সারা পৃথিবী ব্যাপী দক্ষিণ পন্থার উত্থান ঘটা শুরু করেছে বেশ আগে থেকেই। ¯œায়ুযুদ্ধ অবসানের পর সেই আশির দশক থেকেই এই উত্থানপর্ব শুরু হয়। এখন এই প্রবণতা অনেক বেড়ে গেছে। ভারতের দিল্লীতে সম্প্রতি সংঘটিত দুর্ভাগ্যজনক ও জঘন্য ঘটনাগুলো ওই ধারাক্রমেরই অংশ মাত্র। রাজনীতি বা রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে ধর্মকে বিযুক্ত করে যে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি প্রবর্তিত হয়েছিল, আজ ঘটনাচক্রে সেই গণতান্ত্রিক উদারবাদ হুমকির মুখে। ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন, ধর্মের ভিত্তিতে উন্মাদনা, ধর্মের ভিত্তিতে সহিংসতা; আজকের পৃথিবীর সবচাইতে প্রলয়ংকরী সমস্যা। যেকোনো ভাইরাসের চাইতেও এ অনেক বেশি অনিষ্টকর। বর্তমান পৃথিবীতে শুধু ধর্মীয় কারণে যত মানুষের প্রাণ যায়, তত পরিমাণ প্রাণ হরণের ক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি কোনো জীবনবিধ্বংসী জীবাণু বা ভাইরাসও। সম্প্রতি নবেল করোনা ভাইরাস নিয়ে যে মহাআতংক বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ তৈরি করেছে তার চাইতেও অনেক বেশি উদ্বেগজনক হল ধর্মীয় উন্মাদনা। মানব সভ্যতার ভবিষ্যত কোন পথে বাঁক নিবে সেই প্রশ্ন এখন সারা পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষের মনে অহরহ অনুরণন তৈরি করে চলেছে। দুর্ভাগ্য হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সিদ্ধি, ক্ষমতার সম্ভোগ, পরার্থ হরণ আর অলীক কিছু স্বপ্ন বিলাসের কারণে এই উগ্রপন্থা দেশে দেশে মহামারির আকার ধারণ করছে। দিল্লী আজ সেই মহামারিতে আক্রান্ত। সেখানে গত কিছুদিন ধরে মানবতা ভূলুণ্ঠিত হয়ে আছে কতিপয় দানবের উগ্রতার উদ্যানে। সেখানে রক্ত ঝরেছে মানুষের। যে মানুষ জন্মসূত্রে কোনো না কোনো ধর্মের পরিচয় বহন করেন সেই জন্ম পরিচয়ই কাল হয়েছে তাদের। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, ভারতের ক্ষমতাসীন মহলের মদদের অভিযোগ রয়েছে ওই সহিংসতার পিছনে। সরকারের দায়িত্ব হল, সকল নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান করা। সেটি না করে সরকার যখন অপশক্তির আস্ফালনের সময়ে নীরব ভূমিকা রাখে তখন সেই সরকারও অন্ধকার শক্তির পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হয়। আমরা তীব্র নিন্দা জানাই ওইসব সাম্প্রদায়িক মনোভাবের উগ্র ধর্মান্ধদের।
দিল্লীর তথাকথিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সময়েও এক মানবিক আলোর উদ্ভাসন দেখা যাচ্ছে পুরো ভারতজুড়ে। সেখানকার বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজ এই সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধে সোচ্চার হয়েছেন। শুধু সংগঠন নয়, সাধারণ মানুষের মাঝেও দেখা গেছে অভাবনীয় মানবতাবোধ। মানবিক হিন্দুরা যেমন মুসলমান পরিবারগুলোর রক্ষায় এগিয়ে আসছে তেমনি মানবিক মুসলমানও হিন্দু পরিবারগুলোকে রক্ষায় বুক চিতিয়ে দিচ্ছে। সম্প্রীতির এই উজ্জ্বলতা একটি সাধারণ সত্য, যা সর্বকালের চিরসত্য। এই সত্য হলো- সাধারণ মানুষ কখনও এইসব অশান্তি পছন্দ করে না। আসলেও তাই, যারা দাঙ্গা বাধায়, যারা গোল করে, সহিংসতায় উন্মত্ত হয়; এরা খুবই অল্প। কিন্তু এই অল্প দানবশক্তির কাছেই নিরীহ মানুষ সর্বদা জিম্মি হয়ে থাকে। সংখ্যাল্পরাই মতান্ধ হয়ে, ধর্মান্ধ হয়ে, লুণ্ঠনকারী হয়ে, ক্ষমতাশালী হয়ে, বিত্তশালী হয়ে; ইতিহাসের সকল সময়ে গরিষ্ঠের উপর ছড়ি ঘুরিয়েছে। এই সংখ্যাল্প দানবশক্তিকে পরাভূত করে সকল মানুষের বাসযোগ্য শান্তিময় পৃথিবী গড়ে তোলাই বিশ্বের তাবৎ সাধারণ মানুষের আকাক্সক্ষা। কবে পৃথিবীজুড়ে আসবে সেই মানুষের জয়গানে মুখরিত হওয়ার উদার সমাজ?
সব ধরনের অপকর্মের বিরুদ্ধে সমাজে প্রতিবাদ জারি থাকে। যেমন আছে ভারতে। আমরাও ওই প্রতিবাদে শামিল। এই ধরনের পরিস্থিতিতে সুযোগ সন্ধানী আরেকটি গোষ্ঠীও সক্রিয় হয়ে উঠে। এরা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে তৎপর থাকে। এরা প্রতিবাদীর ভেক ধরে হিংসার বদলে প্রতিহিংসার বিষ ঢালে সমাজে। এদেরও প্রতিহত করাটা সমান জরুরি। বৈশ্বিক নানা দুর্যোগ-দুর্বিপাকে বাংলাদেশ এখনও একটি স্থিতিশীল অবস্থা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের কৃতিত্ব বা দূরদর্শিতাবোধের প্রমাণ এটুকু। এই স্থিতিশীলতা যেকোনো মূল্যে ধরে রেখে মানবিকতা ও উদারতার অনুপম দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হবে।