- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

দালালচক্রের হাতে ‘কৃষিকার্ড’

বিশেষ প্রতিনিধি
জেলায় ধান কাটা প্রায় শেষ। রবিবার থেকে সরকারিভাবে ধান কেনা শুরু হবে। জেলায় এবছর প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ টন ধান উৎপাদন হলেও সরকার কিনবে মাত্র ১৭ হাজার ৪৮৩ টন ধান। এই ধানও প্রকৃৃত কৃষকরা দিতে পারবেন কী-না, এই নিয়ে চিন্তিত তারা। প্রতিবছরের মতো এবারও মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃষিকার্ড হাতিয়ে নিচ্ছে। ধান দেবার লটারিতে এরাই সরবরাহ করবে শত শত কার্ড, প্রকৃত কৃষকরা তাতে বঞ্চিত হবে।
জেলায় দুই লাখ ২২ হাজার ৭৯৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষাবাদ করে এবার প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ টন ধানের উৎপাদন হয়েছে। বাজারে এখন ধানের দাম প্রকারভেদে ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকা। সরকার ধানের মূল্য নির্ধারণ করেছে প্রতি মণ ১২০০ টাকা। আগামী রবিবার খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার ভার্চ্যুয়ালি সুনামগঞ্জের ধান কেনা উদ্বোধন করবেন। সুনামগঞ্জে এবার ধান কেনা হবে ১৭ হাজার ৪৮৩ টন। সরকারি খাদ্য গোদামে একজন কৃষক সর্বোচ্চ তিন টন ধান বিক্রয় করতে পারবেন।
সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলায় কৃষক আছেন তিন লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৭ জন (কৃষি অফিসের কৃষক তালিকা অনুযায়ী)। সরকারের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি কৃষক তিন টন করে ধান দিলে সুনামগঞ্জ জেলায় পাঁচ হাজার ৮২৭ জন কৃষক সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে ধান বিক্রয় করতে পারবেন। ভাগ্যবান এই কৃষক হতে প্রতিবছরই দৌঁড়ঝাঁপ শুরু হয় কৃষকদের।
হাওরাঞ্চলে প্রতিবছরই সরকারি ধান কেনা নিয়ে অনিয়মের খবর শুনা যায়। অনলাইনে ধান কেনা বেচায়ও কৌশলে নয় ছয় হয়। বিশেষ করে মধ্যস্বত্বভোগীদের সঙ্গে খাদ্য গোদামের অসৎ কর্মচারীদের যোগসাজসে কৃষকের কৃষি কার্ড দিয়ে এরাই গোদামে বিপুল পরিমাণ ধান দেবার অভিযোগ শুনা যায়। এবারও সেটির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।
বুধবার দুপুরে ঝাওয়ার হাওরের পাশের খলায় ধান শুকাচ্ছিলেন সুনামগঞ্জ শহরতলির আপ্তাবনগরের কৃষক জহুর উদ্দিন। মধ্যস্বত্বভোগী কর্তৃক গ্রামের কৃষিকার্ড সংগ্রহ করার কথা জানিয়ে তিনি গোদামে ধান বিক্রয় করতে না পারার কষ্টের কথা বর্ণনা করলেন।
বললেন, ‘ধান তো ভালই অইছে (হয়েছে), অখন (এখন) গোদামে যদি ধান বেচতাম (বিক্রয় করতে) পারতাম, তাইলে কয়টা (কিছু) টেকা (টাকা) পাইলাম নে (পেতাম), ইটাতো (এটিতো) পারতাম নায় (পারবো না), আমরার গাঁওয়ে (গ্রামে) দুই তিন জন ব্যবসায়ী আছে, এরা আস্তা (পুরো) গাঁওয়ের হকল (সকল) কৃষি কার্ড সংগ্রহ করিলিব (করে নেবে), অনলাইনে আবেদন করবো, যয়টা (যতগুলো) ঠিকে, হকলটিরে (সকলকে) ৫০০-১০০০ টেকা দিয়া ধান গোদামে দিব তারাই, আর আমরা যারা প্রকৃত কৃষক, তারার নাম দেখা যাইবো (যাবে) লটারিতে ওঠছে না। ইবারও (এবারও) আরম্ভ (শুরু) অইগেছে (হয়েছে) ই-কাম (এই কাজ)।’
তিনি জানালেন, গোদামে ধান কেনা শুরু হলেই কৃষি কার্ড সংগ্রহ করতে মধ্যস্বত্বভোগীরা গ্রামে গ্রামে বাড়ী বাড়ী যাবে। তার মতে যারা কৃষি কার্ড করেছে, তারাও কিছু অনিয়ম করেছে। অনেক রিক্সা চালক ও ঠেলা চালককে কৃষি কার্ড দেওয়া হয়েছে।
বিশ^ম্ভরপুরের রাধানগরের কৃষক আব্বাস উদ্দিন জানালেন, গোদামে ধান কেনার যে লক্ষ্যমাত্র থাকে, অর্ধেক রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধিরা দিয়ে দেন। বাকী অর্ধেকের মধ্যে ছোট খাটো ধানের ব্যবসায়ীরা একেকজনে ৩০-৪০ টা কার্ড সংগ্রহ করে জমা দেয়। পরে লটারিতে যাদের নাম ওঠে, তাদের নামেই ব্যবসায়ীরা ধান দেয়। কৃষকরাা কেবল টাকা তুলে দেয়। এজন্য কৃষদেরকে ওই ব্যবসায়ীরা টনে হাজার খানেক টাকা দেয়। তার মতে কৃষকরা অনেক সময় ইচ্ছে করেই গোডাউনে যায় না। কৃষকরা সরাসরি গেলে গেডাউন কর্মচারীরা ধানে চিটা আছে, শুকনা কম এসব কথা বলে হয়রানি করে।
বিশ^ম্ভরপুরের ব্রজনাথপুরের কৃষক সুধাংশু বিশ^াস, তাহিরপুরের বড়দলের কৃষক মিলন মিয়া একই ধরণের মন্তব্য করলেন।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা বেনু গোপাল দাস বললেন, প্রকৃত কৃষকদের আবেদন করানো গেলে, কৃষি অফিস তৎপর থাকলে, কৃষিকার্ড কেনা- বেচার সুযোগ থাকবে না। তিনি জানান, আগামী সাত মে খাদ্যমন্ত্রী সরকারি ধান কেনা ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করবেন। এ জেলায় ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ১৭ হাজার ৪৮৩ টন ধান কেনা হবে। এরমধ্যে সুনামগঞ্জ সদরে ১২৩৫, শান্তিগঞ্জে ১৮১৭. দোয়ারাবাজারে ৯৫১, ছাতকে ১১২৮, জগন্নাথপুরে ১৬৩৫, দিরাইয়ে ২৪৬৯, শাল্লায় ১৮৩১, ধর্মপাশা ও মধ্যনগরে ২৩৮৭, জামালগঞ্জে ১৯৫২, তাহিরপুরে ১২৯২ ও বিশ^ম্ভরপুরে ৭৮৬ টন ধান কেনা হবে। এরমধ্যে সুনামগঞ্জ সদর, দোয়ারাবাজার, দিরাই, জামালগঞ্জ ও তাহিরপুরে ধান কেনা হবে অনলাইনে।

  • [১]