- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ, ২ বছর ধরে ইএলজি’র বরাদ্দ না পাওয়া দুর্ভাগ্যজনক

গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, ‘কার্যকর ও জবাবদিহিতামূলক স্থানীয় সরকার প্রকল্প (ইএলজি)’ এর আওতায় নির্ধারিত অনুদান প্রাপ্তি থেকে জেলার তাহিরপুর উপজেলা গত দুই বছর ধরে বঞ্চিত হচ্ছে। বঞ্চিত হচ্ছে বলা ঠিক হবে না, বলতে হবেÑ তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ ওই অনুদান প্রাপ্তির ন্যূনতম যোগ্যতা অর্জন করতে পারছে না। প্রকল্পের আওতায় উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য বছরে ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এই হিসাবে গত দুই বছরে নিশ্চিত এক কোটি টাকা গ্রহণ করতে পারল না উপজেলা পরিষদটি। এই টাকা দিয়ে যেটুকু উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল সেই পরিমাণ উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হল তাহিরপুরবাসী। ব্যর্থতাটি কার? এ নিয়ে মঙ্গলবার প্রকল্পের একটি ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওরিয়েন্টেশনে সভাপতিত্ব করা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এজন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি সামনের দিনে উপজেলা পরিষদের কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করার আহ্বান জানিয়েছেন। বস্তুত উপজেলা পরিষদগুলো এখন কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে তাহিরপুর উপজেলার ইএলজি প্রকল্পের অনুদান প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঘটনা থেকে তা বেশ বুঝা যায়। ইএলজি প্রকল্প খুব কঠিন কোন শর্ত আরোপ করেনি। তারা উপজেলা পরিষদের উপকমিটিগুলোর কার্যকারিতা দেখতে চায়। তারা পঞ্চবাষির্কী পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মধ্যে সামঞ্জস্য দেখতে চায়। তারা চায় উপজেলা পরিষদ ম্যানুয়েল অনুসারে ওই পরিষদের কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন হচ্ছে কি—না এবং ম্যানুয়েল ও বিধি অনুসারে রেকর্ডপত্র সংরক্ষণ করা হয় কি—না তা যাচাই করতে। কোন শর্তারোপ ছাড়াই এই কাজগুলো প্রতিটি উপজেলায় বাস্তবায়ন হওয়ার কথা। কিন্তু হচ্ছে যে না তাহিরপুরের ঘটনা এর জলজ্যান্ত প্রমাণ। এই ধরনের নিষ্ক্রিয়তা যেমন একটি উপজেলা পরিষদকে দুর্বল করে দেয় তেমনি ওই উপজেলা পরিষদ জনগণের কাক্সিক্ষত সেবাদানের জায়গায়ও বেশ পিছিয়ে থাকে। তাই উপজেলা পরিষদগুলোকে অবশ্যই গতিশীল হয়ে উঠতে হবে।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে উপজেলায় উন্নয়ন সমন্বয় কমিটি রয়েছে। এর বাইরে ভাইস চেয়ারম্যানদের নেতৃত্বে রয়েছে বিভিন্ন দপ্তর ভিত্তিক উপকমিটি। উপকমিটিতে বিভাগওয়ারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তা উপজেলা সমন্বয় কমিটিতে উপস্থাপনের নিয়ম। কিন্তু কেন যেন উপজেলা চেয়ারম্যানরা এই উপকমিটিগুলোকে গুরুত্ব দিতে চান না। ফলে অধিকাংশ উপজেলায়ই এই উপকমিটিগুলোর কোন সভা অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায় না। এটি স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার মৌল ধারণার সাথে অসংগতিপূর্ণ। উপজেলা চেয়ারম্যানদের পক্ষ থেকে উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক তাদের উপেক্ষা করার অভিযোগ আনয়ন করা হয়। কিন্তু তারা নিজেরা যখন ভাইসচেয়ারম্যানের অধিক্ষেত্রকে স্বাধীনভাবে বিকশিত করার জায়গায় অনান্তরিক থাকেন তখন একে আমরা কী বলতে পারি? জনপ্রতিনিধিত্ব মূলত একেবারে প্রাথমিক স্তর থেকে ক্রমান্বয়ে উর্দ্ধারোহণ চর্চার উপর নির্ভরশীল। কিন্তু কেন জানি আমরা সকলেই নিজেকে ছাড়া আর কাউকে ক্ষমতায়িত করতে চাই না। এই মনোভাবের ফলেই আজ আমলাতন্ত্র যেমন ঘিরে ধরেছে পরিষদের জনপ্রতিনিধিত্ব করার জায়গাকে তেমনি পরিষদের অভ্যন্তরের চর্চাও একই রকমের কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাচর্চামুখী। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে না আসলে প্রকৃত জনপ্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার খায়েশ কেবল কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
কীভাবে জনপ্রতিনিধিত্ব করতে হয়, স্থানীয় সরকার কীভাবে পরিচালিত হবে সেই বিষয়টি আজ দাতাসংস্থা প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে আমাদের শিখাচ্ছে। এরচাইতে দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা আর কিছু হতে পারে না। আমাদের জনপ্রতিনিধিদের আত্মসমালোচনা করতে হবে। তাঁদেরকে অবশ্যই ক্ষমতাচর্চার জায়গা থেকে সরে এসে সেবাধর্মিতার মর্ম উপলব্ধি করতে হবে। তবেই স্থানীয় সরকারের সবগুলো অঙ্গ সমানভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে। তাহিরপুর উপজেলা পরিষদটি একটি কার্যকর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে উঠুক এই আমাদের কামনা।

  • [১]