- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

ত্রিমুখি সংকটে লড়ছেন কৃষক

স্টাফ রিপোর্টার
সুনামগঞ্জের হাওরের কৃষকেরা ত্রিমুখী সংকটে পড়েছেন। একদিকে ফসল রক্ষা বাঁধ পাহাড়ি ঢল থেকে রক্ষা করা, অন্যদিকে আধাপাকা ধান কিভাবে কাটা, না কাটলে গরু’র ঘাস নিয়ে বিপদে পড়া। এরকম পরিস্থিতিতে দিশেহারা প্রায় ৪ লক্ষ কৃষক পরিবার।
পাহাড়ি ঢলে আকাল বন্যায় সুনামগঞ্জের মানুষের ফসল রক্ষা বাঁধ রক্ষায় লড়াই করছেন কৃষকরা। ফাটল, ধসের কবলে পড়া অনেক বাঁধের ভাঙন ঠেকানো গেলেও কিছু কিছু বাঁধ ভেঙে কৃষকদের কাঁচা ধান ডুবে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৩০ হাজারেরও বেশি কৃষক। ফাটল ও ধসে পড়া অনেক বাঁধে কৃষকরা স্বেচ্ছা শ্রমে কাজ করছেন।
এদিকে বরিবার নতুন করে আবহাওয়ার বার্তা এসেছে। সে বার্তায় কৃষকের জন্য ভালো কিছু অপেক্ষা করছে না। বলা হয়েছে ১০ এপ্রিল থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত উজানের মেঘালয় ও চেরাপূঞ্জিতে বৃষ্টিপাতের আশংকা রয়েছে। এরমধ্যে ১৩ এপ্রিল থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত ভারি বৃষ্টিপাত হবে। এতে এখন পর্যন্ত জেলার সকল নদীর পানি বিপদসীমার নিচে থাকলেও এ কয়েকদিনে বিপদসীমা অতিক্রম করবে। এ দিকে জমিতে আধা পাকা ধান অপরদিকে ধান কেটে ফেলার আহ্বান। এমন খবরে দিশেহারা কৃষক।
তাহিরপুরের বড়দল গ্রামের বাসিন্দা বদরুল ইসলাম বললেন, মাটিয়ান হাওরে জমি করতে গিয়ে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা ঋণ করেছি। ঋণের অর্ধেক টাকা ধানের উপর মহাজনের কাছ থেকে নিয়েছি। আর অর্ধেক সুদের উপর। বৈশাখে ধান বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, দুই ছেলে মেয়ে আমার। জমির ফসল থেকে সারা বছর খরচের টাকা জোগাড় হয়। আজ থেকে ১ সপ্তাহ বৃষ্টিপাত হবে খবর পেয়েছি। এমনিতেই আমাদের বাঁধ নড়েবড়ে। গত কয়েকদিন যাবৎ মানুষকে নিয়ে বাঁধে কাজ করছি। এখন আল্লাহ ভরসা।
তাহিরপুরে বর্ধিত গুরমা হাওরে ২৪ কেয়ার জমি করেছেন সুলেমানপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. রফিকুদ্দিন। ৪ ছেলে মেয়ে নিয়ে শ্রম—ঘাম দিয়ে বছরের একমাত্র অবলম্বন হাওরে বোরো ধান চাষ করেছেন। তিনি বলেন, আমি প্রায় ২ হাল (চার একরে এক হাল) জমি করেছি। এখন যদি ধান না কাটতে পারি বউ—বাচ্চা নিয়ে উপুস থাকতে হবে। হাওরে বিপর্যয় হলে গরুর দামও কমে যায়। তাই গরু— বাছুরও বিক্রি করতে পারবো না।
তাহিরপুরের দক্ষিণ শ্রীপুরের পাটাবুকার গ্রামের বাসিন্দা মো. আনারুল ইসলাম বললেন, গত কয়েকদিন ধরে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধে কাজ করছি। এখন যে রকম খবর আসছে, তাতে আমাদের ভয় হচ্ছে। এরকম যদি হয় তাহলে সামনে দুঃখের দিন আসতেছে। এলাকায় কোনো কাজ পাবো না। বাড়ি—ঘর ছেড়ে পরিবার নিয়ে ঢাকায় কাজ খুঁজতে হবে।
এদিকে ১৩ তারিখ থেকে ১৭ তারিখ মেঘালয়ে ভারি বৃষ্টিপাতের খবরে অনেকে আধাপাকা ধান কাটা শুরু করেছেন। সোমবার তাহিরপুরের শনির হাওরে অনেক কৃষককে শ্রমিক লাগিয়ে ধান কাটতে দেখা গেছে।
তারা ভয় আর শঙ্কার কথা জানিয়ে বলেছেন, এখনও নদীর পানি ভরপুর। যদি মেঘালয়ে ভারি বৃষ্টিপাত হয়, তাহলে নড়বড়ে হয়ে যাওয়া বাঁধ আর রক্ষা করা যাবে না। এর থেকে আধাপাকা ধান কাটা ভালো।
বালিজুড়ি ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামের বাসিন্দা রিপন হাসান বললেন, ‘২০ জন শ্রমিক দিয়ে ৫ কেয়ার জমির ধান কাটছি। অনেকে শ্রমিক পাচ্ছে না ধান কাটতে। হাওরের অবস্থা খুব খারাপ। আকাশের দিকে থাকালে মন খারাপ হয়ে যায়। এই সময়ে বাঁধের উপর ভরসা করা যাচ্ছে না। যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। মেঘ বৃষ্টি হলে বাঁধ ভেঙে যেতে পারে। তাই আধা পাকা ধান কেটে ফেলছি।
একই কথা বললেন কৃষক তৌফিক মিয়া, মো. আব্দুল কাদির, হোসেন আলী ও মো. কামাল মিয়া। সবাই জমির ধান কাটতে ব্যস্ত।

  • [১]