বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জ সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ কিছু পাহাড়ি নদী ও ছড়া বহুদিন হয় দখল হয়ে আছে। এসব নদী-শাখা নদী দখল করে বাড়ি ও দোকান নির্মিত হয়েছে। এ কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পানি প্রবাহ। পাহাড়ি ঢলের পানি প্রবেশ করছে জনপদে-ফসলি জমিতে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি। বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ-প্রতিবেশ। দেশব্যাপী নদীর বুক চিড়ে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শুরু হলেও সুনামগঞ্জের সীমান্ত নদীর বুকে গড়ে ওঠা কোনো স্থাপনা উচ্ছেদ হয় নি।
সুনামগঞ্জের উজানে ভারতের মেঘালয় রাজ্য। এপাশে হাওর বাওরের জেলা সুনামগঞ্জ। অপেক্ষকৃত নীচু এই জনপদে উজানের পানি এসে নামে সারা বছরই। বর্ষায় পুরো জেলা প্লাবিত হয় উজানের পানিতেই। উজান থেকে নেমে আসা পানি নামার জন্য রয়েছে খর¯্রােতা পাহাড়ি নদী।
পাহাড়ি নদীগুলোর মধ্যে দোয়ারাবাজার সীমান্তের বালি নদী, খাসিয়ামারা নদী, বিশ^ম্ভরপুরের ধামালিয়া নদী ও পুরাতন যাদুকাটা নদীর বুক দখল করে স্থানে স্থানে ঘরবাড়ি হয়েছে।
ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা খাসিয়ামারা নদী সীমান্তের লক্ষীপুর ইউনিয়নের ভাঙাপাড়া ও সুরমা ইউনিয়ন হয়ে সুরমা নদীতে লেগেছে। খাসিয়ামারা নদীর শাখা নদী (মহব্বতপুর খাল নামে পরিচিত) দখল করে ৬৫ টি পাকা ঘর হয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালীরা এই দোকানঘর নির্মাণ করেছেন।
সম্প্রতি এই খালে দেলোয়ার হোসেন নামের এক ব্যক্তি দোকানঘর নির্মাণ করার সময় উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি তাপস শীল বাধা দিলেও কয়েকদিন পরই নদীর বুকে দেলোয়ার দোকান ঘর নির্মাণ করেছেন।
নদীর বুকে স্থানীয় প্রভাবশালী অনেকেরই দোকান ঘর রয়েছে। মহব্বতপুরের বাসিন্দা দোকান মালিক হারুনুর রশিদ অবশ্য দাবী করেছেন, খাসিয়ামারা নদীর গতি পরিবর্তন হয়ে গেছে। মহব্বতপুর বাজারের যে অংশে ৬৫ টি দোকান হয়েছে, সেখানে এখন মরা খাসিয়া নদী। এই অংশ পেরিফেরি বন্দোবস্ত নেবার জন্য আমরা আবেদন করেছি।
দখলদার দেলোয়ার হোসেন জানালেন, আমি যেখানে দোকান করেছি সেখানে আরও দোকান আছে। আমি আমার দখলে থাকা পুরাতন দোকান ভেঙে দোকান করেছি। এই দোকান নদীর পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে না।
দোয়ারাবাজার সীমান্তের বালি নদী মেঘালয় থেকে দোয়ারাবাজার সীমান্তের বাংলাবাজার হয়ে সুরমা নদীতে লেগেছে। এই নদীও স্থানে স্থানে দখল হয়েছে। বাংলাবাজারের উত্তর-পশ্চিমের গ্রাম কুশিউড়া’র অনেক ঘরবাড়ি নদীর বুকে গড়ে ওঠেছে। পাহাড়ি এই নদীর পানি প্রবাহে বাধা থাকায় বাংলাবাজার-ভোগলা সড়ক ভেঙে যাচ্ছে।
দোয়ারাবাজার সীমান্তের সুরমা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান খন্দকার মামুনুর রশিদ বলেন,‘পাহাড়ি নদীর বুক দখল করে স্থানে স্থানে ঘরবাড়ি হওয়ায় ঢলের পানি জনপদে ঢুকছে। ফসলি জমি ভরাট হচ্ছে। বাড়ি-ঘরের ক্ষতি হচ্ছে।’
ভারতের মেঘালয়ের বালাট থেকে সুনামগঞ্জের বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার চিনাকান্দি মেরুয়াখলা, মুক্তিখলা হয়ে ঘটঘটিয়া নদীতে মিশেছে ধামালিয়া নদী। ঘটঘটিয়া রক্তিতে মিশেছে। রক্তি এসে সুরমায় লেগেছে। ধামালিয়া নদীর বুকে কয়েক’শ ঘরবাড়ি হয়েছে। স্থানীয় ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম তালুকদারসহ অনেক প্রভাবশালীর বাড়িও ধামালিয়া নদীর বুকে।
রফিকুল ইসলাম তালুকদার অবশ্য বলেছেন, ধামালিয়া নদীর পানি প্রবাহে আমার বাড়ি কোন ক্ষতি করছে না। আমার বাড়ির অনেক দূরে এখন নদী। নদীর পাড়ে আরও স্থাপনা রয়েছে।
ভারতের ঘোমাঘাট থেকে নেমে আসা পাহাড়ি নদী যাদুকাটা সুনামগঞ্জের বিশ^ম্ভরপুর, শক্তিয়ারখলা, পুরানগাঁও, সিরাজপুর, বাগগাঁও আনোয়ারপুর হয়ে রক্তি নদীতে মিশেছে। যাদুকাটা নদীর মোদেরগাঁও থেকে আনোয়ারপুর পর্যন্ত অনেক স্থানেই ঘরবাড়ি স্থাপনা নির্মাণ করে নদীর বুক দখল করা হয়েছে।
বিশ^ম্ভরপুরের যাদুকাটা নদীর পাড়ের মুক্তিখলা গ্রামের পরিবেশ কর্মী আব্দুল গণি আনছারি বলেন, পাহাড়ি ঢল যখন বাধাগ্রস্ত হয়, তখনই নদীর পাড় দিয়ে ¯্রােত ভেসে যায়, বাড়ি-ঘর ভাঙে, ফসলি জমি পলি ভরাট হয়। এই বিষয়ে বার বারই বিভিন্ন সভা সমাবেশে কথা বলি, কিন্তু কাজ হয় না।
বিশ^ম্ভরপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি স্বপন বর্মণও একই মন্তব্য করে বললেন, পাহাড়ি নদীর বুক দখল করে নির্মিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাবিবুর রহমান বলেন, নদীর গতিপথের মধ্যে যেখানেই স্থাপনা রয়েছে সবই উচ্ছেদ করা হবে। পাহাড়ি নদীর ক্ষেত্রে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এটি চলমান থাকবে।