আমিনুল ইসলাম, তাহিরপুর
সাম্প্রতিক বন্যায় তাহিরপুর সীমান্ত এলাকার ৯টি পাহাড়ি ছড়া দিয়ে ঢলের পানির সঙ্গে বালু ও পাথর এসে প্রায় এক হাজার একর ফসলি জমি চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে তাহিরপুর সীমান্তে নেমে আসা ছড়াগুলো হলো নয়া ছড়া, পাতিল ভাঙ্গা ছড়া, রঙ্গা ছড়া, বুরুঙ্গা ছড়া, লাকমা ছড়া, লালঘাট ছড়া, চারাগাঁও ছড়া, বাগলী ছড়া ও বাঁশতলা ছড়া।
সরেজমিন দেখা যায়, এ ছড়াগুলোর অবস্থান উপজেলার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়ন ও বড়দল উত্তর ইউনিয়নে। চারাগাঁও ছড়া এলাকায় কথা হয় চারাগাঁও গ্রামের চান মিয়া মুন্সীর (৭৫) সঙ্গে। তিনি বলেন, পাহাড় থেকে নেমে আসা চারাগাঁও ছড়াটি ছিল খুবই গভীর। এ ছড়ার পানি বাঁশতলা, লালঘাট হয়ে সমসার হাওরে গিয়ে দ্রুত নেমে যেত। কিন্তু গত প্রায় দুই যুগ ধরে মেঘালয় পাহাড় থেকে প্রচুর পরিমাণ বালু ও পাথর এসে ছড়াগুলো ভরে যায়। এতে পাহাড়ি ঢল আসা মাত্রই ছড়ার পানি উপচে আশপাশের সব ফসলি জমি বালুর নিচে পড়ে চাষাবাদের একেবারেই অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, চারাগাঁও ছড়া এলাকায় তার তিন কিয়ার (৩০ শতকে এক কিয়ার) জমি রয়েছে, কিন্তু তা তিনি ১৫/১৬ বছর ধরে চাষাবাদ করতে পারছেন না।
উত্তর বড়দল ইউনিয়নের রাজাই গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মুতালিব বলেন, ২০০৮ সালে মেঘালয় পাহাড় ধসে চানপুর এলাকার নয়াছড়ায় প্রায় ২শ’ একর ফসলি জমি বালুর নিচে পড়ে যায় এবং ৫০টি বসতঘর বালুর নিচে চাপা পড়ে। এ নিয়ে তারা উন্নয়ন সংস্থা ‘বারসিক’র সহযোগিতায় ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে বিভিন্ন দাবি দাওয়া তুলে সংবাদ সম্মেলনও করেছেন।
উত্তর বড়দল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন বলেন, তাহিরপুর সীমান্তে যে ৯টি পাহাড়ি ছড়া রয়েছে সে ছড়াগুলো থেকে বালু-পাথর না সরালে সীমান্ত এলাকার বাড়িঘর, রাস্তাঘাট কিছুই রক্ষা করা যাবে না।
তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাসান-উদ-দৌলা বলেন, তাহিরপুর উপজেলার সীমান্ত এলাকার ৯টি পাহাড়ি ছড়া বালুতে ভরাট হয়ে যাওয়ায় সীমান্ত এলাকার প্রায় এক হাজার একর ফসলি জমি চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
সুনামগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুব আলম বলেন, তাহিরপুর উপজেলার পাহাড়ি ছড়াগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় ছড়ার পানি আশপাশের চারদিকে ছুটে আসছে। এতে এলজিইডির নির্মাণাধীন রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ছড়াগুলো খনন করা খুবই জরুরি।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তে পাহাড়ি ছড়াগুলো পরিদর্শনে গিয়েছিলেন সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন তাহিরপুরের ইউএনও পদ্মাসন সিংহ, ২৮ বিজিবি সুনামগঞ্জের উপ-অধিনায়ক মাহবুবুর রহমান ও সুনামগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুব আলম। তারা সীমান্তের চারাগাঁও ও নয়াছড়া এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের সমস্যাগুলো সমাধানের আশ্বাস দেন। ২৮ বিজিবি সুনামগঞ্জের উপ-অধিনায়ক মাহবুবুর রহমান বলেন, সীমান্তের ২শ’ গজের ভেতরে থেকে কাজ করতে হবে। এলাকার লোকজন অনেক সময় কাজ করতে করতে সীমান্তের ভেতরে চলে যায়। এ নিয়ে আমাদের অনেক সমস্যায় পড়তে হয়। ২শ’ গজের বাইরে থেকে বালু উত্তোলন করতে হলে ইউএনওকে চিঠি দিয়ে আমাদের জানাতে হবে।
সুনামগঞ্জ- ১ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বলেন, মেঘালয় পাহাড় থেকে বালু ও নুড়ি পাথর এসে তাহিরপুর উপজেলার ছড়াগুলো ভরে যাওয়ায় ছড়াতে সামান্য পানি হলেই উপচে গিয়ে ফসলি জমি নষ্ট হচ্ছে। সেক্ষেত্রে ছড়াগুলো খনন করতে প্রশাসন ও এলাকার দায়িত্বশীলদের সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।