- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

দুরারোগ্য ক্যানসার তৈরির জন্য মুনাফামুখী ব্যবস্থাই প্রধানত দায়ী

দেশে বছরে ১ লাখ অর্থাৎ দৈনিক গড়ে ২৭৩ ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে ক্যান্সার নামক দানব ব্যাধিতে। দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিক রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে এই পরিসংখ্যান জানিয়ে আফসোস করে বলেন, ‘প্রতিদিন কতো মানুষ ক্যানসারে মারা যায় সেই হিসাব লোকজন রাখে না’। মন্ত্রীর আফসোস তাঁর সংবেদনশীল মনের লক্ষণ। কিন্তু আমরা জানি, আমাদের আশ-পাশে কত মানুষ এই জটিল প্রাণসংহারী রোগে কবলিত হয়ে প্রথমে সর্বশ্বান্ত হয় পরে অবধারিত মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ে। এটি এমন এক রোগ যা আকষ্মিক প্রাণবিয়োগ ঘটায় না। স্বজনরা সবকিছুর বিনিময়ে রোগীকে ভাল করে তোলার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করেন। সঞ্চয় ও সম্পদ চলে যায়, দেনাগ্রস্ত হতে হয় চিকিৎসা ব্যয় মিটাতে। কিন্তু পুরোপুরি নিরাময় হয় খুব কম ক্ষেত্রেই। হয়ত চিকিৎসার কারণে জীবনকাল কিছুটা বাড়িয়ে নেয়া যায়। কিন্তু এই চিকিৎসা ব্যয়ের জের ঠেলতে হয় পুরো পরিবারকে সারা জীবন। কোন কোন পরিবার আর উঠে দাঁড়াতে পারে না। মোটামুটি মধ্যবিত্ত পরিবার এই রোগের কারণে একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। আর যারা অস্বচ্ছল তারা বিনা চিকিৎসায়ই মরে। এই প্রাণঘাতী রোগের চিকিৎসার জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ খুবই কম। ফলে সাধারণ মানুষকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়ই চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়। দেশে এখন যেসব রোগে সবচাইতে বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটে ক্যান্সার তার অন্যতম। এই রোগের সুচিকিৎসার জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের ব্যাপক প্রসার কাম্য।
ক্যানসার রোগের পিছনে বর্তমান ভোগবাদী ও মুনাফামুখী সমাজের আর্থ-রাজনৈতিক ব্যবস্থাদির সংযোগ একেবারেই সরাসরি। বলা যেতে পারে, এই রোগের জন্য মুনাফামুখী অমানবিক ব্যবস্থাটিই প্রধানত দায়ী। আমরা যে ধরনের ভেজাল খাদ্য গ্রহণ করে থাকি, যে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করি, বাতাসে যে পরিমাণ বিষাক্ত উপাদান মিশে আছে; তার সবকিছুই ক্যান্সার তৈরির জন্য দায়ী। বেনিয়াবৃত্তির তীব্রতা এতোটাই বেশি যে, ব্যবসা বা উৎপাদন বাড়ানোর জন্য এখন মানুষের জীবনকে ন্যূনতম গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। এই শোষণমূলক বাজার ব্যবস্থায় আমরা প্রতিদিনই কোন না কোন রোগের অনুষঙ্গ সম্বলিত জিনিসপত্র কিনে খাচ্ছি। এতে লাভ হচ্ছে গুটিকয় মানুষের। এরা আমাদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে নিজেদের সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি করছে। আবার রোগাক্রান্ত হলে একই ধরনের বাজার ব্যবস্থা চিকিৎসার নামে অবশিষ্ট সহায়-সম্পদও কেড়ে নিচ্ছে। যে উৎপাদনের গর্ব করি আমরা তার মাধ্যমে কী পরিমাণ বিষ ছড়ানো হচ্ছে তার হিসাব রাখে কেউ? পুঁজিবাদী মুনাফা সর্বস্ব আর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে অক্ষুণœ রেখে এই রোগের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো পথ নেই। এই নির্জলা সত্য কথাটি সর্বত্র অনুক্ত থেকে যায়।
দেশের সাধারণ মানুষই দেশীয় বাজারের প্রধান ভোক্তা। এরাই প্রতিদিন কেনাকাটার সময় সরকারকে কর পরিশোধ করেন। এই করের টাকায়ই দেশ পরিচালিত হয়, উন্নয়নযজ্ঞ হয়, কিছু লুটেরা ইঁদুর থেকে হাতীতে পরিণত হয়। কিন্তু করদাতা মানুষের পিছনে কত টাকা ব্যয় করা হয়? যা করা হয় তা একদমই অনুল্লেখ্য। রাষ্ট্রকাঠামো যদি গণমুখী ও কল্যাণধর্মী হত তাহলে সকলের সুখ বিধান করাটাই রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের মুখ্য অবস্থানে থাকত। তখন ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে যেত। যতদিন পর্যন্ত না এই কল্যাণমুলক রাষ্ট্রীয় কাঠামো তৈরি করা যাবে ততদিন ক্যানসার বা এরকম মৃত্যুব্যাধির জন্য যাবতীয় দায় কেবল হায় আফসোসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
মন্ত্রী মহোদয় ওই অনুষ্ঠানে ক্যানসার তৈরির জন্য বিষাক্ত পরিবেশের কথা স্বীকার করেছেন এবং দেশব্যাপী এর চিকিৎসার ব্যাপ্তি বাড়ানোর কথাও বলেছেন। ভাল কথা। এই ভাল কথাকে কাজে পরিণত করাটাই হল আসল। দেশে এখন বহু অপ্রয়োজনীয় উন্নয়ন কর্মকা- পরিচালিত হচ্ছে। এইসব অনুৎপাদনশীল বিলাসী প্রকল্প বাস্তবায়নের চাইতেও জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে উপযুক্ত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা বেশি।

  • [১]