- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

‘দায়মুক্তি’র সংজ্ঞার্থসন্ধান

ইকবাল কাগজী
বোধ করি যাঁরা পত্রিকা পড়েন তাঁদের সকলেরই দৃষ্টিগোচর হয়েছে পত্রিকা পরিবেশিত খবরটি। গত শনিবার (১৬ ডিসেম্বর ২০১৭) দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর-য়ের একটি সংবাদ শিরোনাম ছিল, ‘সরকারি এসসি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ॥ কার ‘দায়মুক্তি’ চান প্রধান শিক্ষক জানতে চাইলেন জেলা প্রশাসক’। সংবাদবিবরণীর শুরুতেই বলা হয়েছে, ‘সরকারি সতীশচন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হাফিজ মো. মাশহুদ চৌধুরীর কাছে ‘দায়মুক্তি’ শব্দের ব্যাখ্যা চেয়েছেন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম।’
কীছু দিন আগে উপরিউক্ত ‘ভারপ্রাপ্ত প্রধান’ পত্রিকান্তরে একটি প্রবন্ধ ছাপিয়েছেন। প্রবন্ধটি যে-দিন (শুক্রবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৭) ‘দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর’-য়ে ছাপা হয় তার পরের দিনই ছাপা হয় ‘দৈনিক সুনামকণ্ঠে’। বলতেই হয় সৌভাগ্যবান এই লেখাটি, তৃতীয়বারের মতো ছাপা হয়, ২০ নভেম্বর সোমবারে, ‘দৈনিক আলোকিত সুনামগঞ্জ’-য়ের পাতায়।  প্রত্যকবারই ‘সতীশীয়ানরা এগিয়ে যাচ্ছে শত বাঁধা মাড়িয়ে’ এই প্রদীপ্ত শিরোনাম অক্ষুন্ন ছিল। একই লেখকের একই প্রবন্ধ একাধিক পত্রিকায় ছাপা হলে সেটি একরকম দাঁত ক্যালানোর বৈশিষ্ট্য অর্জন করে, যদি না সেটার সমাজোন্œয়ন  ও জনস্বার্থ সংরক্ষণে সামর্থ্যরে বিবেচনায় জনপ্রত্যাশা পূরণ করতে সমর্থ না হয় এবং পর পর তিন দিন বিজ্ঞাপন প্রচারের মতো তিনটি পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধের প্রসঙ্গে পাঠককূলের ধারণা বিষদৃশ না হলেও অন্যরকম লাগতেই পারে এবং সেই সঙ্গে প্রবন্ধটির মর্মপ্রসঙ্গের চেয়ে  প্রচারের উদ্দেশ্যপ্রবণতার খরতা সম্পর্কে একটি বাঁকাবার্তা পরিবেশিত হয় এবং যে-কেউ সহজে এর পেছনে অন্যরকম কোনও কীছুর বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতার গন্ধ লাভে সমর্থ হলে কারও কীছু করার থাকে বলে মনে হয় না এবং আদপে সে ‘অন্যরকম কোনও কীছু’টি জনসমক্ষে প্রকটিত হয় যখন পত্রিকার সংবাদে বলা হয়, ‘গত ২ অক্টোবর এসসি সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের চারজন ছাত্রী ও প্রধান শিক্ষক হাফিজ মো. মাশহুদ চৌধুরী নিজ নামে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছেন।’ এবং প্রসঙ্গটি আরও ‘পরিপক্কতা’ পায়, যখন জানা যায় যে, ‘ভারপ্রাপ্ত প্রধান’ ২১ নভেম্বর জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে ব্যক্তিগত আবেদনসহ জেলাপ্রশাসকের সহযোগিতার প্রত্যাশী হয়েছেন এবং সর্বোপরি আবেদনটির জনস্বার্থসংশ্লিষ্টতার বিষয়টি বীরবিক্রমে লাফিয়ে সামনে এসে পড়ে যখন আসলেই জনস্বার্থের প্রতি অকৃত্রিম অনুরাগী জেলা প্রশাসক ১৩ ডিসেম্বর এসসির ‘ভারপ্রাপ্ত প্রধান’-য়ের কাছে আবেদনে উল্লেখিত ‘দায়মুক্তি’ শব্দের ব্যাখ্যা অবগত হতে চান। এবং প্রকারান্তরে  ‘সতীশীয়ানরা এগিয়ে যাচ্ছে শত বাঁধা মাড়িয়ে’ এই প্রত্যয় দীপ্ত  অভিযাত্রার তাৎপর্যটি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে এবং সতীশিয়ানদের  ‘শত বাঁধা মাড়িয়ে’ যাওয়ার অভিযাত্রাটি একটি অলীক স্বপ্নকল্পনায় পর্যবশিত হয়।  
যত ভাবছি, কেন জানি বিষয়টি শেষ পর্যন্ত অনিবার্যভাবে জটিলতা ও কূটিলতার একটি আবর্তে গিয়ে পড়ছে। শুনেছি আমার একজন শুভার্থী এই ‘ভারপাপ্ত প্রধান’-এর পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রবন্ধটি নিয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া আমার পক্ষ  থেকে না দেখানোয় অনুযোগ করে বলেছেন যে, আমার কলমের ধার কমে গেছে। কারও প্রতিক্রিয়ার প্রত্যাশা এখানে কেউ করে না, এমন সাংস্কৃতিক অনুশীলনে সুনামগঞ্জের বিদ্ব্যৎসমাজ এখনও অভ্যস্ত হয়ে উঠেনি। তবু আমার প্রতি তাঁর এই প্রত্যাশাটিকে শ্রদ্ধা জানাই এবং তৎসঙ্গে এইটুকু বলে রাখি যে, ‘আমার কলমে ধার’ আছে কি নেই সেটা আপাতত কোনও কাজের কথা নয়, কাজের কথা হলো প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা। আমার শুভার্থী নিশ্চয়ই জানেন, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ না করার অর্থ হলো নিজেকে ঠুঁটোজগন্নাথরূপে প্রতিপন্ন করা। যাকে বলে, মরার মতো বেঁচে থাকাকে স্বীকার করে নেওয়া। আমি অন্তত তাই মনে করি এবং এও সত্য যে, বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় ‘কর্তাবিরোধী ঠুঁটোজগন্নাথ’ হয়ে বেঁচে আছি, যে-বেঁচে থাকাকে জীবন্ত লাশ বললেও কোনও অত্যুক্তি হবে বলে মনে হয় না। জড়ভরতত্ব্ই বর্তমান যাপিত জীবনের একমাত্র অভিধা। সমাজের অবস্থা এমন যে, স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়ে আমার জন্য কেউ কোথাও একটু জায়গা ছেড়ে দিয়ে বসে নেই।
নিয়ন্ত্রণদক্ষ এক সার্বিক ব্যবস্থার শিকার মানুষ ও প্রতিষ্ঠানসমূহ এখানে ‘চুরি করা গরুর বাজার’ মার্কা অর্থব্যবস্থার পরিসরে ওতপ্রোত ও নিমজ্জিত এবং মানবচেতনা কিংবা বিবেচনার মূলে সার্বজনীন কোনও উপলব্ধি, যুক্তিশীলতা, ন্যায্যতার ধারণা বলে কোথাও কীছু নেই এবং ক্ষমতার কর্তৃত্ব চলে গেছে মুনাফাখোর কতিপয়ের করায়ত্বে এবং  এই ভোগী কর্তৃত্ব সৃজনশীল মেধার পৃষ্ঠপোষকতা করে না, কেবল প্রশ্নহীন আনুগত্যই তার কাছে নিরন্তর অভিনন্দিত। লোকে কথা বলে ক্ষমতার জোরে, ন্যায্যতা এখানে লাপাত্তা। সমাজতন্ত্রের মূলো ঝুলিয়ে মুক্তচিন্তাহর পুঁজিবাদের মজাদার পাতা খাওয়ানোর মূলমন্ত্রের মানুষ এখানে মুগ্ধ হয়ে শামসুর রাহমান কথিত ‘অদ্ভুত উঠের পীঠে’ চড়ে বসে আছে। এমতাবস্থায় একজন ‘ভারপ্রাপ্ত প্রধান’ মনে মনে যাচ্ছেতাই ভেবে নিতেই পরেন, জনস্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কি অসংশ্লিষ্ট সে ভাবনা তাঁর নয়। তিনি যে-টা করেন সে-টা যদি নিতান্ত অর্থহীন হয় তাতেই বা কী? রজনীশ তো তার নিজেকে ভগবান বলে ঘোষণা করেছিল। রাশিয়ার রাজপুতিন নিজেকে ঈশ্বরের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল।
কত কীছুই তো হচ্ছে আজকাল চারদিকে। পাশের বাসার চার বছরের মেয়েটিকে তার বাপের বয়সী লোকটি ধর্ষণ করে  মেরে ফেলে লাশ গুম করে দেওয়ার সংবাদ আমরা পেয়েছি পত্রিকান্তরে কিংবা একজন ধর্ম বিষয়ে ‘উচ্চশিক্ষিত’ মুসলিম মাসুম বাচ্চাসহ স্ত্রীর সঙ্গে নিজেকে আত্মঘাতী বোমায় উড়িয়ে দিচ্ছেন, বাচ্চাদেরকে পুলিশের কাছে ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান উপেক্ষা করে। তাছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধমে আমরা কত কীছুই বলা হচ্ছে, একেবারে লাগামছাড়া, এমনকি শেখ হাসিনাকে হত্যার হুমকি দিতেও কসুর করা হয় না। এতো সব কা-কলার মধ্যে সরকার প্রধানসহ অনেকের কাছেই আবেদন নিবেদনও থাকে। কিন্তু যদি কোন প্রস্তাবনা প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিবেচনার জন্য যথাযথ দাপ্তরিক বিধি অনুসরণ করে পাঠানো হয়, সঙ্গে দাপ্তরিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট করা হয় জেলা প্রশাসককে তখন তা আর কোনও মামুলি বিষয় থাকে না, সেটা কোনও নাগরিকের পক্ষে সহজে উপক্ষেণীয়ও হতে পারে না। কারণ যে-কোনও মুহূর্তে প্রস্তাবিত বিষয়টি আইন হয়ে গিয়ে নাগরিকের জীবন নিয়ন্ত্রণের অমোঘ অস্ত্র হয়ে উঠার সম্ভানার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে।
‘ভারপ্রাপ্ত প্রধান’ তাঁর প্রবন্ধে যে-সব প্রস্তাবনার অবতারণা করেছেন সেগুলোর বিশেষ একটি প্রস্তাবনা ভিন্ন বাকি সব কটি নিয়ে আলোচনার অবকাশ তৈরি করার আপাতত কোনও যৌক্তিতকতা আছে বলে মনে হয় না। কিন্ত ‘ভারপ্রাপ্ত প্রধান’ তাঁর কতিপয় প্রস্তাবনার সঙ্গে একটি বিশেষ শব্দ ‘আধ্যাত্মিকতা’-কে এমনভাবে সন্নিবেশিত করে দিয়েছেন যে, এই বিশেষ শব্দটির মিশ্রণ প্রস্তাবনার বাস্তবতা ও বাস্তবায়নকে অলীক করে তোলেছে। মনে রাখতে হবে, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা হলো মূর্তনির্দিষ্ট কতকগুলো বাস্তবতা, যে-বাস্তবতার সঙ্গে ‘আধ্যাত্মিকতা’কে মিশিয়ে দিলে ইহজাগতিকতা ও পারলৌকিকতার অদ্ভুত মিশ্রণের পাঁকে পড়ে  ‘পরিচালনার কাজটা’ একবারেই তলিয়ে যাবে, চোরাবালিতে তলিয়ে যাবার মতো করে, প্রকারান্তরে কীছুই  হয়ে উঠবে না এবং প্রতিপন্ন হবে যে, একই বলে হিতে বিপরীত।
জেলা প্রশসাক ‘ভারপ্রাপ্ত প্রধান’-এর বিশেষ একটি প্রস্তবনাকে চিহ্নিত করে ‘ভারপ্রাপ্ত প্রধান’-এর কাছে ‘দায়মুক্তি’ শব্দের ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছেন। প্রশ্ন সে-দিনই উঠেছিল এই ‘দায়মুক্তি’ শব্দটি নিয়ে, একটি সীমিত গ-ীর বিভিন্œজনের মধ্যে, যে-দিন সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধটি পত্রিকায় বেরিয়েছিল। কিন্তু সমাজটা সত্যসন্ধী কিংবা সত্যাগ্রহী কোনওটাই নয়, বিজ্ঞাপনের মিথ্যা প্রচারণায় এখানে সবকটি মুখ ঢাকা পড়ে গেছে। যে-সমাজে যাপিত জীবনের সমগ্রটাই প্রতারণার কাছে আত্মসমর্পিত সেখানে দুয়েকজনের প্রতিক্রিয়া অর্থহীন। বলা যায়, সে-বিবেচনায় সে-দিন প্রতিক্রিয়া প্রকাশের বাসনাটি মাঠে মারা গিয়েছিল। ‘ভারপ্রাপ্ত প্রধান’ তার অদ্ভুত উদ্ভাবন ‘দায়মুক্তি’র ধারণাটিকে সমাজের স্মৃতির অতলে  তলিয়ে যেতে না দিয়ে সরকারি স্বীকৃতি আদায়ে কোমর বেঁধে লেগে পড়ার ‘অদ্ভুত আগ্রহ’ প্রদর্শন করলেন। সচরাচর যা কেউ করে না, কিন্তু তিনি করেছেন এবং প্রকারান্তরে বিষয়টি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
‘ভারপ্রাপ্ত প্রধান’ বলেছেন, ‘বাংলাদেশকে সার্বিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্যে পারস্পরিক দোষারোপ বন্ধ করে পারস্পরিক কল্যাণ কামনার পরিবেশ সৃষ্টি করা একান্ত প্রয়োজন। আর এ জন্য একটি জাতীয় সার্বজনীন অনুষ্ঠান দরকার। এ লক্ষ্যে একটি জাতীয় দায়মুক্তি দিবস পালনের আহ্বান জানানো এবং এর বাস্তবায়ন কৌশল ঘোষণার অনুমতি চেয়ে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মহোদয়ের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে আবেদন করেছে তারা।’ (হাফিজ মো. মাশহুদ চৌধুরী, সতীশীয়ানরা এগিয়ে যাচ্ছে শত বাঁধা মাড়িয়ে, দৈনিক আলোকিত সুনামগঞ্জ, সোমবার ২০ নভেম্বর ২০১৭।)। লক্ষণীয়, ‘ভারপ্রাপ্ত প্রধান’ নয় আবেদনটি করছে ‘তারা’। এখানে ‘তারা’ মানে ‘সতীশীয়ানরা’ অর্থাৎ সরকারি সতীশচন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সকল ছাত্রী। এই প্রসঙ্গে ‘উধোর পি-ি বুধোর ঘাড়ে’ প্রবচনটি খোপে খোপে খাপ খায় না বটে, তবু কেন জানি প্রবচনটির কথা মনে পড়ে গেলো। কিন্তু এই আবেদনের একটা দায় আছে। এই ‘আবেদনের দায়’টি ছাত্রীদের ক্ষেত্রে প্রযুক্ত হতেই পারে যেহেতু তারা, সাধে অসাধে যে-করেই হোক, আবেদনটি করেছে। প্রশ্ন হলো, সকল সতীশীয়ানরা কি ‘জাতীয় দায়মুক্তি দিবস’ এই শব্দবন্ধের সংজ্ঞার্থটা কী হতে পারে সে সম্পর্কে সম্যক অবগত আছে? না কি তারা কীছুই জানে না? কেবল তাদের শিক্ষাগুরুর খায়েশ চরিতার্থকরণে ‘আবেদন’ করতে তারা বাধ্য হয়ে নিজেদের ঘাড়ে দায় তুলে নিয়ে ‘উধোর পি-ি বুধোর ঘাড়ে’ প্রবচনটির বাস্তবতাকে মূর্ত করে তুলেছে? যদি তাই হয় তবে  আর একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন এই যে, একজন শিক্ষক কেন তাঁর নিজস্ব মতাদর্শের প্রকল্প বাস্তবায়নের কাঁচামাল হিসেবে ছাত্রীদেরকে ব্যবহার করবেন? তাঁর কর্মক্ষেত্রের পরিসরে সে অধিকার কি তাঁর আছে, যেখানে মতাদর্শটি হলো ‘জাতীয় দায়মুক্তি দিবস পালন’-এর মতো একটি অনির্দিষ্ট, অনির্ণিত, যৌক্তিক মাপকাঠিতে অনুত্তীর্ণ ও তদুপরি সম্পূর্ণ নতুন অর্থে যৎকিঞ্চিৎ হলেও বিতর্কিত? সতীশীয়ানদের অভিভাবকরা কি তাঁদের সন্তানকে ‘জাতীয় দায়মুক্তি দিবস’ নিয়ে আন্দোলনে ব্রতী হওয়ার জন্য বিদ্যালয়ে পাঠিয়েছেন? ঔপনিবেশিকতাবিরোধী মতাদর্শে উজ্জীবিত হয়ে একদা ছাত্ররা ব্রিটিশবিতাড়নের অন্দেলনে নেমেছিল। সেখানে স্বাধীনতা, স্বাদেশিকতা, জাতীয় মুক্তি কিংবা দেশপ্রেমের সম্মিলনে সৃষ্ট আবস্থার প্রেক্ষিতে একটি সার্বজনীন কর্তব্যকর্মে ব্রতী হওয়ার যৌক্তিকতা ছিল। ‘জাতীয় দায়মুক্তি দিবস পালন’-এর আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের (অর্থাৎ ছাত্রীদের) সক্রিয় হওয়ার কি সে-রকম কোনও ‘সার্বজনীন কর্তব্যকর্মে ব্রতী হওয়ার যৌক্তিকতা’ বর্তমান সমাজ পরিসরে বিদ্যমান আছে? আর যদি থাকেই তা নিয়ে আন্দোলন করার সিদ্ধান্তটা হবে শিক্ষার্থীদের একান্ত নিজস্ব, এতে শিক্ষকের জড়িয়ে পড়াটা তো কোনওভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়, এমনকি একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে এমন একটি আন্দোলনে জড়িয়ে পড়া বা নেমে পড়া তাঁর চাকুরির শর্তবহির্ভূত। অথচ ‘ভারপ্রাপ্ত প্রধান’ চাকুরির শর্তবহির্ভূত কাজে ব্রতী হয়েছেন। প্রকৃতপ্রস্তাবে তিনি তাঁর নিজস্ব প্রকল্পে শিক্ষার্থীদেরকে অন্যায়ভাবে  নিয়েজিত করেছেন, যা তাঁর অধিকারের মধ্যে পড়ে না। এই অনধিকারচর্চার জন্য প্রকৃতপ্রস্তাবে তাঁর দায় তৈরি হয়েছে, তিনি দায়ী হয়ে পড়েছেন।
মানবেন্দ্র কর একদিন আলাপচারিতায় মগ্ন হয়ে কেন জানি প্রশ্ন করেছিল, ‘পিড়িতি কাহারে বলে?’ এখন মনের মধ্যে এই মানবেন্দ্র করের মতো কেউ একজন প্রশ্ন করছে, ‘দায় কাহারে বলে? দায়মুক্তি কাহারে বলে?’ মানবেন্দ্র করের সেদিনের প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার কোনও দায় ছিল না। কিন্তু আজকের প্রাশ্নিক মনের মানবেন্দ্র করকে কী করে ফেরাই। আজকের প্রশ্নের উত্তর কোনও একটি মানবিক বোধের তাড়না থেকে অনিবার্য হয়ে উঠেছে। একেই বুঝি বলে দায়। আর এই দায় থেকে রেহাই পেলেই তাকে বলে দায়মুক্তি। অর্থাৎ দায়হীনতার নামান্তর (বা অন্যনাম) দায়মুক্তি।
দায়হীনতা বা দায়মুক্তি কোথায় আছে? দায়হীনতা আর দায়মুক্তি যাই বলি না কেন এই প্রপঞ্চটি প্রকৃতপ্রস্তাবে আছে জানোয়ারের (না-মানুষের জগতেও সম্ভব) জগতে। বাঘ ভেড়ার বাচ্চাকে ধরে খেয়ে ফেললে তার কোনও দায় নেই, নেই দায়মুক্তিও। না-মানুষের (পশুর) জগতে প্রথা, বিধি, বিধান, আদেশ, নিষেধ, নিয়ম, আইন ইত্যাদি নেই, নেই কোনও মতাদর্শ। তাই কোনও দায় নেই, দায়িত্ব নেই, দায়মুক্তি নেই। মানুষ সাংস্কৃতিক, মতাদর্শিক ও আইনানুগ প্রাণী। তার আছে সংস্কৃতি, ধর্ম, মতাদর্শ, সংবিধান। ধর্ম মানুষকে ধার্মিক ও সংবিধান মানুষকে আইনানুগ করে এবং সমাজ পরিসরে মানুষের কৃতকর্মানুসারে দায় তৈরি হয়, এই দায় থেকে তৈরি হয় পাপ (ধর্ম থেকে) ও অপরাধ (সংবিধান থেকে) বোধের এবং এই বোধের (পাপবোধ ও অপরাধবোধ)  ভিত্তিভূমিতে তৈরি হয় দ-নীতি। তাই যে-কেউ যদি বলেন, যেখানে মানুষের সমাজ গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক সেখানে কারও পক্ষে দায়মুক্তির কোনও সুযোগ নেই। দায়বদ্ধতাই পরম সত্য, এর উর্ধ্বে আর কোনও  সত্য হতে পার না। যেখানে ধর্ম অথবা আইন বিদ্যমান সেখানে কোনও মানুষই দায়ের উর্ধ্বে নয়। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, কিংবা আমাদের ‘ভারপ্রাপ্ত প্রধান’ ও তার সতীশীয়ান কেউই এই দায়ের উর্ধে নয়। রাষ্ট্রক্ষতার বাইরে অবস্থান করে যে-কোনও দায়মুক্তির ধারণা পোষণ করার অর্থ একটাই নিজেকে জানোয়ার বলে ঘোষণা করা।
‘ভারপ্রাপ্ত প্রধান’ ‘জাতীয় দায়মুক্তি দিবস পালন’-এর প্রস্তাবকে বর্ণনা করেছেন ‘সতীশীয়ানদের একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ, যার মাধ্যমে তারা ইতিহাস সৃষ্টি করতে চলেছে’ বলে এবং ‘বাংলাদেশকে সার্বিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য’ পরিকল্পিত তাঁর এই উদ্যোগটি (আদপে উদ্যোগটি সতীশীয়ানদের নয়) তিনি গ্রহণ করেছেন ভেবে প্রমোদিত হয়েছেন। কিন্তু প্রকৃতপ্রস্তাবে এই উদ্যোগ গ্রহণ করে তিনি বাংলাদেশকে একটি না-মানুষের (অর্থাৎ গরু,  ছাগলের) দেশ বানানোর ইতিহাস সৃষ্টির দিকে এগিয়ে চলেন এবং নিজেকে মূর্তিমান অশুভের প্রতিভূ করে তোলেন। এই ‘ইতিহাস সৃষ্টি’র অন্য কোনও অর্থ হবে না। দায়হীন ও দায়মুক্তির দেশের মানে যে-দেশে সভ্যতা নেই,  সমাজ ও  রাষ্ট্র বলে কীছু নেই, সর্বত্র একটা নৈরাজ্যিক অবস্থা বিদ্যমান অর্থাৎ পুরো দেশটাই একটা জঙ্গল, মানুষগুলো প্রত্যেকেই পশু হয়ে গেছে। দলে দলে রাজপুতিন, রজনীশরা আবির্ভূত হয়ে, প্রতিষ্ঠিত করেছে তাদের রাজত্ব। চারিদিকে খুন, ধর্ষণ, গণধর্ষণ নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে উঠবে, সতীশীয়ানরা কেউই বাসায় ফিরবে না, বিদ্যালয় ও বাসার ব্যবধান থেকে তারা হাওয়া হয়ে যাবে। সুতরাং দায়মুক্ত দেশে আধ্যাত্মিকতার চর্চাটা একটা রাজপুতিনীয় মাত্রা পেয়ে যাবে নিশ্চয়ই, তখন মানুষে আর গরুতে কোনও তফাৎ থাকবে না।
সমাজে মানুষ দায়ী হয় তার পাপ বা কুকর্ম বা অপরাধের জন্য। ‘দায়মুক্তি’র অর্থও এই পাপ, কুকর্ম ও অপরাধ থেকে মুক্তি।   ‘দায়মুক্তি দিবস পালন’-এর অর্থ ‘ভারপ্রাপ্ত প্রধান’ কথিত ‘পাস্পরিক দোষারোপ’ থেকে মুক্তি হতে পারে না। ‘পাস্পরিক দোষারোপ’ কোনও পাপ, কুকর্ম বা অপরাধের মতো জঘন্য নয়। তাই এই ‘দায়মুক্তি’ বাস্তবায়িত হলে ‘আধ্যাত্মিকতা’র লাগাম পরানো থাকলেও  গুরু’-র  হ্রস্ব উ-কার খসে যাবে নির্ঘাত। শিক্ষাগুরু শব্দটা বদলে গিয়ে হয়ে পড়বে শিক্ষাগরু। শিক্ষার্থীগুলো হয়ে পড়বে বকনা-বাছুর।

  • [১]