দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী যথাÑ ক্ষৌরকার, চর্মকার, ধোপা, বেদে প্রভৃতি পিছিয়ে পড়া পরিবারগুলোকে কিছুটা সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে বিশেষ ভাতা প্রদান কার্যক্রম চালু করেছে সরকার বেশ কয়েক বছর আগে। ভাতার পরিমাণ হয়তো বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে একেবারেই অকিঞ্চিৎকর কিন্তু এর মধ্য দিয়ে এই অবহেলিত জনগোষ্ঠীর প্রতি সরকার যে মনোযোগী সেই বিষয়টির প্রমাণ হয়। তাঁদের জীবনমানের ইতিবাচক পরিবর্তন সাধন সরকারের লক্ষ। সামাজিক ভাতা প্রদান কার্যক্রম এর একটি উপাদান মাত্র। সরকার আরও বহু উপায়ে এইসব জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূলে¯্রাতে ফিরিয়ে আনতে প্রতিশ্রম্নতিবদ্ধ। দলিত সম্প্রদায়ের এই বিশেষ ভাতা কার্যক্রমটি সরকার সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে থাকে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, জেলার তাহিরপুর উপজেলায় পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর এই বিশেষ ভাতা কার্যক্রম গত দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। ওই উপজেলায় ২৬ জন দলিত সম্প্রদায়ের ব্যক্তি ভাতা কার্যক্রমের আওতাধীন ছিলেন। না, সরকার ভাতা বন্ধ করেননি। পদ্ধতিগত প্রক্রিয়ায় ভাতা বিতরণ কার্যক্রম আটকে আছে এই দুই বছর ধরে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের স্থানীয় কর্মকর্তা বলেছেন, এমআইএস জটিলতার কারণে ভাতা বিতরণের কাজ বন্ধ ছিলো। অবশ্য আশার কথা তিনি শুনিয়েছেন। বলেছেন, এখন সে জটিলতা কেটে গেছে। তাদের পে—রোল অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাড়লেই ভাতাভোগীদের স্থানীয় ব্যাংক হিসাবে টাকা জমা হয়ে যাবে।
এমআইএস সিস্টেম সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াগত বিষয়। সরকার সব ধরনের সামাজিক ভাতা ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার নির্দেশনা দিয়েছেন। এই কাজ অতিশয় জটিল কোনো কাজ নয়। নির্দিষ্ট সফটওয়ারে ডাটা এন্ট্রি দিলে ভাতা গ্রহীতাদের যাবতীয় তথ্য কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারে যুক্ত হয়ে যায়। এমন একটি সহজ কাজে কেন দুই বছর সময় লেগে যায়, প্রশ্নটি এই জায়গায়। স্পষ্টতই অধিদপ্তরের উপজেলা কার্যালয়ের অবহেলা রয়েছে। নতুবা মাত্র ২৬ জন ভাতাগ্রহীতার তথ্য সফটওয়ারে যুক্ত করতে এত সময় লাগত না। এ থেকে আমাদের সরকারি দপ্তরগুলোর আমলাতান্ত্রিক শম্ভুক গতির চিরাচরিত অভ্যাসের বিষয়টি আবারও সকলের সামনে উন্মোচিত হলো। অন্যান্য উপজেলাগুলোতে অনুরূপ ভাতাগ্রহীতাদের অবস্থা কেমন আমরা জানি না। তবে তাহিরপুরের ঘটনা থেকে অনুমিত হয় সর্বত্রই হয়তো এই কাজে অনাকাক্সিক্ষত সময়ক্ষেপণের প্রপঞ্চটির সংশ্লিষ্টতা ছিল। সরকারি দপ্তরগুলোর সেবার মানোন্নয়নের বিষয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত তাদের সেবা—সক্ষমতা বাড়ানোর উপর গুরুত্ব দিয়ে মাঝে মধ্যেই উপদেশ প্রদান করে থাকেন। বাস্তবত প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বান মাঠ পর্যায়ে খুব বেশি সাড়া ফেলতে পারে না। এজন্য সরকারের বহু জনহিতকর কর্মসূচীর প্রকৃত সুফল জনগণের দোরগোড়ায় সঠিক সময়ে পৌঁছানো যায় না। আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার এরকম দুর্বলতা কাটিয়ে তোলা এই সময়ের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ বটে। সরকারের উপরের স্তর থেকে যেসব নীতি নির্ধারণ করা হয় তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয় মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা—কর্মচারীদের মাধ্যমেই। সুতরাং মাঠের স্থবিরতাকে দূর করা না গেলে সরকারের সবগুলো গণমুখী পদক্ষেপই প্রশ্নবিদ্ধ হবে স্বাভাবিকভাবে।
দলিত সম্প্রদায় হিসাবে আমরা যাদেরকে অভিহিত করে থাকি তাঁরা মূলত কোথাও নিজের অধিকারের কথা মুখ ফুটে বলতে পারে না। এরা সমাজের একেবারেই নিম্নস্তরে অবস্থান করেন। এদের প্রতি সকল পর্যায়ের সংবেদনশীল মনোভাব প্রত্যাশিত। তারা সরকারি নিয়ম—কানুন, প্রক্রিয়াগত ধাপসমূহ ইত্যাদি বিষয়ে একেবারেই অজ্ঞ। এদের প্রতি সহনাভূতিশীল হওয়ার মাধ্যমে আমাদের গণপ্রশাসন নিজেদের মানবিক চরিত্রের উদ্ভাসন ঘটাতে পারেন। তাহিরপুর উপজেলার দলিত সম্প্রদায়ভুক্ত ২৬ জন ভাতাভোগী যাতে দ্রুত তাদের বকেয়া ভাতাসহ সমূদয় প্রাপ্য ভাতা পেতে পারেন সেই ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমরা সমাজসেবা অধিদপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করি।