- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

দম ফেলার ফুসরত নেই হাওরের কৃষকদের

বিশেষ প্রতিনিধি (করচার হাওর ঘুরে এসে)
দম ফেলার ফুসরত নেই সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের প্রায় চার লাখ কৃষকের। ঢলের চাপ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ রক্ষা করা, আধাপাকা ধান কাটা, শুকানো, ধান গোলায় তোলা সবই করতে হচ্ছে এবার কম সময়ে। একারণে চোখে মুখে পথ দেখছেন না তারা। সোমবার সকাল থেকে বিকাল তিন টা পর্যন্ত জেলার বৃহৎ হাওর করচায় দেখা গেছে হাজারো কৃষক কৃষাণির ব্যস্ততা। উঁচু জমির পাকা ধান রেখে, নিচু জমির আধাকাচা ধান কাটছেন কৃষকরা। রোববার রাতে দিরাই উপজেলার হুরা মন্দিরা হাওরের ডুবে যাওয়া ধানও সোমবার সকালে কিছু কৃষক তোলে আনার চেষ্টা করছিলেন।
সোমবার পর্যন্ত সুনামগঞ্জের ১৭ টি ছোট বড় হাওর ডুবে কৃষকের সর্বনাশ হয়েছে। সর্বশেষ রোববার বিকালে ও রাতে ডুবলো তাহিরপুর এবং ধর্মপাশার গুরমার বর্ধিতাংশ এবং রাত নয়টায় সাতবিলা বাঁধ ভেঙে ডুবেছে দিরাই উপজেলার হুরামন্দিরা হাওর। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী ১৭ টি হাওর ডুবে এই পর্যন্ত পাঁচ হাজার ৫১০ হেক্টর ফসল ডুবেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১৯ হাজার কৃষক। বেসরকারি হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বেশি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী সোমবার সকালে সুনামগঞ্জে নদীর পানি হাওরের বাঁধের বিপদ সীমার মাত্র নয় সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে ৫.৯৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে যাচ্ছিল। পানি উন্নয়ন বোর্ড’এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সব কয়টি বাঁধই ঝঁুকিতে আছে। এই অবস্থায় কৃষকরা মহাসংকটে পড়েছেন। হাওরপাড়ের কোন কোন বাঁধে সোমবার কৃষাণীরাও পাহারার কাজে ছিলেন, কৃষকরা ধান কাটায় ব্যস্ত ছিলেন। করচার হাওরপাড়ের কৃষকরা বললেন, উঁচু জমির পাকা ধান রেখে নীচু জমির আধাপাকা ধান কাটছেন তারা।
করচার হাওরপাড়ের হরিমনের বাঁধের পাশে সকাল থেকেই ধান শুকানোর কাজ করছিলেন হেলেনা বেগম। বললেন, এখানে থেকে কিছুক্ষণ পর পর বাঁধও দেখছি, ধান শুকানোর কাজও সারছি। পাশে দাঁড়ানো কৃষক আব্দুল হালিম বললেন, দুই দিন হয় দিনে বাঁধ দেখছেন মহিলারা— রাতে থাকছি আমরা।
বাঁধের পাশের জমিতে আধাপাকা ধান কাটছিলেন, উপজেলার কাটাখালির আব্দুল হেলিম, মো. গোলাফ মিয়া, মতিউর রহমান, হাবিবুর রহমান, ইব্রাহিম ও সবুজ মিয়াসহ কৃষি শ্রমিকরা।
ধান কাটতে কাটতে উচ্চস্বরে কৃষি শ্রমিক ইব্রাহিম অন্যদের বলছিলেন, ‘জলদি খাটোরে ভাই, কোন সময় বাঁধ ভাইঙা পানি হামাইবো ঠিক নাই।’
কৃষি শ্রমিক হাবিবুর রহমান বললেন, রাধানগরের আসাদ মিয়ার আট একর জমি কেটে দেবার জন্য সকালে এসেছেন তারা। প্রথমে সোনালী রংয়ের পাকা ধান কাটা শুরু করেছিলেন তারা। পরে জমির মালিক এসে তাদেরকে ওই জমি থেকে তুলে এনে হরিমনের বাঁধের পাশের আধাপাকা ধান কাটতে দেখিয়ে দেন।
হাবিবুর রহমান বললেন, জমির মালিক মনে করছেন, বাঁধের পাশের আধাপাকা ধান থাকলে বাঁধ ভাঙলে এই জমি আগে তলিয়ে যাবে।
হাওরপাড়ের রাধানগরের কৃষাণী নূর খাতুন ধান শুকানোর কাজ করছিলেন। বললেন, ‘আর চাইর—পাঁচদিন পরে কাটলে ধান বাত্তি (চাল ভালো হত) অইলোনে ভালা, উপায়তো নাই, এল্লাগি বেটাইনতে কাইট্টা আনছইন।’
বিশ^ম্ভপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাদিউর রহিম জাদিদ বললেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশ আছে ২৪ ঘণ্টা বাঁধ পাহারায় রাখতে, একই সঙ্গে দ্রুত ধান কাটতে। করচায় ৬০ থেকে ৭০ ভাগ ধান কাটা শেষ। আমরা ধান কাটতে তাগদা দিচ্ছি, বাঁধেও নজরদারি রাখছি।

  • [১]