বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় প্লাবিত হয়েছে গোটা জামালগঞ্জ। ১৬ জুন সন্ধ্যা থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত রেকর্ড পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে পুরো উপজেলা। মাত্র ১২ ঘন্টার ব্যবধানে তেড়েফঁুড়ে আসা পানির ভয়ংকর থাবায় তলিয়েছে সমগ্র লোকালয়। এ বন্যা বিগত পঞ্চাশ বছরের নানা সময়ে সৃষ্ট বন্যার ভয়াবহতাকেও পেছনে ফেলে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে বলে ধারণা পাওয়া গেছে।
সাম্প্রতিক বন্যায় প্রায় সব বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে পুরো উপজেলা। এ সময় চরম দুর্ভোগ ও সীমাহীন কষ্টের মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করেছে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন প্রায় দেড় লক্ষাধিক মানুষ। তবে ধীরে ধীরে বন্যার নেতিবাচক খবর চাউর হতে থাকলে ত্রাণ সহায়তায় এগিয়ে আসে সরকারি—বেসরকারি বিভিন্ন মাধ্যম। একপর্যায়ে বন্যা কবলিত মানুষের হাতে হাতে পেঁৗছতে থাকে ত্রাণের প্যাকেট। এমনকি ত্রাণ পাওয়ার খবর শুনামাত্রই নির্ধারিত স্থানে হুমড়ি খেয়ে পড়তে দেখা গেছে ত্রাণেচ্ছুক বন্যার্ত মানুষকে। ত্রাণ নিতে গিয়ে কোথাও হাতাহাতি এবং ত্রাণ দিতে আসা লোকের উপর হামলে পড়ার ঘটনাও শোনা গেছে।
জানা যায়, রেকর্ড বন্যায় রেকর্ড ত্রাণ ও নগদ অর্থ সহায়তা পেয়েছে জামালগঞ্জের বন্যা কবলিত মানুষেরা। সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন মাধ্যম থেকে চাল, চিনি, ডাল, তেল, লবণসহ নানা সহায়তা পেয়েছে উপজেলার হাজার হাজার বন্যার্ত পরিবার। সরকারি অর্থ সহায়তা ছাড়াও ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা—সংগঠন থেকে লাখ লাখ টাকার আর্থিক সাহায্য পেয়েছে বানভাসি মানুষ। যদিও কিছু কিছু এলাকায় ত্রাণ তৎপরতা তেমন দেখা যায়নি, তবে সে এলাকাগুলোতে যে ত্রাণ একেবারে পেঁৗছেনি সেটাও ঠিক নয়। উপজেলার এমন কোন গ্রাম নেই, যেখানে কমবেশি ত্রাণ পেঁৗছেনি। তারপরও মানুষের মাঝে হাহাকার রয়ে গেছে।
খেঁাজ নিয়ে আরও জানা যায়, ঢাকা থেকে আগত ‘মেহমানখানা’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন উপজেলার প্রায় ৫০টি গ্রামের ১০ হাজার বানভাসী মানুষের হাতে ত্রাণের প্যাকেট তুলে দিয়েছে। যাতে ছিল চাল, ডাল, তেল, আলু, পেঁয়াজ, লবণসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। বন্যা চলাকালীন মেহমানখানার স্বেচ্ছাসেবীরা সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর সদস্যদের সহযোগিতায় প্রতিদিন গড়ে ৩ হাজার মানুষকে রান্না করা খাবারও (খিচুরি) খাইয়েছেন। এছাড়া ঈদ উপলক্ষে সেমাই, গুঁড়া দুধ, চিনিসহ আনুষাঙ্গিক ঈদসামগ্রী তুলে দেওয়ার পাশাপাশি ঈদের দিন উপজেলার দুর্গম এলাকায় গরু কোরবানি দিয়ে মাংস বিতরণ করেছে সংগঠনটি। গত ২২ জুন থেকে প্রায় ২০ দিন যাবৎ মেহমানখানার চেয়ারম্যান আসমা আক্তার লীজা তার স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে এই কার্যক্রম চালিয়েছেন বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, সরকারের তরফ থেকে উপজেলা প্রশাসনও ত্রাণ বিতরণ করেছে। বন্যা চলাকালীন প্রশাসন ইউনিয়নের পরিষদের মাধ্যমে বন্যার্তদের মাঝে জিআর এর ১২০ টন চাল, ১০ টন চিরা, ৩ টন মুড়ি, ৩ টন গুড়, ১৮শ’ প্যাকেট ত্রাণ (প্রতি প্যাকেটে চাল, ডাল, তেলসহ প্রায় ১৪শ’ টাকার নিত্যপ্রয়োজনী পণ্য) তুলে দিয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘর মেরামতের জন্য ৪২৫টি পরিবারের মাঝে ১০ হাজার টাকা করে অর্থ সহায়তা দিয়েছে সরকার। এর পাশাপাশি বন্যাকালীন সেনাবাহিনীর সদস্যরা হেলিকপ্টারযোগে ত্রাণ তৎপরতায় অংশ নিতে দেখা গেছে। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকেও ৫ হাজার টাকা করে দেওয়ার প্রস্তুতি চলমান আছে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
এছাড়া সরকারি সহায়তার পাশাপাশি রুরাল এইড ফাউন্ডেশন, গুড পিপল ইন্টারন্যাশনাল, ঢাকা উত্তরা ক্লাব, ব্লু ওয়াটার ব্যবসায়ী সমিতি, পতেঙ্গা মানব কল্যাণ সংস্থা, নারায়ণগঞ্জ মাদ্রাসা পরিষদ, রংপুর ওলামা ও ব্যবসায়ী সমিতি, মুন্সিগঞ্জ প্রবাসী সমিতি, আত্তাকোয়া মসজিদ অ্যান্ড ইসলামী সেন্টার, রামকৃষ্ণ মিশন, সাচনা সৎসঙ্গ মন্দির, নিগমানন্দ সারস্বত সংঘ, ইসকন, জামালগঞ্জের এসএসসি’৯৬ ব্যাচসহ অসংখ্য সংস্থা, সমিতি ও ধর্মীয় সংগঠনের পক্ষ থেকে বিপুল পরিমাণ ত্রাণ ও নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে বাজারে সদাই করতে আসা সাচনা বাজার ইউনিয়নের সেরমস্তপুর গ্রামের দিনমজুর শামসুল আমিনকে ত্রাণের ব্যাপারে প্রশ্ন করলে তিনি জানিয়েছেন, ‘ত্রাণের একটা প্যাকেট তিনি পেয়েছেন। এতে চাল, চিরা, তেল, পেঁয়াজ, মুমবাতি ছিল। কিন্তু তিনি তাঁর ছেলেমেয়েকে বলে দিয়েছেন— কোথাও গিয়ে ত্রাণ আনার দরকার নেই। কারণ তাদের গ্রামে ত্রাণ নিয়ে মারামারির ঘটনা ঘটেছে। কিছু মাগনা পেলে মানুষ কি করবে বোঝে উঠতে পারে না বলে জানিয়েছেন তিনি।’
কমরেড বরুণ রায় স্মৃতি পরিষদের সভাপতি বিদ্যুৎ জ্যোতি চক্রবত্তর্ী বলেন, সম্প্রতি বন্যায় পর্যাপ্ত ত্রাণ পেয়েছে বন্যার্তরা। বন্যার্ত বলতে উচ্চবিত্ত, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত সকলকে বোঝালেও এতে নিম্নবিত্তরা বেশি উপকৃত হয়েছে। কারণ নিম্নবিত্তের অনেকে কাজকর্ম ছেড়ে ত্রাণের পিছু নিয়েছে। আবার কেউ কেউ দৌড়ঝাঁপ তেমন না করেও বিভিন্নভাবে ত্রাণ পেয়েছেন। এতে অনেকের কয়েক সপ্তাহের খানি—খোড়াকও হয়ে গেছে। তবে বিপদে আছে মধ্যবিত্তরা। যারা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তারা কোথাও যায়নি কিংবা ত্রাণও পায়নি।
মেহমানখানার চেয়ারম্যান আসমা আক্তার লীজা বলেন, হঁ্যা, মানুষ পেয়েও অনেকে বলেছে ‘আমি কুছতা পাইছি না।’ তো আমরা যাকে দিয়েছি সেও এমন বলেছে। আমি এইটাকে অপরাধের পর্যায়ে ধরি না। কারণ, এখানকার বন্যার্ত মানুষগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। যাদের অনেক কিছুই বন্যা ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। সে জানে না ঘরটা কিভাবে ঠিক করবে। তারা জানে এই পানিটা নেমে গেলে আর কেউ তাদের খেঁাজ নেবে না।
তিনি আরও বলেন, তাদের আকাক্সক্ষা হয়তো এইটা, আমার এখন সাতদিনের খাবার আছে, এই কথাটা বলে যদি আরও সাতদিনের খাবার পাই। এইটাকে আমি খারাপভাবে দেখি না। মেহমানখানার পক্ষ থেকে যদি তাদের তিন মাসের খাবার দিতে পারতাম তাহলে খুব ভালো লাগতো।