- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

তিন শিক্ষকই অনুপস্থিত বিদ্যালয়ের দরজা বন্ধ!

বিশেষ প্রতিনিধি
এক সময় বিদ্যালয়টিতে ৩-৪ শ’ শিক্ষার্থী ছিল। আশপাশের গ্রামে স্কুল হওয়ায় এবং বিদ্যালয়ে পড়াশুনা না হওয়ায় বছরে বছরে শিক্ষার্থী কমেছে। এখন আর বিদ্যালয়ের দরজাই খোলা হয় না। মঙ্গলবারও বিদ্যালয় বন্ধই ছিল। ৩ জন শিক্ষকের ৩ জনেই ছুটিতে। বিদ্যালয়ে পড়াবে কে, এমন প্রশ্ন রেখে নিজের গ্রাম শাল্লা উপজেলার জাতগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বেহাল অবস্থার কথা জানালেন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অভিভাবক মো. হীরা মিয়া।
হীরা মিয়ার বাড়ি জাতগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লাগুয়া। বললেন, গত ডিসেম্বর মাসের বার্ষিক পরীক্ষার পর বিদ্যালয়ে পাঠদান একেবারেই হয় নি। মাঝে মাঝে স্কুলে এসে একটি ছেলে পতাকা টানায় (টাঙায়)। আর কিছুই হয় না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা হয়। কয়েক বছর পরই এটি সরকারিকরণ হয়। শুরু’র দিকে আশপাশের গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল না, এই বিদ্যালয়ে পড়াশুনাও ভাল হতো। এজন্য শিক্ষার্থীও বেশি ছিল। গত কয়েক বছরে আশপাশের গ্রামে বিদ্যালয় হয়েছে, অন্যদিকে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে না আসায় পাঠদান হয় না। এ কারণে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে ৪৯ জন হয়েছে।
জাতগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি সবুজ মিয়া বললেন, গত ডিসেম্বর মাসে বার্ষিক পরীক্ষার পর একদিন এসে শিক্ষার্থীদের বই দিয়েছিলেন শিক্ষকরা। এরপর অনেক দিন বিদ্যালয়ের দরজা খোলা হয় নি। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কমকর্তার কাছে গ্রামের অভিভাবকরা বিষয়টি লিখিতভাবে জানায়। পরে এই বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে তদন্ত হয়। এরপর আর কিছু হয় নি। বিদ্যালয়ের অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। এখন বিদ্যালয়ের দরজাই খোলা হয় না। প্রাচীন এই বিদ্যালয়টি বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছে।’
তিনি জানান, বিদ্যালয়ের ৩ জন শিক্ষকের মধ্যে একজন সহকারী শিক্ষক (মিতালী রানী তালুকদার) মাতৃত্বকালীন ছুটিতে রয়েছেন। আরেক সহকারী শিক্ষক (লক্ষী রানী দাস) বিপিএড’এ আছেন। পহেলা মার্চ থেকে প্রধান শিক্ষক (অনাদী কুমার তালুকদার) অসুস্থতাজনিত ছুটিতে রয়েছেন। শুনেছিলাম এই বিদ্যালয়ে অন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তিনজন শিক্ষককে ডেপুটেশনে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা কেউই মঙ্গলবার পর্যন্ত যোগদান করেন নি।
অসুস্থাজনিত ছুটিতে থাকা প্রধান শিক্ষক অনাদী কুমার তালুকদার বলেন,‘২০১৭ সালে এই বিদ্যালয়ে আমি যোগদান করার আগে বিদ্যালয়ের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। আমি বিদ্যালয়টির পড়াশুনার মানোন্নয়ন ঘটিয়েছি। বিদ্যালয়ের ৩ জন শিক্ষকের একজন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে, একজন বিপিএড’এ রয়েছেন। আমি একাই অনেকদিন বিদ্যালয় চালিয়েছি। শিক্ষক চেয়েও পাই নি। এখন আমি অসুস্থ। ডাক্তার বলেছেন কমপক্ষে একমাস বিছানায় থাকতে হবে আমাকে। আমি বাধ্য হয়ে পহেলা মার্চ থেকে ছুটি নিয়েছি।
ভারপ্রাপ্ত উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দিন মোহাম্মদ বলেন, বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক মাতৃত্বকালীন এবং আরেকজন রয়েছেন বিপিএড’এ। প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ে আসেন না জানিয়ে শিক্ষার্থী অভিভাবকরা আবেদন করায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে তদন্ত হয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে পাঠানোর পর ওখান থেকে আরেক দফা তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনিও এখন অসুস্থাজনিত ছুটিতে আছেন।
তিনি জানান, পহেলা মার্চ জাতগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অসুস্থতাজনিত ছুটিতে যাবার পর ৩ রা মার্চ উপজেলার মৌরাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বেলা রানী দাস, একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ক্ষিতিশ চন্দ্র দাস, কলাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ছবি রানী দাসকে জাতগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংযুক্তি দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে ৩ মার্চেই চিঠি দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককেও অবহিতকরণ চিঠি দেওয়া হয়েছে। তারা কেন যোগদান করলেন না, ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। একই সঙ্গে অন্য শিক্ষক সংযুক্তি দিয়ে হলেও জাতগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চালু’র ব্যবস্থা করা হবে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান জানান, জাতগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে তদন্ত করার জন্য সদর উপজেলার সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সোলেমান মিয়াকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সদর উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সোলেমান মিয়া জানিয়েছেন, তিনি সোমবারই এই বিদ্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে তদন্তের জন্য জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার দেওয়া চিঠি পেয়েছেন। এই মাসেই তিনি ওখানে তদন্তে যাবেন।

  • [১]