনের মুখে খাদ্যের জোগান দিতেন। মূলত ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে এলাকার বহু মানুষের এটিই হয়ে উঠেছিল প্রধান একটি পেশা। প্রকৃতির এই আনুকূল্যে বেঁচে থাকা কয়লা কুড়ানো শ্রমিকরা এখন তাদের সঞ্চিত কয়লা বিক্রি করতে পারছেন না। ফলে তারা পড়েছেন বিপাকে। অনেকে পেশা বদলে ফেলেছেন। অনেকের অভাবের সংসারে আরও বড় অভাব তৈরি হয়েছে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে এই বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে পেশা হারানো এইসব কয়লা কুড়ানো শ্রমিকদের আহাজারির কথা ফুটে উঠেছে। কয়লা শ্রমিকদের বক্তব্য থেকে জানা যায়, গত ৩০ বছর ধরে তারা কয়লা কুড়িয়ে জীবিকার ব্যবস্থা করছিলেন। গত এক বছর যাবৎ তারা সমস্যায় পড়েছেন। কুড়ানো কয়লা বিক্রি করতে পারছেন না তারা। ৩০ বছর যাবৎ যে কুড়ানো কয়লা বিক্রিতে কোন সমস্যা তৈরি হয়নি হঠাৎ কেন গত এক বছরে সেখানে সমস্যা তৈরি হলো?
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক বলেছেন, ‘তাহিরপুরে নি¤œআয়ের মানুষ কয়লা কুড়িয়ে দিনে পাচ/ছয় শ’ টাকা আয় করে। আমাদের অংশে ভাসমান কয়লা তোলা বন্ধ নেই। মাটি খুঁড়ে বা সীমান্তের ওপার থেকে কয়লা তোলা বা আহরণ করা নিষেধ।’ বাংলাদেশের নদী বা ছড়ায় শ্রমিকরা যে কয়লা কুড়ান তা পাহাড় থেকে নেমে নদীর তলদেশে সঞ্চিত হয়। নদীর তলদেশ খুঁড়ে তারা এসব কয়লা উত্তোলন করেন না। তারা সনাতন পদ্ধতিতে জালি (নেটের কাপড় দিয়ে তৈরি ঠেলা জাল) দিয়ে এসব কয়লা আহরণ করেন। এই শ্রমিকদের কেউ সীমান্তও অতিক্রম করেন না। তাহলে এই গরিবদের পেশাকে কেন অনিশ্চয়তা ও সংকটের মধ্যে ফেলে দেয়া হলো? সুনামগঞ্জ ২৮ বিজিবি অধিনায়ক বলেছেন, এমন কয়লা উত্তোলনের কোনো অনুমোদন নেই। তিনি কয়লা উত্তোলনের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। নদীর তলদেশে সঞ্চিত কয়লা যা শ্রমিকরা কষ্টসাধ্য উপায়ে অল্প পরিমাণে উঠাতে পারেন, এবং একজন শ্রমিক এই কষ্টসাধ্য কাজ করে দিনে ৫/৬ শ’ টাকার বেশি উপার্জন করতে পারেন না, এরকম একটি বিষয়ে সরকার এর আগে কখনও বাধা দিয়েছেন বলে আমরা শুনিনি। নদী থেকে মাছ ধরে বহু মানুষ যেভাবে সংসার চালান তেমনি নদীর নিচে জমে থাকা কয়লা তোলে কিছু মানুষ জীবন বাঁচান। সরকারের যেখানে স্পষ্ট নিষেধ নেই সেখানে এই দরিদ্র মানুষদের দীর্ঘদিনের পেশাকে চলতে দেয়াই উচিৎ বলে আমরা মনে করি। নতুবা দারিদ্রতা এইসব মানুষকে গভীরভাবে ঘিরে ধরবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কয়লা কুড়ানোর ফলে নদীর তলদেশ পরিষ্কার থাকে। নতুবা এই কয়লা ভেসে ফসলি জমি বিনষ্ট করতে পারে। সুতরাং কয়লা আহরণকে পরিবেশ-বান্ধবও বলা যেতে পাপরে।
তাহিরপুরের সহকারি কমিশনার (ভূমি) সঞ্চিত কয়লা যাচাই বাছাই করে দেখেছেন এগুলো মূলত বাংলা কয়লাই, চোরাই কয়লা নয়। তিনি যথার্থ মানবিক বিবেচনাবোধ থেকে বলেছেন, খুবই নি¤œআয়ের মানুষ এই কাজ করে পরিবার চালায়। এই সংবেদনশীলতাটুকোই আমাদের কাম্য। সরাসরি আইনের সাথে সাংঘর্ষিক হলে এবং পরিবেশ-প্রতিবেশের জন্য ক্ষতিকারক হলে সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তর, খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় বা রাজস্ব আহরণকারী কর্তৃপক্ষই এমন কর্মকা- নিষেধ করতেন। তা যেহেতু করা হয়নি সেহেতু দরিদ্র মানুষদের শ্রমলব্ধ পেশাটি যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তা নিশ্চিত করা জরুরি। পেশা হারানো মানুষগুলো জীবনের প্রয়োজনে অন্য পেশায় গিয়েছেন, যারা যেতে পারেননি তাদের অসহায়ত্ব মানবিকভাবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ মানুষকে বৈধ উপার্জনের পথ করে দেয়া কিংবা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়াও রাষ্ট্রকাঠামোর দায়িত্বভুক্ত বিষয় বটে।
তাহিরপুরের কয়লা কুড়ানো শ্রমিকদের দুর্ভোগ যন্ত্রণার অবসান হোক। বিজিবি ও জেলা-উপজেলা প্রশাসন তাদের প্রতি সর্বোচ্চ সংবেদনশীলতা প্রদর্শন করুন, এইটুকোই আমাদের প্রত্যাশা।

  • [১]