- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

দিবসের আনুষ্ঠানিকতা নয় সংকল্পের দৃঢ়তা চাই

বৃহষ্পতিবার সারা দেশে সাড়ম্বরে রোকেয়া দিবস ও আন্তর্জাতিক দুর্নীতি বিরোধী দিবস পালিত হয়েছে। নারী জাগরণ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় এই দুই দিবসের তাৎপর্য অপরিসীম। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সমূহের ব্যাপক আয়োজনে উভয় দিবসে নারীর ক্ষমতায়ন ও দুর্নীতি উচ্ছেদের বিষয়টি বেশ জোরেশোরে উচ্চারিত হয়েছে। দেশের বাস্তব অবস্থার সাথে সভায় উচ্চারিত এইসব কথামালার বিস্তর ফারাক থাকলেও বছর বছর আমরা একই ধরণের কথা শুনতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। দিবসগুলো এখন এর প্রকৃত তাৎপর্য হারিয়ে নিছক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। এই অনুষ্ঠান সর্বস্ব দিবস পালনের সার্থকতা কোথায়? যেদিন দুর্নীতিবিরোধী দিবস পালিত হলো সেই দিনেই এক অনুষ্ঠানে জনৈক সংসদ সদস্য ‘অসামাজিত-অথর্বদের হাতে নৌকা দেয়া হয়েছে’ বলে অভিযোগ তুলেছেন। তিনি এর কারণটি পরিস্কার না করলেও কৌশলে এর পিছনে অনৈতিক সংযুক্তির ইঙ্গিত করেছেন। রাজনৈতিক দলগুলো যখন জনপ্রতিনিধি মনোনয়নের ক্ষেত্রে অনৈতিক আচরণ করেন তখন আসলে দুর্নীতিবিরোধী যাবতীয় কথাবার্তা অসার হয়ে যায়। অন্যদিকে আমরা যখন মহাআয়োজনে রোকেয়া দিবস পালন করি তখনই এক মন্ত্রী বহিস্কৃত হন চরম নারী-বিদ্বেষী কথাবার্তা বলার কারণে। যারা রোকেয়ার নাম উচ্চারণ করে সভায় নারী জাগরণের কথা বলে গলা ফাটান তাদের কতজন রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জীবনসংগ্রাম ও সৃষ্টির খোঁজ রাখেন? যে গ্রামে জন্মেছিলেন এই মহিয়সী নারী খোদ সেই পায়রাবন্দ গ্রামের লোক ভাল করে জানে না কে এই রোকেয়া। অর্থাৎ রোকেয়ার জন্মের শতবর্ষ অতিক্রমের পরও আমরা তাঁর গ্রামেই তাঁকে চিনাতে ব্যর্থ হয়েছি, সারা দেশ তো দূরস্ত। এই যখন অবস্থা তখন দিবসগুলো অর্থহীনতার নামান্তর হয়ে উঠে।
আমাদের দেশে নারীরা অর্থনৈতিক কর্মকা-ে কিছুটা এগিয়েছেন। শিক্ষায়ও তাদের বেশ অগ্রগতি লক্ষণীয়। কিন্তু মানসিকভাবে এই নারীদের গত কয়েক দশকে অনেক বেশি পিছনে ঠেলে দিয়েছি আমরা। নারীর প্রতি পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি আরও অনেক বেশি কঠোর হয়েছে। নারীদের অন্তরালে রাখার সামাজিক আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে নিখুঁতভাবে। এখন নারীদের একটি বড় অংশ পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক অনুশাসনকে নিজের অবশ্য করণীয় হিসাবে গ্রহণ করে নিয়েছেন। এই অবস্থায় নারীর শিক্ষা কিংবা অর্থনৈতিক যাবতীয় উন্নয়নই হয়ে উঠেছে ভীষণ রকমের বৈসাদৃশ্যপূর্ণ। রোকেয়া নারীদের এমন উন্নয়ন কল্পনা করেননি। তিনি নারী উন্নয়নের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন সেখানে নারী হিসাবে নয় মানুষ হিসাবে পুরুষের সাথে সমান মর্যাদা পাওয়ার বিষয়টি ছিলো সামনে। জনগোষ্ঠীর অর্ধেক অংশ এই নারী সমাজকে অবজ্ঞা করে যে দেশ ও সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয় তাই হওয়া উচিৎ রোকেয়া দিবসের প্রধান আলোচনার বিষয়।
দুনীতি নিরোধের বিষয়টি ভীষণভাবে রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার সাথে জড়িত। রাষ্ট্রের চরিত্র জায়গায় রেখে দুর্নীতি দূর করা এক ধরনের অবাস্তব কল্পনা-বিলাস। অদ্ভুত হলো এই ধরনের কল্পনা-বিলাসেই আমরা এখন নিজের দায় সারি। যেদিন দুর্নীতিবিরোধী দিবস পালিত হলো সেই দিন বৈশি^ক ধনি-দরিদ্রের বৈষম্য বাড়ার একটি পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়েছে। সমাজবিজ্ঞানীদের নেটওয়ার্ক বিশ^ বৈষম্য প্রতিবেদনে বিশে^র ৭৬% ভাগ সম্পদের মালিকানা মাত্র ১০ শতাংশ ধনির হাতে সীমাবদ্ধ থাকার তথ্য উঠে এসেছে। উল্টোদিকে দারিদ্র্যতার পরিমাণ বাড়ার তথ্যও উঠে এসেছে ওই প্রতিবেদনে। ধনি ও দরিদ্রের মধ্যে সম্পদের এই ব্যাপক বৈষম্য থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় মোটা দাগে বিশে^র অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটি এখনও চরম শোষণমূলক। বৈষম্য বাড়ার পিছনে যুক্ত থাকে দুর্নীতি। বিশেষ করে ছোট অর্থনীতির দেশে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে পদানত রেখে সম্পদের পাহাড় তৈরি করে ছোট একটি গোষ্ঠী। এই বৈষম্য বজায় রেখে দুর্নীতিবিরোধী কথাবার্তা খুব বেশি তাৎপর্য বহন করে না।
তাই কোনো দিবস নয় বরং চলমান অন্যায্যতা ও বৈষম্য দূর করার কঠিন সংকল্প গ্রহণ করাই হলো আসল কথা। আসুন সুন্দর স্বদেশ ও বিশ^ নির্মাণে আমরা সংকল্পবদ্ধ হই।

  • [১]