উজ্জ্বল মেহেদী
‘ছটফট! কান্দে রাইত, বেহুঁশ হাসন…’। মরমিবাদের গল্প। শুনে নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদও ‘বেহুঁশ’! বিটিভির জন্য ‘জলসা’ নির্মাণে সুনামগঞ্জে এলেন। হাসন রাজা সাজতে তাঁর প্রপৌত্র কবি মমিনুল মউজদীনকে আলখেল্লা পড়তে বলেন। ভোটে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে রাজি হননি মউজদীন। জলসায় আর ধারণ হয়নি গল্পের সেই চিত্র।
বছর কুড়ি আগের কথা। হুমায়ূনের জলসায় ধারণ না হলেও তার অনেক আগে এক কবিতায় ধারণ হয়েছিল রাজার বজরায় মজমার মাহাত্ম্য। রক্তে নয়, মরমিবাদে হাসন রাজার উত্তরাধিকার আমাদের একজন কবি মোহাম্মদ সাদিক ‘দিলারাম’কে প্রথমে ‘দিলারা’ নামে হাজির করেছিলেন। এরপর হয়েছে দিলারাম।
জোছনারাত। হাওরে ভেসেছে হাসন রাজার বজরা। যথারীতি নারীবেষ্টিত। বজরায় জমাট মজমা। কিন্তু তাতে মন নেই হাসন রাজার। আসনে বসে হাসন ছটফট করেন। কান্দেন। এক পর্যায়ে বেহুঁশ! কবি সাদিক কবিতায় ‘এই নিশি লাইতে নিঃশ্বাস!… রাইত যত বাড়ে, এই নৌকা, নদী কাঁপে… মাঝ রাইতে লক্ষণছিরি নীরব-নিথর… ছটফট, কান্দে রাইত বেহুঁশ হন হাসন…’।
জলজোছনার জলোপাখ্যান ‘মউজ’’ এর একটি অংশে আছে এসব। ঠিকঠাক তুলে আনতে পেরেছি কি না, পরখ করতে সাদিক ভাইয়ের কাছে জানতে চাওয়া। কবিকন্ঠে সেই কবিতা আর দিলারাম-গল্প যেন হাসন রাজার ভাবের বজরায় ভাসিয়ে দিল সকলকে। সুনামগঞ্জে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরির সেক্রেটারি-কক্ষে ঈদ পরবর্তী এক আড্ডায় কবি মোহাম্মদ সাদিক হাজির হন। বুধবার রাত ঘন্টা দেড়েক তাঁকে ঘিরে চলে কথা-কবিতা। শেষদিকে খানিক আনুষ্ঠানিকতা। জেলা প্রশাসক ও পাবলিক লাইব্রেরির সভাপতির উপস্থিতিতে সেক্রেটারি খলিল রহমান সঞ্চালন করেন ওই পর্ব।
জেলা প্রশাসক ঘরোয়া পোশাকে উপস্থিত। পাবলিক লাইব্রেরি থেকে হাঁটার দূরত্বে তাঁর বাসা। হেঁটে হেঁটে এসেছেন। মুগ্ধতা তাঁর কথায়ও। স্থানীয় সাংবাদিকদের সাংবাদিকতা থেকে প্রশাসন কী করে শুদ্ধ পথে পরিচালিত হবে, সে কথা অকপটে বলেন। শুনে প্রীত সবাই।
সুনামগঞ্জ থেকে একটি দৈনিক পত্রিকা, ডিজিটাল মাধ্যম আর জাতীয় সংবাদমাধ্যমকে এক হাতে পরিচালনার অভিজ্ঞতা পংকজ দে’র। জেলা প্রশাসকের কথাকে সাংবাদিক-বান্ধব বলে মন্তব্য তাঁর।
বান্ধব-মন্তব্যে আমার মনে পড়ে এ জেলার সাবেক এক জেলা প্রশাসক জাফর সিদ্দিকের কথা। তাঁর জনবান্ধব প্রশাসনিক তৎপরতায় টাঙ্গুয়ার হাওর নিয়ন্ত্রণের মতো অসাধ্য সাধন হয়েছিল। তখন শত প্রতিকূলতা তাঁকে অনুকূল করে রেখেছিল শুধু বান্ধব-বন্ধনে।
ঈদের লগ্নে আমার লেখার খবর জানান দিয়েছিলাম ফেসবুকে। ‘বারকি, জন বারকি’। জলজীবিকার জলোপাখ্যান। এরপর কী? এ রকম জিজ্ঞাসার জবাব হয়ে আসছে ‘মউজ’! জলজোছনার জলোপাখ্যান-‘মউজ, মজে মউজ’।
‘বারকি’ ছিল জলতল, জলতল্লাটের কাহিনি। ব্রিটিশ আমলের ইতিহাসের পথ পরিক্রমায়। আর ‘মউজ’ পুরোটা দেখার মজমা থেকে। কবিতার শহরের জলোপাখ্যান, তাই শুরু থেকে শেষ-কবিতাময়।
সুনামগঞ্জে ‘আকাশ ভাইঙ্গা জোছনা পড়ে’র উপাখ্যান। এ-ও পঁচিশ বছর বয়ে বেড়ানোর। মতবাদ জোছনাবাদ! জোছনার ইন্দ্রজালে জড়িয়ে আছেন অনেকেই। তাঁদের মধ্যে প্রয়াত জাতীয় রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, বীর মুক্তিযোদ্ধা সালেহ চৌধুরী, নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ, ‘চোখের জলে হাসি’র কবি মুহা. আবদুর রহিম. অকালপ্রয়াত দলছুট-গায়ক সঞ্জীব চৌধুরী, জলজোছনার পূজারি-সাংবাদিক পীর হাবিবুর রহমানসহ আরও অনেক। আছে আশির দশকের আয়েশে পৃথিবীর বুকে বিরল উদ্যোগ-দর্শনীর বিনিময়ে কবিতা আয়োজন-কথা।
‘হে আমার চৌতিরিশের ক্ষুব্ধ যৌবন…।’ কবি মমিনুল মউজদীনের একটি কবিতার লাইন। তাতে তাক লাগানো তারুণ্য! কবি কিশোর সুকান্তের ‘আঠারো’-গাথার মতো। অকালপ্রয়াত মউজদীনের বিদায়কালে বয়স বায়ান্ন হলেও চৌতিরেশেই মজেছিলেন তিনি। এ বিষয়টি স্মরণের মধ্যে রেখে জলজোছনার জলোপাখ্যান ১ থেকে ৩৪ পর্বে সমাপ্ত।
‘মউজ’ অর্থ ঢেউ-আনন্দ-ফূর্তি। মউজ মানুষের মনের গহিনের প্রবল এক শক্তি। মউজে মানুষে মজে থাকা ধ্যানের মতো। সবাই পারে না। যারা পারেন, তারা মজে থাকেন। ঈদের মউজে আপাতত এ টুকুর জানান দিয়ে ডুব দিচ্ছি হাওরে, জাল-জলা-জলের অধিকারসংগ্রামের আরেক জলোপাখ্যান-জলপতি, ‘ওয়াটার লর্ড’ নির্মাণযজ্ঞে।
জলের মতো সজল জীবনযাপনে মগ্ন থাকার চেষ্টা নগ্ন জলে। নগ্ন জলের মগ্নতায় জল-মানুষের সঙ্গে থাকা গৌরবের। অহর্নিশ শ্রমিক এই সব মানুষের গা জুড়িয়ে গড়িয়ে পড়া ঘামও আরেক জল। নুনতা এ জলে জিউল থাকে শ্রমের গরিমা।
এমন গৌরবের গরিমায়, মউজে মজে সকলকে ঈদের আগে ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়েছিলাম। ঈদ শেষে সেই মউজের আমেজে বলছি-আসুন, মউজে মজে সমাজবান্ধব হই। আমাদের চারপাশটা কেমন জানি বান্ধব-ছাড়া, বান্ধব-হারা! বুক আছে। কিন্তু দিল নেই! তাইতো কবি—গবেষক মোহাম্মদ সাদিকের মতো ‘বুকের ভূভাগে’ জাগে না- দিল, দিলারা, দিলারাম…।
লেখক : গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব