- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

দাঁড় কাক

কুমার সৌরভ
একবার থাপ্পর খেয়েছিলাম ছোটবেলায়। পাড়ার আমার চাইতে বয়সে বড় মাস্তান প্রকৃতির এক বড়ভাই দোকান থেকে সিগারেট কিনে এনে দেইনি বলে সকলের সামনে আমাকে থাপ্পর মেরেছিল। আমি প্রতিবাদ করতে পারিনি। প্রতিবাদ করার সাহস পাইনি। অপমানের জ্বালা নিয়ে নীচু মুখে ফিরে এসেছিলাম। সেই ভয়কাতুরে স্বভাব এই পঞ্চান্ন বছরের বয়সেও পিছু ছাড়েনি। বলা ভাল ভয়ের সাথেই কাটিয়ে দিলাম জীবনের পুরোটা সময়। যেখানেই সাহস দেখানোর প্রয়োজন ছিল সেখানেই ব্যর্থ হয়েছি। লুকিয়ে সরে এসেছি নতুবা আপোষ করেছি। নিতান্ত অন্যায় হলেও আমি ন্যায়ের পক্ষে জোরালো  ভূমিকা রাখিনি। তাই একান্তে নিজেকে আমি ঘেন্না করি। কে ঘেন্না করে কাকে? আমিই আমাকে। যে আমি ভয়কাতর তার ভিতর বাস করে আরেক মানুষ। ওই মানুষটি আমার কাপুরুষতা মেনে নিতে চায় না। ঘোড়ার সহিস যেমন চাবকে ঘোড়াকে সামনে দৌঁড়াতে বাধ্য করে আমার ভিতরের মানুষটিও আমাকে ওরকম করে চাবকে সাহসী করতে চায়। কিন্তু ভেতরের আমিটি বাইরের আমিকে কিছুতেই বাগে আনতে পারে না। তাই আমিও একইরকম পরিবর্তনহীন রয়ে গেলাম। এতে হয়েছে কি নিজেকে শামুকের খোলশের মধ্যে আটকে রাখার স্বভাব তৈরি হয়েছে আমার। প্রয়োজনের বাইরে কোন কথা বলি না। যা বলি সেটাও গলা থেকে মিনমিনে করে না হয় ফ্যাসফ্যাসে আকারে বের হয়। নিজের চাহিদার কথাটিও মুখ ফুটে বলতে পারি না। অবস্থা এমন হয়েছে অন্যদের কথা বাদই দিলাম ঘরের ভিতরেও আমি কারও উপর কর্তৃত্ব ফলাতে পারি না। কর্তৃত্ব বাদ যাক একেবারে সাধারণ কোন বিষয়েও আমি সিদ্ধান্ত দিতে অক্ষম। বিয়ের আগে মা বাবা যা বলেছেন তাই শুনেছি। এখন বউ যা বলে তাই শুনি। তবু ভাল। ভাগ্য করে মোটামোটি সাহসী এক মহিলাকেই বাবা আমার গলায় ঝুলিয়ে দিতে পেরেছিলেন। না হলে আমার কপালে কী যে হত।
আমি নির্ভেজাল একটি চাকুরী করি। অফিসের কাজকর্মে কখনও কোন খব্রদারি করতে হয় না। বরং বস ও সিনিয়র সহকর্মীদের নির্দেশিত কাজগুলো করে দিতে হয়। কাজের ক্ষেত্রে আমি কিন্তু ঠিক উল্টো। চিঠিপত্র নথিবদ্ধ করা, হিসাবের খাতাপত্র ঠিক রাখা, কম্পিউটারে চিঠি টাইপ করে দেয়া ্এমনকি এক্সএল প্রোগ্রামের মাধ্যমে বড় বড় আর্থিক বিবরণী করে দেয়া সবকিছুই আমি ভাল পারি। ইদানীং নেট ঘাটাঘাটির কাজও শিখে ফেলেছি। তাই প্রতিদিন অফিসের ওয়েবসাইট খুলে নতুন চিঠিপত্র ডাউনলোড করে দেওয়া,  ই-মেইল খোলা ও পাঠানোর সবগুলো কাজই আমাকে করতে হয়। কাজে নিষ্ঠার কারণে বসরা তো বটেই অফিসের সকলেই আমার উপর সন্তুষ্ট। আর সন্তুষ্ট হবেই না বা কেন। আমি তো কখনও কোন প্রশ্ন করি না। উপরি ইনকামের ভাগ চাই না। গোপন সংবাদ পাচার করি না। ঝুনু ম্যাডামের সাথে করিম স্যারের লটরপটর দেখেও না দেখার ভান করি। বরং করিম স্যার দুপুরে টিফিন ব্রেকে আমাকে দিয়েই ঝুনু ম্যাডামকে নিজের রুমে ডেকে পাঠান। আমি আনন্দসহকারেই বসের নির্দেশ মান্য করি। এই ঝুনু ম্যাডামকে ডাকার ব্যাপারটি আমার কাছে দারুন লাগে। ঝুনু ম্যাডামের রুমে ঢুকে প্রথমে একটু হাসি, কিছু বলি না। কয়েক মুহূর্ত পরে বলি, ম্যাডাম গতকাল যে মিটিংটা হলো তার রেজুলিউশনের খসড়াটা নিয়ে যেতে বলেছেন স্যার। ঝুনু ম্যাডামের চেহারা একটু লাল হয়ে যায়। আমি ঝুনু ম্যাডামের এই সময়ের চেহারাটা দেখতে ভীষণ পছন্দ করি। তিনি তখন ভ্যানিটি থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছেন। মুখ মুছতে ডান হাত উপরে তুললে কনুইর নীচ দিয়ে তার সুপুষ্ট বুকের একটুখানি দেখতে পাওয়া যায়। ম্যাডাম যখন মুখ মুছতে ব্যস্ত তখন আমি আড়চোখে তার বুকের গোপন সৌন্দর্য অবলোকনে নিয়োজিত থাকি। এই একটুখানি সময় আমাকে দিনের ক্লান্তি মুছে দেয়। তাই ম্যাডামকে ডাকার কাজটা আমার অতি প্রিয়।  ঝুনু ম্যাডাম যখন বলেন- আচ্ছা যাচ্ছি, তখন আমি আস্তে করে বেরিয়ে নিজের কাজে মনোযোগ দেই।
একদিন দেখলাম অফিসের পরিবেশ বেশ উত্তপ্ত। করিম স্যারের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকজন মহিলা কলিগ কমপ্লেন করেছেন রিজিওনাল ডাইরেক্টরের কাছে। এরই তদন্ত এসেছে। তিনি সকলের বক্তব্য শুনছেন। এক জন এক জন করে ডেকে আলাদা ভাবে কথা বলছেন তিনি। তদন্ত কর্মকর্তার রুমে যেয়ে বক্তব্য দিয়ে যখন কলিগরা বেরিয়ে আসছে তখন তাদের চেহারার উত্তপ্ত ভাব দেখে ভালই বুঝা যাচ্ছে করিম স্যার আজ খুব বেকায়দায় পড়েছেন। মোতালিব ভাই অফিসের ফিল্ড সুপারভাইজার। পান খান। সবসময় কথা বলেন পান চিবিয়ে। এমনিতে রসিক। কিন্তু খেপে গেলে খবর আছে ধরনের। আজ তার সেই রুদ্র রূপ দেখলাম। নিজের স্টেটম্যান্ট দেওয়ার আগে সকলকে নিয়ে এক পশলা গ্রাউন্ড ওয়ার্ক করে রেখেছেন। কে কীভাবে কথা বলবে তার মোটামোটি স্টেজ রিহার্সেল ধরনের আরকি। এখন যখন এক একজন ঢুকছে তাদের আগেই সতর্ক করে দিচ্ছেন ভয়ে যেন সত্য বলা থেকে বিরত না থাকে। বেরিয়ে আসার পর আবার তার আদালতে পুনরায় জবানবন্দী। এই করার ফাঁকে তার কত তেজোদ্দীপ্ত কথা। তিনি বলছেন, আরে ওই ব্যাটা করিম অফিসকে কী পেয়েছে। এই অফিসে কি মেয়েরা চাকুরী করবে না। সে মেয়েদের দুর্বলতা খুঁজে তাদের ব্ল্যাকমেল করবে। আজ ওকে হয় জাস্ট স্পট সাসপেন্ড করবে নয় আমরা অফিসে তালা লাগিয়ে দিব।
করিম স্যার কী করে মেয়েদের ব্ল্যাকমেল করছেন তার কিছুই বুঝতে পারি না। এই অফিসে এতগুলো বছর কাজ করে আসছি  তাও বিষয়টি টাহর করতে পারি নি। ঠিক তখনই ভিতরের আমি বাইরের আমিকে ঠাস করে যেন চড় বসিয়ে বলল, তুই বুঝবি কি হাঁদারাম। তোর বুঝার মুরোদ থাকলে তো বুঝবি। ভিতরের আমির এই কথা নির্দ্ধিধায় মেনে নিলাম। এরকম সময়ে টেবিলের সামনে বসা দুই কলিগের কথাবার্তা আমার কানে ঢুকল।  ওদের একজন বলছিল, ঝুনু ম্যাডাম মুখ বুঝে সইলেও কাবেরিদি কিন্তু পেটানো লোহা। এখন দেখুক করিম শালাভাই কত ধানে কত চাল। এসময়েই ভিতর থেকে ডাক আসায় একজন চলে গেল আর আলাপও বন্ধ হয়ে গেল।
কাবেরিদি কী এমন বাহাদুরী করল তা বুঝতে পারলাম না। কাউকে যে জিজ্ঞেস করব সে উপায়ও নেই। রহস্যের সমাধান হল মাস্টাররোল ক্লিনার অমিয়র দ্বারা। অফিসে সে শুধু আমার কাছেই নির্ভয়ে সব কথা বলতে পারে। তার যত বাহাদুরির কথা আমাকে শুনিয়ে তৃপ্তি পায়। সে জানে আর কেউ তাকে পাত্তা না দিলেও আমি ঠিকই ওর কদর বুঝি। সেই ফিস ফিস করে আমাকে বলল, জানাইননি কোনতা। কাবেরিদি থাপড়া মারিলাইছইন করিম স্যাররে। করিম স্যার বলে তানরে রেস্টুরেন্টে বইয়া চা খাওয়ার কথা খইছলা। দিদি রাজী না অওয়ায় স্যার রুমের ভিতরই তান হাত দইরা টানাটানি আরম্ভ খরিলাইছলা। এরফরে দিদি তান গালও চড় মাইরা বারইয়া আইছইন।
আমার মাথায়  ঠিক ঢুকছে না, যে খবর ক্লিনার অমিয় জানে সেই খবর আমি জানি না কেন। কেউ আমাকে জানালও না। ইনকুয়ারি অফিসারের সামনেও ডাক পড়ল না। আমাকে এই সার্বজনিন এড়িয়ে চলার কারণ কী? ভাবতে থাকলাম।
লাঞ্চের আগেই ইনকুয়ারি শেষ। অমিয়র কথায় যা জানা গেল তার সারমর্ম হলো করিম স্যারের চারিত্রিক দুর্বলতার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। এখন তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু হবে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে সাসপেন্ড করা হবে।  ইনকুয়ারি অফিসার ঢাকায় ফিরেই ফ্যাক্সে অর্ডার পাঠিয়ে দিবেন।
আমি বিকালে বাসায় এসে বৌকে সবিস্তারে সবকিছু জানালাম। সে সব শুনে শুধু বলল, কাবেরি বাপের বেটি। আজকাল মেয়েরা ওরকম প্রতিবাদী না হলে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে না।
আমি তার কথায় সায় দিলাম।
আমার এরকমের নিস্তরঙ্গ জীবন জগৎ সংসারের কারও জন্যই প্রয়োজনীয় নয়। আমি ¯্রফে একটা অর্থহীন কর্মজীবন কাটিয়ে এখন অবসরের মুখোমুখি। আমি অনেকটা পরগাছার মতো একেক সময়ে একেক জনের আশ্রয়ে থেকে বেড়ে উঠেছি। ভাগ্য ভাল আগাছা পরিষ্কারের জন্য কেউ শিকড়শুদ্ধ কেটে ফেলেনি। সমাজে যে পরগাছারও প্রয়োজন রয়েছে আমি তার জ্বলজ্ব্যন্ত প্রমাণ।
প্রতিদিনের মত আজও আমি চোখ নীচু করে টেবিলে বসে কাজ করে যাচ্ছি। পিয়ন এস বলল, বড় স্যার আপনাকে ডাকছেন। আমি তড়িঘড়ি স্যারের রুমে চলে গেলাম। আমাকে দেখে স্যার নরম করে বললেন- বসুন, আপনাকে এতটা বিমর্ষ দেখাচ্ছে কেন। আমি দাঁড়িয়েই থাকি। তিনি উঠে এসে আমার পিঠে হাত রাখলেন। অনেকটা জোর করেই বসিয়ে দিলেন চেয়ারে। নিজেই ফ্লাস্ক থেকে কাপে চা ঢেলে এগিয়ে দিলেন। আমি বিস্ময়ে হতবাক। যে আমি কখনও অন্যের কাছ থেকে এতটুকু সম্মান পাইনি সেই আমাকে কিনা আজ স্বয়ং বড় স্যার নিজের হাতে চা ঢেলে দিচ্ছেন। নিজেকে নিয়ে এই প্রথম আমার গর্ব হল। তাহলে আমার মাঝেও এমন কিছু আছে যে কারণে আরেকজন আমাকে সমাদর করতে পারে। অনেকটা কুণ্ঠিত হয়েই চা খেলাম। এসময় স্যার আস্তে করে বললেন, গতকাল বিন্নাজান ফরেস্টের ১০ লাখ টাকার যে বিলটা অনুমোদন হয়েছে সেটির জন্য একটি বেয়ারার চেক প্রস্তুত করবেন। পার্টির সুনামগঞ্জে কোন ব্যাংক একাউন্ট নেই। তারা আমাকে বেয়ারার চেক দিতে অনুরোধ করেছে।
এরকম পেমেন্টের ক্ষেত্রে বেয়ারার চেক দেয়ার কোন বিধান নেই। একাউন্ট পেয়ি চেকেই পেমেন্টের বিধান। কিন্তু স্যারের সমাদর পেয়ে ও কথা আর বলতে পারিনি। বললাম, তাদের বেয়ারার চেকের রিকুয়েস্ট লেটারটা আপনি অনুমোদন করে দিবেন স্যার। স্যার বললেন, ও নিয়ে আপনি ভাববেন না। আমি এপ্রুভ করে দিব। আপনি চেক রেডি করে নিয়ে আসুন।
টেবিলে এসে চেক রেডি করে স্যারের রুমে নিয়ে গেলাম। স্যার চেক সই করে চেকটি নিজের কাছে রেখে দিলেন। বললেন, পার্টি কাল আসবে। কাল তো অফিস বন্ধ। আমি ওদের সইস্বাক্ষর রেখে চেক দিয়ে দিব। আপনি রবিবারে সকল কাগজপত্র আমার কাছ থেকে নিয়ে যাবেন।
অফিস থেকে বাসায় আসার পর মনে বেশ একটা প্রফুল্ল ভাব লাগল। স্যারের খাতিরের কারণেই বোধ করি এরকম প্রফুল্লতা। দাঁড়কাককে পরম ভক্তিসহকারে ডাকতে দেখেছি ছোটবেলায় হরি কাকাদের বাসায়। হরি কাকার মা মারা গিয়েছিলেন সেবার। হরিকাকা সাদা একটুকরা ভেজা কাপড় পড়ে তুলসি তলায় একটি কলার খুলে কলা সাবু চিনি রেখে হাত জোর করে সামনের জলাপাই গাছের দিকে তাকিয়ে হাতে তালি দিচ্ছিলেন আর মুখে বলছিলেন, আও… আও…। দেখলাম খানিক পর একটি দাঁড় কাক এসে  কলার খুলে রাখা খাবার গুলো ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছে। হরিকাকা দূর থেকে দাঁড় কাকটিকে উদ্দেশ্য করে মাটিতে উবু হয়ে ভক্তি করে ফিরে আসেন। তখন বুঝেছিলাম সারাক্ষণ আমরা যে  দাঁড় কাককে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেই, কখনও কখনও যেন দাঁড় কাকেরও কদর বাড়ে। আজ আমার নিজেকে ভাগ্যবান দাঁড় কাকের মত মনে হল। রাতে খুব ভাল ঘুম হলো।
এই ঘটনার সপ্তাহখানেক পর পুলিশ আমাকে থানায় ধরে নিয়ে গেল। আমি নাকি অফিসের ১০ লাখ টাকা তছরুপ করেছি। ব্যাংকে নিজে গিয়ে চেকে স্বাক্ষর করে ওই টাকা তুলেছি। চেকটি নাকি ছিল কোন এক বিন্নাজান ফরেস্টের নামে।
হরিকাকার ভক্তিসহকারে ডাকা সেই দাঁড় কাকটির চেহারা চোখের সামনে ভেসে উঠল।
২৩.০৫.২০১৫  

  • [১]