বিশেষ প্রতিনিধি
দিরাই উপজেলার বরাম হাওরের গুড়খাই (তুফানখালি) ও বোয়ালিয়া বাঁধে ফসল রক্ষা হয় দিরাই—শাল্লা, খালিয়াজুরি, ইটনা—মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের সীমানা পর্যন্ত বড় বড় হাওরের। বোয়ালিয়া বাঁধ এখনই ধসে গেছে। তুফানখালীর বাঁধে এখনো মাটি পড়ছে। স্থানীয় রাজাপুর গ্রামের বড় কৃষক ছাত্তার মিয়া বললেন, এই বাঁধগুলোর কাজ আরও আগে শেষ করা জরুরি ছিল। একই এলাকার আমিরপুরের বড় কৃষক শামছুল হক বললেন, বোয়ালিয়ায় খুবই দুর্বল বাঁধ হয়েছে। এই বাঁধ ভেঙে যাওয়ার শঙ্কা আছে। ৪—৫ দিন আগে বাঁধে ধ্বস শুরু হয়েছে। তুফানখালীর বাঁধের মাটি কমপেকশন হতে হতে পানি চলে আসবে।
কেবল তুফানখালী বা বোয়ালিয়া নয় হাওরের জেলা সুনামগঞ্জের অনেক বড় বড় বাঁধের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হয় নি। দিরাইয়ের উজানধলের পাশের বড় বাঁধে বৃহস্পতিবারও এক্সভেটর দিয়ে মাটি দিতে দেখা গেছে।
দিরাইয়ের রাজাপুর গ্রামের বড় কৃষক আব্দুস ছাত্তার বললেন, বরাম হাওরের গুড়খাই বা তুফানখালী, বোয়ালিয়া, উদগল বিলের মাছুয়ার খাড়া, বৈশাখী বাঁধ এগুলোর নাম শুনলে, দিরাই—শাল্লা বা ভাটি অঞ্চলের কৃষকদের বুক ধরপর করে। এই বাঁধগুলো ভাঙলে মুহূর্তেই লাখো কৃষকের এক বছরের স্বপ্ন পানিতে তলিয়ে যাবে।
তিনি বললেন, বাঁধের কাজের জন্য কৃষক উল্লেখ করে যাদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে, হাওর রক্ষা বাঁধ ভেঙে গেলেও তাদের কিছু যায় আসে না। হাওর ডুবলে যারা পথে বসবে, তাদেরকে বাঁধের কাজে যুক্ত করলে তারা আগ্রহী হয়ে আরও আগে বাঁধের কাজ শেষ করতো। কাজে যাদের যুক্ত করা হয়েছে প্রকৃতপক্ষে তাদের নেপথ্যে আরেক গ্রুপ আছে, তারা পুঁজি দিয়েছে। এই হাওর ডুবে গেলেও ওদের কিছু যায় আসে না।
আমিরপুরের শামছুল হক ও রাজাপুরের ছত্তার মিয়া দুজনেই বললেই, বরাম ও উদগল বিলের পাড়ের বাঁধগুলোর কাজ ৬০ ভাগের বেশি শেষ হয় নি।
শাল্লার হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি তরুণ কান্তি দাস বললেন, বাঁধের কাজে মাত্রাহীন অনিয়ম হচ্ছে। ছায়ার হাওরের খালিয়াজুরি অংশে পুরাতন বাঁধ কেটে প্রশস্ত করা হয়েছে। মাদারিয়া বাঁধে উচ্চতা বাড়ানো হয়েছে। প্রশস্ততা নেই বললেই চলে। এই বাঁধে আনন্দপুরের রবীন্দ্র চন্দ্র দাসের ছেলে রানা রঞ্জন দাসকে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সম্পাদক দেখানো হয়েছে। গ্রামবাসী জানিয়েছেন, গ্রামে এই নামে কেউ নেই। অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প এবং নামেমাত্র কাজ করে লাখ লাখ টাকার বিল উত্তোলন করার ফন্দি উপজেলার ১৩৮ প্রকল্পের বেশিরভাগেই বলে দাবি তরুণ কান্তি দাসের।
সুনামগঞ্জের ৫২ টি বড় হাওরের ফসল রক্ষার জন্য এবার ৬৬ কোটি ২৩ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। ৭২৪ টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি ৫৩২ কিলোমিটার বাঁধের এবং ১৩০ টি ক্লোজারে (ভাঙন) কাজ হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন নির্বাহী প্রকৌশলী (১) জহুরুল ইসলাম অবশ্য দাবি করেছেন, ৭২৪ টি প্রকল্পেই বাঁধের কাজ সমাপ্ত। ৮৫ ভাগ কাজ শেষ। বাকী কাজ দ্রুতই শেষ হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (২) মো. শামছুদ্দোহা দিরাইয়ের বরাম হাওরের তুফানখালি বাঁধের কাজের বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, এই বাঁধটি অনেক ঝুঁকিপূর্ণ, বাঁধের আশপাশ অংশ অনেক গভীর ছিল। ওখানে পিআইসি হতে কেউ রাজি হচ্ছিল না। প্রধান প্রকৌশলী আমাদের নিয়ে কয়েকদিন গেছেন ওখানে। বাঁধের কাজ এখন শেষের দিকে। বোয়ালিয়া বাঁধে ধসের কথা স্বীকার করে তিনি বললেন, পানির প্রাথমিক ধাক্কায় এই বাঁধের কিছুই হবে না। বাঁশ, বস্তা দিয়ে বাঁধ টেকসই করা হবে।