আমিনুল ইসলাম, তাহিরপুর
‘ষষ্ট শ্রেণিতে ভর্তি হবার পর থেকেই এরা ডিস্টার্ব করে। স্কুলে-যাওয়ার সময় বা প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার সময় পিছে পিছে যায়, নানা খারাপ কথা বলে, ছোট ছোট পাথর দিয়া ঢিল মারে, মোবাইলে আগে পিছে ছবি তুলে, সড়কের পাশে বাড়ি থাকায় ঘরের কাছে এসে মোটর সাইকেলের হর্ন বাজায়, উচ্চস্বরে অশ্লীল কথা বলে, কেউ কিছু বললে উল্টো হুমকি দেয়।’
‘আমিতো কলেজে পড়ি, ওদের ভয়ে বাড়ি থেকে বেরই হই না, বাড়িতে থেকেও শান্তি নাই, বর্ষায় নদীতে স্নান করতে যেতাম, ওরা নদীর অন্য পাড় থেকে, পারলে নৌকা লইয়া আইয়া কাছে থেকে মোবাইল দিয়া ছবি তুলে, ভিডিও করে, এখন আমরা নদীতে যাই না, বাড়ি’র টিউবওয়েলে স্নান (গোসল) করি, এখানে এসেও ছবি তুলে এরা, গ্রামের মুরুব্বিদের বাবায়-কাকায় জানানোয়, তারা বিচার করেছিলেন, এখন আরও বিপদ বাড়ছে, ঘরে এসে এসে মারধর করে গেছে।’
কথাগুলো তাহিরপুর উপজেলার টাকাটুকিয়া গ্রামের ৮ম শ্রেণি পড়ুয়া পপি বর্মণ ও কলেজ পড়ুয়া মেয়ে চামেলী বর্মণের।
পপি ও চামেলীদের বাড়িতে দেশীয় অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে বুধবার হামলা চালিয়েছে টুকেরগাঁও গ্রামের একদল বখাটে। হামলায় বৃদ্ধ ও নারীসহ ৮ জন আহত হয়েছে। বুধবার দুপুরে দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের টাকাটুকিয়া গ্রামের দেবেন্দ্র বর্মণের বাড়িতে এই ঘটনা ঘটে। রাতে ১৩ জনের নামোল্লেখ করে ২৫ জনকে আসামী করে দেবেন্দ্র বর্মণের ছেলে সত্যেন্দ্র বর্মণ বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেছেন। এ ঘটনায় পুলিশ বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা পর্যন্ত ২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বৌলাই নদীর পূর্ব পাড়ের গ্রাম টুকেরগাঁও। পশ্চিম পাড়ে টাকাটুকিয়া গ্রাম। টাকাটুকিয়া হিন্দু ও মুসলিম ধর্মাবলম্বিদের পুরোনো গ্রাম। মিলে মিশে বসবাস এই গ্রামের মানুষের বহুদিনের। পশ্চিমপাড়ে ৩০-৩৫ বছর ধরে ভৈরব থেকে এসে বসতি স্থাপনকারীরা গ্রাম গড়ে তুলেছেন। এই গ্রামের কিছু বখাটে তরুণ বহুদিন ধরেই বর্মণ পাড়ার স্কুল পড়ুয়া ছাত্রীদের উত্যক্ত করে আসছে।
টাকাটুকিয়া গ্রামের বিশিষ্টজনেরা জামালগড়, রসুলপুর ও টুকেরগাঁও গ্রামের গণ্যমান্যদের উপস্থিতিতে শালিস বৈঠক করে টুকেরগাঁওয়ের মোক্তার আলীর ছেলে বখাটে কাশেম মিয়া ও পাবেল মিয়া, শহীদ মিয়ার ছেলে লাইট মিয়া ওরফে রুহিত, বিল্লাল মিয়ার ছেলে মুসা মিয়া ও মুক্তার আলীর ছেলে পাবেল মিয়াকে বখাটেপনার জন্য সামাজিক বিচারে শাস্তি দিয়েছিলেন। ভবিষ্যতে এমন কাজ করবে না বলে শালিসে অঙ্গিকার করেন কাশেম মিয়া, লাইট মিয়া, মুসা মিয়া ও পাবেল মিয়া। শালিসে অভিযুক্তদের কান ধরে উট বস করানো হয়।
এই বিচারের পর আরও ক্ষেপে যায় এই বখাটেরা। তারা নানাভাবে বর্মণ পরিবারের লোকজনের ক্ষতি করতে থাকে। ৬ মাস আগে দেবেন্দ্র বর্মণের ছেলে বাছিন্দ্র বর্মণের ৫০ হাজার টাকা মূল্যের জালে আগুন দেয়। এরপর খড়ের ঘর জ¦ালিয়ে দেওয়া হয়। বুধবার ৩০-৩৫ জনের সশস্ত্র দল টাকটুকিয়ার বর্মণ বাড়িতে হামলা করে পুরুষ মহিলাদের মারপিট এবং ঘরের আসবাবপত্র ভাংচুর করেছে।
হামলায় আহত হয়েছেন দেবেন্দ্র বর্মন (৭০), তার ছেলে বাছিন্দ্র বর্মণ (৫০), সত্যেন্দ্র বর্মণ (৪৫), সঞ্চিত বর্মণ (৩০) বাছিন্দ্র বর্মণের স্ত্রী বিউটি বর্মণ (৪৫), ছেলে বাবলু বর্মণ (১৭), শিপলু বর্মণ (১৫) ও তাদের আত্মীয় দেবল বর্মণ (২২)। আহদের প্রথমে তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছিল। বাছিন্দ্র, বিউটি ও বাবলু বর্মণের অবস্থা আশংকাজনক হওয়ায় তাদেরকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
বাছিন্দ্র বর্মণের মেয়ে পপি বর্মণ বললো, গ্রামের গণ্যামান্যরা বখাটেদের বিচার করার পর থেকে এরা আরো ক্ষেপে যায়। সব সময় ধারালো চাকু নিয়ে ঘুরে এরা। বাড়ির চতুরদিকে আগে ত্রিপাল দিয়ে বেড়া দেওয়া ছিল। এখন টিন দিয়ে বেড়া দেওয়ায় উৎপাত আরো বাড়িয়েছে। শুকনো মওসুমে নদী শুকিয়ে গেলে উৎপাত আরো বেড়ে যায়। বুধবার আমার কাকা সঞ্জিত বর্মণ আমাদের আত্মিয়ের জমি থেকে মাটি কাটতে যান। ওরা এসে বলে, মাটি কেন কাটছো, আমার কাকা বলছিল আমাদের আত্মীয়ের জমির মাটি নিচ্ছি, তোমাদের কি হলো। সঙ্গে সঙ্গে আমার কাকা ও দুই ভাইয়ের উপর চড়াও হয় তারা। এরা দৌড়ে বাড়িতে আসলে ২৫-৩০ জন মিলে বাড়ি এসে আক্রমণ করে তারা। আমি বাবার সঙ্গে ঘরের বেড়া দেবার কাজ করছিলাম, আমাকে এসে লাথি দিয়ে মাটিতে ফেলে আমার বাবাকে মারপিট করে। আমার বড় বোন ও ভাই বাবলু আরেক বাড়িতে (শ্যামল আচার্যের বাড়িতে) লুকিয়েছিল। ওই ঘর থেকে বাবুলকে ধরে এনে নির্মমভাবে পিঠিয়েছে বখাটেরা। আমার মা ফেরাতে গিয়েছিল, তার হাত ভেঙে দিয়েছে। পপির বড় বোন চামেলী বললো, এখন আর আমরা পারছি না, গ্রামে থাকতে পারবো কি না জানি না।
গ্রামের বাসিন্দা স্কুল শিক্ষক নারায়ণ বর্মণ বলেন, নদী না থাকলে সারা বছরই যন্ত্রণা দিতো টুকেরগাঁওয়ের বখাটেরা। ওদের যন্ত্রণায় গ্রামের মেয়েরা বাড়ি থেকে বের হতেই ভয় পায়। একবার গ্রামে সালিশ করে ওদের শাস্তি দেওয়া হয়। সেই থেকে আরও উৎপাত বাড়িয়েছে।
অভিযুক্ত মুসার বাবা বিল্লাল মিয়া বললেন, ঘটনার সঙ্গে বড় কেউ যুক্ত নয়। ছোট বাচ্চাদের ঝামেলা এটি। আমরা কিছুই জানি না।
তাহিরপুর থানার ওসি আব্দুল লতিফ তরফদার জানান, টাকাটুকিয়া গ্রামের বর্মণ পাড়ার মেয়েদেরকে পার্শ্ববর্তী টুকেরগাঁও গ্রামের কিছু বখাটে উত্যক্ত করত। এর জের ধরে বর্মণ পাড়ার এক ছেলেকে রাস্তায় পেয়ে মারধর করেছে টুকেরগাঁও গ্রামের ছেলেরা। তার চিৎকার শুনে পরিবারের লোকজন রক্ষা করতে গেলে তাদেরকেও নাকি মারধর করেছে। আহত তিন জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বুধবার গভীর রাতে সত্যেন্দ্র বর্মণ বাদী হয়ে ১৩ জনের নামোল্লেখ করে ২৫ জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করেছেন। মামলার আসামী শহীদ মিয়া ও সিরাজ মিয়া নামের দুজনকে আটক করা হয়েছে।

