বিশেষ প্রতিনিধি
কাজ শুরু হবার একযুগ পরেও শেষ হয়নি দিরাই-শাল্লার সড়ক নির্মাণ। জেলা শহর সুনামগঞ্জসহ সারাদেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে প্রায় দুই লাখ মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পোহাতে হচ্ছে। সড়কের দাবিতে আগামীকাল (২৫ মে) মানববন্ধন করবেন উপজেলাবাসী। হাওরের তলানির উপজেলা শাল্লা’র প্রায় দুই লাখ মানুষ একযুগ আগে স্বপ্ন দেখেছিলেন সারাদেশের সঙ্গে সড়কে সংযুক্ত হবেন তারা। ২০১১ সালে সড়কের কাজও শুরু হয়েছিল। ২০১৭ সালে শেষ হবার কথা ছিল সড়কের কাজ। প্রধানমন্ত্রী’র প্রতিশ্রুত এই সড়কটি’র এখনো বেহাল অবস্থা। এই সড়কের প্রায় ১০০ কোটি টাকার বিলও উত্তোলন হয়েছিল। কিন্তু সড়কটি যান ও জনচলাচলের উপযুক্ত হয়নি। বছর খানেক আগে সড়কের কাজ করার জন্য আবারও প্রায় সাড়ে ৫ শ’ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাবনা স্থানীয় সড়ক বিভাগ সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠালেও এখনো প্রকল্পটি অনুমোদন হয় নি।
দিরাই এবং শাল্লার দূরুত্ব ১৯ কিলোমিটার। শিক্ষা-দীক্ষায় অগ্রসর, রাজনৈতিক সচেতন এই উপজেলার প্রায় দুই লাখ বাসিন্দার প্রধান সমস্যা যাতায়াত ভোগান্তি। সুনামগঞ্জ থেকে দিরাই পর্যন্ত সড়ক রয়েছে। কিন্তু দিরাই থেকে শাল্লা’র ১৯ কিলোমিটার অংশে যোগাযোগ সড়ক স্থাপনের জন্য ২০১০ সালের ১০ অক্টোবর তাহিরপুরে এসেও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছিলেন, এই সড়ক নির্মাণ করে শাল্লাবাসী’র যোগাযোগ দুর্ভোগের অবসান ঘটানো হবে।
শাল্লা প্রেসক্লাব সভাপতি পিসি দাস বলেন, সুনামগঞ্জ থেকে দিরাই পর্যন্ত অনেক আগেই সড়ক হয়েছে। দিরাই থেকে মিলনবাজার পর্যন্ত ভাঙাচোড়া সড়ক পথে এক ঘণ্টায় পৌঁছাতে হয়। এরপর ৭ কিলোমিটার পথ বর্ষায় যেতে হয় ট্রলারে। হেমন্তে কিছু পথ ট্রলারে, কিছু পথ মোটর সাইকেল কিংবা পায়ে হেঁটে যেতে হয়। হেমন্তে শাল্লা থেকে সুনামগঞ্জ পৌঁছাতে জনপ্রতি ১৫০ টাকা, বর্ষায় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা লাগে। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাবার জন্য বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষা করছে মানুষ। নির্বাচন আসলে বার বারই বলা হয়, এবার ভোট দিলে দিরাই-শাল্লার সড়ক হবে। কিন্তু মানুষের আকাঙ্খা পূরণ হচ্ছে না, কবে পূরণ হবে তাও মানুষ জানে না। ৫০ বছর ধরে সড়ক নির্মাণের দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের। প্রয়াত জাতীয় নেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের প্রচেষ্টায় ২০১১ সালে কাজ শুরু হয়েছিল। ঠিকাদার এবং সওজ কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে স্বপ্নপূরণ হয় নি শাল্লাবাসীর। উপজেলাবাসীর ধৈর্য্যরে বাধ ভেঙেগেছে। আমরা এখন রাজপথে নামা ছাড়া কোন উপায় নেই। আপাতত শাল্লাবাসীর ব্যানারে মানববন্ধন হচ্ছে। পরে আরও কর্মসূচি দেওয়া হবে।
জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী’র প্রতিশ্রুত এই প্রকল্পে ২০১০ সালের শেষের দিকেই বরাদ্দ হয় ১১৯ কোটি টাকা। ২০১১ সালে দরপত্র প্রক্রিয়া শেষে সড়কে কাজ শুরু হয়। সড়কের কাজ শেষ হতে না হতেই অনেক স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। সড়কের স্লোপ ঠিকভাবে না হওয়ায় বেশিরভাগ অংশ সরু হয়ে গেছে। হাওরের ঢেউ থেকে সড়ক রক্ষা করার জন্য দেওয়া ব্লক অনেক স্থানেই ছুটে গেছে। সড়কের ছোট ছোট ৩ টি সেতুতে অ্যাপ্রোচ সড়ক নেই। ১৭ টি কালভার্ট’র বেশিরভাগেরই অ্যাপ্রোচে মাটি নেই।
সড়কের সেতু এবং কালভার্ট করা নিয়েও স্থানীয়দের সঙ্গে সড়ক ও জনপথ বিভাগের মতভিন্নতা রয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন যেখানে সেতু বা কালভার্ট প্রয়োজন সেখানে হয় নি, আবার যেখানে প্রয়োজন নেই, সেখানে সেত ওু কালভার্ট হয়েছে।
শাল্লা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলামিন চৌধুরী বললেন, প্রকল্প অনুমোদনও হবে না, যোগাযোগের স্বপ্নেরও বাস্তবায়ন দেখবে না শাল্লার মানুষ। তিনি বললেন, দিরাই থেকে মিলন বাজার পর্যন্ত সড়ক আছে, ওই সড়ক থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার হাওর অংশেও প্রতিবছর হাওররক্ষা বাঁধ হয়, এই হাওররক্ষা বাঁধকে স্থায়ী বাঁধে রূপ দিয়ে সড়ক করলেই দিরাই-শাল্লার হেমন্তে-বর্ষার মন্দের ভালো যোগাযোগ সড়ক হয়। সেটাও হচ্ছে না।
সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, এই সড়কটির প্রকল্প প্রস্তাবনা অনেক আগেই সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অভ্যন্তরীণ যাচাই-বাছাই কমিটিতে সড়ক নির্মাণের জন্য ৫৫১ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাবনা নির্ধারণ করা হয়। পরে ডিজাইন সেকশন থেকে সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রকল্প প্রস্তাবনা ৮৫৭ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় উর্ধ্বতনদের নির্দেশে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. জাকির হোসেনের নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞ দল গত ১৭ মে সরেজমিনে এই সড়ক পরিদর্শন করেন। তাঁদের যাচাই-বাছাই রিপোর্ট দেবার পর পরবর্তী করণিয় নির্ধারণ হবে।
এদিকে, দিরাই-শাল্লার সংসদ সদস্য ড. জয়া সেন গুপ্তা গত ১৮ মে তার নিজের ফেসবুকে আইডিতে স্ট্যাটাসে লিখেন, আঞ্চলিক মহাসড়কটি নিঃসন্দেহে আমাদের এলাকার দুই উপজেলার যোগাযোগের অন্যতম সড়ক। এটি শুধু অত্র এলাকায় নয়, এ সড়কটি বাস্তবায়িত হলে নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ি, হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলাকেও সংযুক্ত করবে।
তিনি লিখেন, দিরাই-শাল্লা সড়ক প্রসঙ্গ নিয়ে আপনাদের জানার আগ্রহের জন্য এ সড়কটির প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে বর্ণনা করলাম। আমার পূর্বে আমার স্বামী, সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত’র সময়ে ৩ বার ডিপিপি অনুমোদন হওয়া স্বত্বেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে ঠিকাদার ইচ্ছাকৃতভাবে কাজটি সময়ান্তে অসমাপ্ত রাখে। ফলে প্রকল্পের যেমন একদিকে মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, অন্যদিকে প্রতি বর্ষায় অসমাপ্ত কাজটির অনেকাংশেই ভাঙন দেয়।
তিনি বলেন, আমি আপনাদের আর্শিবাদে উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে উল্লিখিত সড়কটিই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এখনো চেষ্টা করে যাচ্ছি। সড়কটি ব্যবহার অনুপযোগী হওয়ায় সবারই ক্ষোভ ও কষ্ট আছে। তবে আমি বারবার এ সড়কটির জন্য সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ে দারস্থ হচ্ছি, যোগাযোগ করছি। কিন্তু প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক কিছু জটিলতা এবং ভুলের কারণে এ পর্যন্ত ৩ বার প্রকল্প প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয় থেকে জেলা অফিস ও বিভাগীয় অফিসে ফেরত গেছে। সম্প্রতিও প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাবনা রাখায় তা মন্ত্রণালয় নাকচ করে পুন প্রস্তাবনা দাখিল করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এতকিছুর পরেও আমি আপনাদের হয়ে সড়কটির জন্য চেষ্টা করছি ও করবো।