- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

দারিদ্রতা হটানোর সাথে সম্পদ বৈষম্য নিরসনের চিন্তা করা উচিত

বাংলাদেশের একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এনজিও ব্যক্তিত্ব এক এগারোর সময় দারিদ্রতাকে জাদুঘরে পাঠানোর অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি তাঁর প্রতিশ্র“তি রাখতে পারেননি। এখন জাতিসংঘ ঘোষণা করেছে ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীর দারিদ্রতা হটানোর। শনিবার সিলেটের এক অনুষ্ঠানে আমাদের অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যে এই আশাব্যঞ্জক খবরটি জানা গেছে। অর্থমন্ত্রী ওই সভায় বলেছেন, বাংলাদেশে এখনও তিন কোটি লোক গরিব, ২০২১ সালের মধ্যে প্রত্যাশা মোতাবেক দেশ মধ্যম আয়ের পর্যায়ে উপনীত হলে বর্তমান দারিদ্রতা হ্রাস পাবে। দারিদ্রতা বিমোচনে জাতীয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানাবিধ তৎপরতা জোরেসুরে চালু আছে। সরকার ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের চেষ্টায় পৃথিবীর দারিদ্রতা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে সত্য কিন্তু এর মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর হওয়ার কোন লক্ষণ কোথাও দৃশ্যমান নয়। বরং সম্পদের কেন্দ্রীভবন ঘটছে দ্রুত। শতকরা ৯৫ ভাগ সম্পদের মালিকানা শতকরা ৫ ভাগ মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত হয়ে এই বৈষম্য এখন কদাকার চেহারা ধারণ করেছে। যখন পৃথিবীজুরে দারিদ্রতার অভিশাপ ছিল তখনও সম্পদ বৈষম্যের এমন অবস্থা ছিল না। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্মেষ ও প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে কৃষি ও শিল্পক্ষেত্রে উন্নতি ঘটেছে, এর প্রভাবে মানুষের কর্মসংস্থান ও আয় বেড়েছে, অবধারিতভাবেই দারিদ্রতা হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে শোষক ও শোষিতের দ্বন্দ্ব হ্রাস পায়নি বরং এটি বেড়েছে। দারিদ্রতা বিমোচনের অঙ্গীকারের সাথে এই বৈষম্য নিরসনের বিষয়টিকে আমলে না নিলে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর চেহারা কখনও সুখকর হবে না।
বাংলাদেশে গরিব বলতে যার ন্যুনতম দুই বেলা খাদ্যের সংস্থান নেই তাদেরকেই বুঝানো হয়। পশ্চিমা বিশ্বের দারিদ্রতা নিশ্চয়ই এই সংজ্ঞার্থের মধ্যে আটকে রাখা সম্ভব হবে না। তিন বা চার দশক আগে আমাদের দেশে অনাহারে মানুষ মারা যেত, দুর্ভিক্ষ ছিল নিত্যকার। এখন মানুষ অনাহারে থাকে না সত্য কিন্তু মৌলিক অধিকারের অনেক কিছুই একটি ব্যাপক সংখ্যক মানুষের আয়ত্বের বাইরে রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করে স্কুল গমন উপযোগী শিশুদের স্কুলে যাওয়ার অগ্রগতি বাড়ানো গেলেও ঝরে পড়া রোধ করা যাচ্ছে না কিছুতেই। ফলে অধিকাংশ শিশু প্রাথমিকে ভর্তি হলেও ন্যুনতম শিক্ষা গ্রহণে এখনও শতাংশের হিসাবে সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছানো যাচ্ছে না।   স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রান্তিক নাগরিকদের অবস্থা একেবারেই উপেক্ষিত। বরং রোগে আক্রান্ত হলে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করাই যেন তাদের নিয়তি। বাসস্থানের অবস্থাও তথৈবচ। গ্রামে গেলে মানুষের আবাসনের অবস্থা দেখলে প্রকৃত চিত্র বুঝা যায় যা শহরের চকচকে অবস্থার সাথে আকাশ পাতাল প্রভেদ। এইরকম অবস্থায় শুধু দুই বেলা ন্যুনতম আহার গ্রহণের মধ্যেই যদি দারিদ্রতা মোচনের চিন্তা আটকে থাকে, তাহলে মানবসম্পদ উন্নয়নের ধারণাটি প্রচণ্ডভাবে মার খাবে। বিশ্ব পরিস্থিতিতে প্রতিযোগিতামূলকভাবে নিজের অবস্থান সংহত রাখতে হলে অবশ্যই এই ধারণার পরিবর্তন করতে হবে।
সমাজের অন্তর্গত দ্বন্দ্বের কারণে উৎপাদনসম্পর্কের সংঘাত পৃথিবীর আদিম আর্থ-সামাজিক সমস্যা। অর্থনীতি ও রাজনীতির অনেক পণ্ডিত ব্যক্তিরা এর সুরাহাকল্পে নানা দর্শনের উদ্ভব ঘটিয়েছেন। পুঁজিবাদী অর্থনীতির শোষণমূলক চরিত্রকে হটাতে সমাজতান্ত্রিক দর্শনের উদ্ভব হয়ে বিশ্বের কয়েকটি রাষ্ট্রে সফল প্রয়োগ ঘটেছিল। কিন্তু এই ব্যবস্থা প্রবল প্রতিকূলতা ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের কারণে বিপর্যস্ত হয়েছে। সমাজতন্ত্র মানুষে মানুষে বৈষম্য নিরসন এবং মানবজাতির কল্যাণের প্রায়োগিক উপায় বাতলে দিয়েছিল। আমাদের অর্থনীতি সমাজতান্ত্রিক নয়, যদিও সংবিধানে এটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সমাজতন্ত্র নেই বলে তো মানুষের অবস্থা উন্নয়নের স্বপ্ন পানিতে পড়ে মরে যায় না। সুতরাং যে ব্যবস্থাই হোক মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানোর স্বপ্ন সবসময়ই চলমান থাকবে।

  • [১]