- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

দাদা থেকে জামাইবাবু হয়ে উঠা

কুমার সৌরভ
আবেদ যখন থেকে সাংবাদিকতা শুরু করে তারও আগে থেকে সুনামগঞ্জের সাংবাদিকদের সাথে আমার কিঞ্চিৎ সম্পর্ক বজায় ছিলো। বলা ভাল, লেখালেখির সাথে জড়িত থাকার যে দূরন্ত নেশা শিক্ষাজীবনে পেয়েছিলাম সেই নেশার টানেই লেখার জগতের অধিবাসীদের সাথে আমার এই সম্পর্ক ¯্রােত আর নদীর মতোই অচ্ছেদ্য হয়ে উঠেছিলো। আমি কোনো সাংবাদিক না হয়েও পত্রিকা অফিসেই কাটত আমার অবসরের বেশির ভাগ সময়। সুনামগঞ্জ বার্তা, সাপ্তাহিক সুনামগঞ্জ, স্বজন প্রভৃতি অফিসগুলো ছিলো আমার প্রিয় জায়গাগুলোর অন্যতম। এইসব অফিসের মানুষগুলো ছিলেন আমার আত্মার সাথে সম্পর্কিত এক এক জন। তো আবেদ সাংবাদিকতা করত যে সময়টাতে সে সময়ে মোটাসোটা শরীরের আবেদ আমাকে দাদা সম্বোধন করত। তার কথার মধ্যে এক ধরনের সম্মোহন আছে। বাঁশির সুরের মত তা হৃদয়কে বিঁধে ফেলত। কয়েকবার কথা বললে কাছে টেনে নিতে সক্ষম ছিল সে। তার কথার মায়াবী ফাঁদে ধরা পড়েছিলাম আমিও। বেশি না হলেও অল্পবিস্তর কথাবার্তা হত। টুকটাক দেখাদেখি, অল্পসল্প আলাপ-আলোচনা আর মোহনীয় কণ্ঠস্বরের কারণে আবেদ সহজেই আমার আপনজন হয়ে উঠেছিলো।
সেই আবেদ হঠাৎ করেই আমাকে জামাইবাবু ডাকা শুরু করলো। পঙ্কজের সাথে সম্পর্কসূত্রের কারণেই যে তার এমন সম্বোধন পরিবর্তন তা আমার বুঝতে বাকি ছিলো না। সম্বোধন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সে আরেকটি বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলো বলে আমার এখন মনে হয়। সেটি হলো দাদার পরিবর্তে জামাইবাবুতে রূপান্তর হওয়াটা বোধ করি পঙ্কজের প্রতি তার অধিকতর প্রীতিবোধের পরিচয় বহন করে। এমন শুধু আবেদ নয়। আরও অনেকেই এমন সম্পর্ক পরিবর্তন করেছে। বুঝলাম, কর্ম মানুষকে কীভাবে জায়গা থেকে সরিয়ে দেয়। তবে আবেদ দাদা থেকে আমাকে জামাইবাবুতে পরিণত করলেও তাঁর আগের শ্রদ্ধাবোধ বা আন্তরিকতার কমতি ঘটেনি একটুও। বরং বেড়েছে। আগের দাদা ও পরের জামাইবাবু দুই সম্পর্কই যেন তার সাথে কঠিন সূত্রে বাঁধা পড়ে গেলো। আমাদের নতুনপাড়ার কয়েক বাসা পরেই তার সম্বন্ধি দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কালামের বাসা। সে প্রায়ই ওই বাসায় যেতো। রিক্সায় যেতে কিংবা আসতে প্রায়সই আমার বাসার সামনে তার সাথে দেখা হয়ে যেত। দেখা হলেই তার ঘাড় কাত করে সহাস্যে সেই আন্তরিক সম্বোধনÑ ‘জামাইবাবু বালা আছইননি’। অজ¯্রবার তার এই সম্বোধন আমাকে তার প্রতি ভীষণ রকমের গভীর টান তৈরি করেছিলো। এ এমন টান যা অলঙ্ঘনীয়। সেই আমার অতি প্রিয় আবেদ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে, আজ আমাকে সেই দুঃসহ সত্য শুনতে হলো। আমাদের কী দুর্ভাগ্য। যে মানুষগুলোর থাকার প্রয়োজন অবধারিত, যারা থাকলে জগতের কল্যাণ সাধিত হয়; সেই মানুষগুলোর কেউ কেউ হঠাৎ হঠাৎ আকস্মিকভাবে বিদায় নিয়ে নেয়। পড়ে থাকি আমরা-আমাদের মতো পরজীবী শ্যাওলা বিশেষ জীবনের অধিকারীরা।
করোনার সময়ে আমরা সকলেই যথাসম্ভব ঘরে বসে থাকি। সামাজিকতা এড়িয়ে চলি। এরই মাঝে এই সেদিন আবেদের সাথে দেখা হয়েছিল রহমান বেকারিতে। ওখানে আমি কিছু কেনাকাটা করতে গিয়েছিলাম। ওখানেই আবেদ বসা ছিল। দেখেই আন্তরিক সম্ভাষণে চা পানের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কিন্তু করোনাভীতির কারণে তার আমন্ত্রণ রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। বলেছিলাম পরে একদিন একসাথে চা পান হবে, হবে জম্পেস আড্ডা। হায়! আবেদের সাথে আর একসাথে চা পান করা হবে না। ভাবলেই বুকের ব্যাথা চিনচিন করে উঠছে। সেই শেষ দেখার পর আজ শারীরিকভাবে আবেদ আমাদের থেকে চিরবিদায় গ্রহণ করেছে। কিন্তু আসলেই কি একে বিদায় বলা চলে? যে আবেদ নিত্য আমার মনে স্মৃতি জাগরূক হয়ে থাকবে, যে লাস্যময় আবেদের চেহারা আমার মননে চীরঞ্জীব হয়ে থাকবে, যে আবেদের গণমুখী সাংবাদিকতার কথা আমরা বারবার উচ্চারণ করব, যে শিক্ষানুরাগী আবেদের দক্ষ ব্যবস্থাপনাকে আমরা বহুবার উদাহরণ হিসাবে সামনে আনব; সে কিভাবে বিদায় নিতে পারে? সুতরাং আবেদের শারীরিক মৃত্যুর মাঝেই সে শেষ হয়ে যায়নি, বরং কর্মগুণে সে নিজের স্মৃতিকে অনেকের মাঝেই অম্লান করে রাখতে সক্ষম এক ব্যক্তি।
যে বুলচান্দ হাইস্কুলের সে দুই দুইবার সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলো, আমি সেই বিদ্যালয়েরই শিক্ষার্থী ছিলাম। একটা সময়ে বিদ্যালয়টি শ্রীহীন হয়ে পড়েছিল। শুনেছি, আবেদ ওখানে শিক্ষানুকূল পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছিলো। অনেকেই বলেন সে বেশ কিছুটা সফলতাও অর্জন করেছিলো। কিন্তু তাঁর আকস্মিক তিরোধানে সেই কাজগুলো অসমাপ্ত রইলো। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিৎ, আবেদ যে মহৎ কাজের সূচনা করে গিয়েছিলো সেগুলোর চূড়ান্ত রূপ দিয়ে স্বদেশী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠা ঐতিহাসিক এই বিদ্যালয়টির পূর্ব সুনাম ফিরিয়ে আনা।
মফস্বলে সাংবাদিকতা করা কিংবা একটি দৈনিক সম্পাদনা করা সহজ কোনো কাজ নয়। বিশেষ করে সুনামগঞ্জের মতো প্রান্তিক ও অবাণিজ্যিক শহরে এই কাজটি আরও কঠিন বৈকি। কিন্তু আবেদ কী এক আশ্চর্য মনোবল নিয়ে একটি দৈনিক সংবাদপত্র প্রকাশ করে গেছে তার ভিতরের খবর অনেকেই বুঝবেন না। জাতীয় পত্রিকা বা টিভি রিপোর্টিং করার মাঝেও ঝুঁকি বিদ্যমান। সংবাদ মানেই তো কারও না কারও বিপক্ষে যাবে, কারও না কারও স্বার্থে আঘাত করবে। মফস্বল শহরে এমন কাজ করতে কলিজা লাগে, সাহসের প্রয়োজন হয়। সাংবাদিক আবেদ সেই সাহসের পরিচয় দিয়েছে। সাহসী এই ভূমিকার জায়গায় আবেদের মূল্যায়ন হবে এবং সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতে তাঁর উপযুক্ত স্থান নির্ধারিত হবে। আমি নিশ্চিত আমার প্রিয় আবেদ একটি উচ্চতর আসনই পাবে যেখান থেকে গলা উঁচিয়ে সে বলবেÑ ‘‘আমি নেই তো কী হয়েছে, তোমরা তো আছ। আমরা যে ভয় জয় করেছিলাম তোমরাও তোমাদের পরাভব না মানা হৃদয়কে সামনে মেলে ধর। দেখবে আমিও আছি তোমাদের সাথেই।’’
প্রিয় আবেদ, তোমার জামাইবাবুর হৃদয় আজ চূর্ণ বিচূর্ণ। স্বজন হারানোর বেদনায় ব্যাকুল। তুমি দাদার চাইতেও জামাইবাবুর মধুরতম সম্পর্কসূত্রে আমাকে বেঁধেছিলে। আমি আজীবন সম্পর্কের এই মধুটুকু সঞ্চয়ে রাখব। বিশ্বাস করো, এ হলো আমার অমূল্য সঞ্চয়।

  • [১]