- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

তিনি আমাদের মননে জীবিত আছেন

উমা ভট্টাচার্য্য
দিপালী চক্রবর্তী একটি আন্দোলনের নাম। সারাটা জীবন থেমে থাকাকে মেনে না নিয়ে- সকল বাধা উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে চলার নাম দিপালী চক্রবর্তী। ২০০৩ সালের ৩১ মে, এই মহীয়সী নারী পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন। আজ দিপালী চক্রবর্তীর ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকী।
দিপালী চক্রবর্তীর জন্ম জগন্নাথপুরের ভবানীপুরে এক সম্ভ্রান্তÍ চৌধুরী পরিবারে। বিয়ে হয়ে আসেন সুনামগঞ্জ শহরে উকিলপাড়ায়। উনার স্বামী মনোরঞ্জন চক্রবর্তী গ্রামে থাকায় এবং সেই সময় নিয়ম অনুযায়ী অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ায় দিপালী চক্রবর্তীর আগ্রহ থাকা সত্বেও পড়াশোনায় বেশি এগোতে পারেন নি। শহরে আসার পর এবং সংসারটাকে কিছু গুছিয়ে নেয়ার পর তিনি এইদিকে মনোযোগী হলেন। পর্যায়ক্রমে এস.এস.সি, এইচ.এস.সি, বি.এ পাশ করলেন। যদিও ওই সময়ের সামাজিক পরিস্থিতিতে এই ছোট শহরে মেয়েদের রাজনীতি করার এমন সুযোগ ছিল না। তারপর তিনি ছাত্র রাজনীতিতে স্বদম্ভে পদচারণা করেছেন। সাত সন্তানসহ আত্মীয়স্বজন ও আশ্রতিদরে বিশাল পরিবার সামলিয়ে তিনি সবার সাথে সমান তালে রাজনীতি চালিয়ে গেছেন। রাজনৈতিক কর্মীরা দিদি বলে তাকে সম্বোধন করতেন। তখন পাকিস্তান সরকারের নির্যাতনের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর নেতৃতে সারা বাংলা জেগে উঠেছে। ১৯৬৫ সালে এমনি এক সময়ে বর্তমান কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী সুনামগঞ্জ এলেন। জগৎজ্যোতি পাঠাগারে ছাত্র ইউনিয়নের সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে তাকে কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত করা হয়। তারপর থেকে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের মতিয়া গ্রুপের নেত্রী হিসেবে বিপুল পরিচিত লাভ করেন। ১৯৬৬ সালে ৯ ও ১০ অক্টোবর ছাত্র ইউনিয়ন সুনামগঞ্জ মহকুমা শাখার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় সভানেত্রী মতিয়া চৌধুরী। এই সম্মেলন অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন দিপালী চক্রবর্তী। উপস্থিত ছিলেন বামপন্থী রাজনীতিবিদ বরুণ রায়, আলফাত উদ্দিন আহমেদ (মোক্তার সাহেব), আলী ইউনুস, সাবেক সাংসদ নজির হোসেন, গুলজার আহমেদ প্রমুখ। পরবর্তীতে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সকল আন্দোলনে এই নেতৃবৃন্দের সাথে কাজ করেন তিনি। একাত্তরে যুদ্ধের সময়ও বালাটে (ভারত) শরণার্থীদের সেবায় আত্মনেিয়াগ করেন। পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় ওইখানে অবস্থানরত নেতৃবৃন্দের সাথে সমানতালে কাজ করেন।
যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালে প্রথম দিকে তরুণ শিল্পীদের সংঘবদ্ধ করে মূলত বাম রাজনীতির ধারাকে পুষ্ট করতে গঠন করেন উদীচী শিল্প সংস্থা। এতে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন। সাথে সাথে সমাজের পিছিয়ে থাকা নারীদের প্রতিষ্ঠা করতে মহিলা সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। এই কাজের জন্য তিনি নিজ বাড়ির একটি কক্ষ মহিলা সমিতির ব্যবহারের জন্য ছেড়ে দেন। দুঃখের বিষয় পরবর্তীতে এই সিদ্ধান্তটি তার পারিবারিক জীবনকে দুর্বিষহ করে ফেলে। একসময় মতিয়া চৌধুরীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের যোগদান করে মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত হন। সমাজের মহিলাদের করুণ দশা তাকে খুব কষ্ট দিত তাই তিনি সমাজে পিছিয়ে পড়া মহিলাদের সাহায্যর্থে মহিলা পরিষদকে আবার জাগিয়ে তুলেন। ছুটে যান গ্রামে গঞ্জে অসহায় নারীদের বাঁচানোর তাগিদে। রুখে দাঁড়ান বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে। নারীদের সাবলম্বী করতে মহিলা সমবায় সমিতির মাধ্যমে সভাপতি হিসেবে হাজার হাজার দুস্থ মহিলাকে সহায়তা করেন। এর মাধ্যমে অনেক মহিলা আজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। হিন্দু মহিলাদের কুসংস্কারমুক্ত করতে সুনামগঞ্জে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সারদা সংঘ।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন খুবই সংস্কৃতমনা এবং সামাজিক। তিনি গানের সাথে সাথে খুব ভালো এসরাজ বাজাতে পারতেন। নিজের ছেলে মেয়েদের তিনি গান শেখাতে উৎসাহ দিতেন। সুনামগঞ্জ জেলায় সংস্কৃত পীঠস্থান হিসেবে তাঁর বাড়িকেই বোঝানো হতো। ডঃ মৃদুল কান্তি চক্রবর্তী, রতœা চক্রবর্তী এই পারিবারিক আবহে বেড়ে উঠে সংগীত জগতে সুনাম অর্জন করেছিলেন। আমি আসার পর অনেকের মুখেই তার স্নেহশীল হৃদয় ও কর্মমুখর জীবণের কথা শুনে আপ্লুত হয়েছি। সবসময়ই কাজের মধ্যেই নিজেকে ব্যস্ত রাখতেন। রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানেও তাকে দেখা যেত সবার আগে। সারাদিনই তার বাসা মানুষের পদচারণায় গমগম করতো। সেই সময় যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ অন্যান্য বিভিন্ন কারণে কেউ বিপদে পড়লে তাঁর বাসায় থাকাসহ সাধ্যমত সহায়তা করতেন।
আমার মনে হয় এই মহীয়সী নারীর কথা যতই লিখা যাবে ততই কম পড়বে! আজ দিপালী চক্রবর্তীর ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। দিপালী চক্রবর্তীকে নিয়ে লিখার ইচ্ছা অনেকদিন ধরে মনে লালন করে আসছিলাম। আজকের এই দিনে উনাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। এই কথা বলে ইতি টানতে চাই- তিনি আমাদের মননে জীবিত আছেন, থাকবেন। আমরা যে পথে চলছি হয়ত দিপালী চক্রবর্তীই আমাদের নারী জাগরণের পথ প্রদর্শন করে যাবেন। উনার জীবন সংগ্রাম, দেশ ও সমাজের জন্য যে কর্মযজ্ঞ তিনি শুরু করেছিলেন তা আসলেই অতুলনীয়।
লেখক : শিক্ষিকা, সৃজন বিদ্যাপীঠ।

  • [১]