- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগ স্থগিত-নিরাপত্তাহীনতায় জেলার অধিকাংশ প্রাইমারী স্কুল

বিন্দু তালুকদার
প্রাথমিক শিক্ষায় সরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও সকল আসবাবপত্র নিরাপদে রাখতে সরকার প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন করে দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগ দেয়া প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। প্রথম নিয়োগ হয়েছিল ২০১১ সালে। উপজেলা, জেলা ও গ্রাম পর্যায়ে বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণী পাশ দপ্তরী কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগ দেয়াও হয়। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি স্থানীয় উপজেলা শিক্ষা অফিসের সহায়তায় নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতেন।
কিন্তু হঠাৎ করে গত বছরের মে মাসে উচ্চ আদালতে একটি মামলার কারণে স্থগিত হয়ে আছে সকল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নৈশ প্রহরী নিয়োগ। এতে করে প্রায়ই এসব বিদ্যালয়ে চুরি সংঘটিত হচ্ছে বলে জানা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলায় সরকারি পর্যায়ে প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল ৮৫৬ টি, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল ৫৭০টি। পরে বেসরকারি সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারিকরণ করায় মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ১৪২৬ টি। প্রথম পর্যায়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। বেশ কিছু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগ হয়েছিল। কিন্তু গত বছরের মে মাসে উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত হওয়ার কারণে আগের সরকারি ও সদ্য সরকারি হওয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগ হয়নি। ফলে  জেলার সদ্য সরকারি হওয়ায় ৫৭০ টিসহ অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রাতে থাকে নিরাপত্তাহীন। যার ফলে কোথাও না কোথাও এসব বিদ্যালয়ে চুরির ঘটনা ঘটছে। খোয়া যায় গুরুত্বপূর্ণ জিনিপত্র ও আসবাবপত্র।
জানা যায়, জেলার সদর উপজেলার সদ্য সরকারিকরণ হওয়াসহ মোট প্রাথমিক বিদ্যালয় ১২৭টি, দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগ হয়েছে ৫১ টিতে, পদশূণ্য আছে ৭৬টিতে। বিশ্বম্ভরপুরে মোট বিদ্যালয় ৭৭টি, দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগ হয়েছে ২৮ টিতে, পদশূন্য আছে ৪৮ টি। তাহিরপুর উপজেলার মোট প্রাথমিক বিদ্যালয় ১৩২টি। দুই দফায় দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগ দেয়া হয়েছিল ৩৮টিতে। এর মধ্যে দু’টির নিয়োগ নিয়ে আদালতে মামলা থাকায় কার্যক্রম বন্ধ ছিল। জামালগঞ্জের মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ১২৫টি, এর মধ্যে দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগ দেয়া হয়েছে ৫২টিতে, এখনও শূন্য রয়েছে ৭৩টিতে। দক্ষিণ সুনামগঞ্জে মোট বিদ্যালয় ৯৫টি, দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগ হয়েছে ৪৬ টিতে, পদশূন্য আছে ৪৯ টিতে। ধর্মপাশায় মোট বিদ্যালয় ১৯০ টি, দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগ হয়েছে মাত্র ২৫টিতে টিতে, পদশূন্য আছে ১৬৫ টিতে। দিরাইয়ে মোট বিদ্যালয় ১৬০ টি, দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগ হয়েছে ৬০ টিতে, পদশূন্য আছে ১০০ টিতে। শাল্লা উপজেলা মোট বিদ্যালয় ১০৪টি, দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগ হয়েছে ৩১ টিতে, পদশূন্য আছে ৭৩ টিতে। দোয়ারাবার উপজেলা মোট বিদ্যালয় ১০৩ টি, দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগ হয়েছে ৪০  টিতে, পদশূন্য আছে ৫৭ টিতে।  
অবশ্য জেলার বিভিন্ন উপজেলার বেশ কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। তাহিরপুরের লেদারবন ও সাধের খলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরি নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ এনে আদালতে মামলা দায়ের করেছিলেন নিয়োগ বঞ্চিতরা। মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছিলেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতিও  বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে। এছাড়া একই সময়ে সদর উপজেলায় দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগ অনিয়মের অভিযোগ তোলে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মতিউর রহমানসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে আদালতে স্বত্ত্ব মামলাও হয়েছিল। দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মোটা অংকের বাণিজ্য, অনিয়ম-দুর্নীতির সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। যদিও সেসময় অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেছিলেন তৎকালীন সময়ের সদর আসনের এমপি মতিউর রহমানসহ অভিযুক্ত সবাই।
সদ্য সরকারি হওয়ায় জামালগঞ্জ উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি শংকর সমাজপতি বলেন,‘সরকার উদ্যোগ নিয়েছিল সকল প্রাইমারী স্কুলে একজন করে দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগ দেয়ার। অনেক স্কুলে নিয়োগ দেয়াও হয়েছে। কিন্তু মাঝপথে মামলায় স্থগিত থাকায় আমাদের অনেক সমস্যা হচ্ছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু করলে স্কুলের দাপ্তরিক কাজে গতিশীলতা আসতো এবং অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত হতো।’
তাহিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম সরোয়ার লিটন বলেন,‘ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে পাঠদানের পাশাপাশি অনেক দাপ্তরিক কাজ করতে হয়। শিক্ষা কার্যক্রম, অবকাঠামো ও সহশিক্ষা কার্যক্রমসহ নানা কর্মকান্ডে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো আগের চেয়ে অনেক এগিয়ে। এজন্য  প্রতিটি বিদ্যালয়ে এখন দপ্তরি নিয়োগ জরুরী।’  
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হজরত আলী বলেন,‘অনেক এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো গ্রামের এক প্রান্তে বা ফাঁকা স্থানে অবস্থিত। যার কারণে এসব প্রতিষ্ঠান রাতে নিরাপত্তাহীনতায় থাকে। তাই সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আসবাবপত্র, গুরুত্বপূর্র্ণ কাগজপত্রসহ অবকাঠানো নিরাপদে রাখতে এবং বিদ্যালয়ের দাপ্তরিক কাজকর্মে সহায়তার করার লক্ষ্যে প্রতিটি বিদ্যালয়ে একজন করে দপ্তরী কাম নৈশ দপ্তরি নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু আদালতে নির্দেশে এখন নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত আছে। এতে অনেক বিদ্যালয়েই নিয়োগ শেষ করতে পারেনি। ফলে রাতে এসব বিদ্যালয় নিরাপত্তাহীনতায় থাকে। চুরি সংঘটিত হয়, আসবাবপত্র ও কাগজপত্র খোয়া যায়। অবকাঠামোরও ক্ষতি সাধিত হয়।’  

  • [১]