শনিবারের দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর জানাচ্ছে ভিজিএফ চাল নিয়ে চালিয়াতির এক সংবাদ। প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে জেলার দোয়ারাাবাজার উপজেলার নরসিংহপুর ইউনিয়নে ভিজিএফ’র বরাদ্দকৃত ১০ টন চালের মধ্যে অকুস্থলে প্রথম দফায় দেড় টন চাল কম নেয়া হয়। বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় দেড় টন চাল নিয়ে চালিয়াতি করা সম্ভব হয়নি। পরদিন বাকি চাল ইউনিয়ন পরিষদে গেছে। এর আগের দিন দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের এক সংবাদ থেকে জানা যায়, মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ভিজিডি কর্মসূচির উপকারভোগী দুই নারীর সাত মাসের বরাদ্দের চাল আত্মসাতের ঘটনা প্রশাসনিক তদন্তে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। উপরের দু’টি ঘটনাই সরকারের অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খয়রাতি সহায়তা নিয়ে নয়-ছয় করার অমানবিক তৎপরতা এবং এর চাইতেও দুঃখজনক বিষয় হলো উভয় ঘটনায় দুই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির নাম সামনে চলে এসেছে। বলাবাহুল্য বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে এবম্প্রকার অভিযোগ নতুন কিছু নয়। কান পাতলে হরহামেশাই এরকম ছোট-বড় বহু কথা শোনা যায়। বলা নিষ্প্রয়োজন যে, এই ধরনের কর্মকা-ের কারণে আমাদের দেশে জনপ্রতিনিধিদের যে সুউচ্চ ভাবমূর্তি থাকার কথা ছিলো তা নেই বরং অনেক জনপ্রতিনিধিকে বাঁকা চোখে দেখার একটি সামাজিক সংস্কৃতি তৈরি হয়ে গেছে। প্রবাদবাক্যের যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ কথাটির উপযুক্ত উপমা হয়ে গেছে জনপ্রতিনিধিত্বের জায়গাটি। কোনো গণতান্ত্রিক সভ্য সমাজে এমন অবস্থা ওই সমাজের দেওলিয়াত্ব ও মানুষের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে। যেকোনো পর্যায়ের নির্বাচনে জিতে আসতে প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তিদের খরচের বহর দেখে বুঝার উপায় নেই তাঁরা জনসেবার জন্য মাঠে নেমেছেন নাকি উন্মুক্ত নিলাম ডাকের মাধ্যমে নতুন কোনো ব্যবসায় করায়ত্ত করার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। এই পয়সা খরচ করার পিছনে আরও বেশি পয়সা কামনোর ধান্দা কাজ করে এবং এটি এখন অতিশয় লাভজনক পেশায় পরিণত হয়েছে বললে অত্যুক্তি করা হবে না।
এর বিপরীতে সাধারণ মানুষ দুর্ভাগ্যের সম্মুখীন হন এইসব তথাকথিত জনপ্রতিনিধিদের কারণে। সরকার যে বরাদ্দ দেন তার কিয়দংশ গিয়েও জুটে না প্রকৃত জায়গায়। শুধু খয়রাতি সাহায্য নয়, যেকোনো উন্নয়ন কাজ নিয়েই একই দৃশ্য। বরাদ্দের কত অংশ সঠিক কাজে ব্যয় হয় আর কত অংশ পেেকটে ঢুকে তা এখন রীতিমতো গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাদা চোখেও বেশ বুঝা যায়। আর সেটি বুঝতে নির্বাচিতদের সম্পদের পরিমাণ বাড়ার খতিয়ান থেকেও বেশ অনুধাবনযোগ্য। এরকম একটি অবস্থা দেখার জন্য আমাদের পূর্বপুরুষরা এই দেশ স্বাধীন করেননি। যেসব মহান উদ্দেশ্য ও আদর্শকে সামনে রেখে তাঁরা জীবন বাজি রেখে সশস্ত্র লড়াই সংগ্রামের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করেছিলেন তার ছিটেফোঁটাও এখন কোথাও দেখা মিলে না। সর্বত্র অনৈতিকতা, লোভ ও অনিয়মের পাহাড়। এই জায়গা থেকে উত্তরণের কোনো লক্ষণও দৃশ্যমান নয়।
সবকিছু ঠিক রাখতে সিস্টেমের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। সিস্টেমের অন্যতম অনুসরণীয় বিষয় হলোÑ অন্যায় করলে অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এটি করা গেলে অন্যায় কর্ম নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে সিস্টেমের শরিরে এতোটাই শ্যাওলা জমেছে যে, এখানে আদতে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তেমন দেখা যায় না। বরং এই সিস্টেমকে অনেকেই অন্যায় তোষণকারি হিসাবে আখ্যায়িত করেন। ধর্মপাশার যে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে তদন্তে অভিযোগ প্রমাণ হয়েছে তাকে আড়াল করতে তদন্ত প্রতিবেদনটিই দীর্ঘদিন লুকিয়ে রাখার চেষ্টা ছিল। এর একটাই অর্থ তদন্ত প্রক্রিয়া পরিচালনকারীরা চাননি অপকর্মকারী জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। এই যখন অবস্থা তখন সিস্টেমের কার্যকারিতা বুঝতে কারও বাকি থাকে না। একটি স্বাধীন দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খয়রাতি সহায়তা নিয়ে এমন বিবেকবর্জিত গর্হিত কর্মকা-ের বিরুদ্ধে আমরা তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করি।