- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

দুর্গত এলাকা প্রশ্নে কোন বিতর্ক থাকা উচিৎ নয়

বাংলা অভিধানে দুর্গত শব্দের যেসব অর্থ দেয়া রয়েছে সেগুলো হলোÑ দুর্দশাগ্রস্ত, বিপন্ন, দরিদ্র, দুঃখী ইত্যাদি। মানুষ কখন দুর্গত হয়? নিশ্চয়ই সে যখন বিপন্ন হয়ে যায়। বিপদে পতিত হওয়ার নাম বিপন্ন হওয়া। ব্যক্তি মানুষের বাইরে যখন বৃহৎ একটি এলাকা বিপদে পতিত হয় তখন ওই এলাকাকে দুর্গত এলাকা বলাই সমীচীন। এ হলো পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর, পরিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ ভাষা বাংলায় ‘দুর্গত’ বা ‘দুর্গত এলাকা’র শাব্দিক অর্থ। একেবারে সরাসরি, কোন ধরনের দ্ব্যর্থবোধকতা ছাড়াই। সুনামগঞ্জ প্রধানত একফসলি কৃষিনির্ভর হাওর এলাকা। আট মাস জলমগ্ন বিশাল সমুদ্রাকার নি¤œভূমি যার নাম হাওর, জেগে থাকে মোটমাট চার মাস। এই চার মাসে কৃষকরা এখানে বোরো ধান উৎপাদন করেন। সুনামগঞ্জের কৃষি জমির শতকরা ৭০ ভাগের উপরে বোরো। এই জেলার অর্থনৈতিক কর্মকা-ের সবচাইতে বড় খাতের নাম হলো বোরো ধান উৎপাদন। প্রায় তিন লাখ কৃষি পরিবার বোরো ফসলের উপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল। এবারের মানবসৃষ্ট ও নজিরবিহীন প্রাকৃতিক দুর্যোগে বোরো ফসলের শতকরা ৮৫ ভাগ তলিয়ে গেছে। দানা বাধার আগেই ধানচারাগুলো অকস্মাৎ এবং এমন অবস্থায় তলিয়ে গেছে যে কৃষকরা এক মুঠ ধানের চারা গরুর খাবারের জন্যও সংগ্রহ করতে পারে নি।  এই ফসল হানির পর তিন লক্ষ কৃষি পরিবার এবং তাদের গবাদিপশুগুলো সামনের একটি বছর তীব্র খাদ্যসংকটে পড়বে। কৃষি পরিবারগুলোর কৃষি কাজের বাইরে আর তেমন কোন কাজ জানা নেই। এরকম কাজের ক্ষেত্রও জেলায় নেই। সুতরাং এমন ভয়াবহ ফসল হানির পর জেলা সুনামগঞ্জকে দুর্গত এলাকা বলতে কি কোন আইন-কানুন, বিধি-বিধানের দরকার আছে? যেকোন নিয়ম বা আইন তৈরি হয় মানুষের জন্য। এমন কোন কানুন নেই যা মানুষের প্রয়োজন ছাড়া তৈরি হয়েছে। সুতরাং সুক্ষতম বিতর্কে না গিয়ে আসুন সকলে একমত হই বিধ্বস্থ সুনামগঞ্জ জেলাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করার বিষয়ে।
দুর্গত এলাকা ঘোষণার মধ্যে কিছু অর্থপূর্ণ বিষয় রয়েছে। যখন সরকার কোন একটি এলাকাকে দুর্গত ঘোষণা করবেন তখন ওই এলাকার প্রতি বিশেষ কিছু দায়িত্ব সরকারের উপর চলে আসে। এখন যেমন আমরা বছরব্যাপী খাদ্য সহায়তা, কৃষি ঋণ আদায় স্থগিত রাখা, নতুন ঋণ বিতরণ করা, কৃষি সহায়তা দেয়া এমনসব দাবি জানাচ্ছি, দুর্গত এলাকা ঘোষণা করা হলে সরকারের দায়িত্ব হয়ে যাবে ওইসব কাজগুলো করা। আর কে না স্বীকার করবেন জেলার কৃষিজীবি পরিবারগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে দীর্ঘমেয়াদী সরকারি সহায়তার কোন বিকল্প নেই। কৃষক পরিবারগুলোর এক বছর ফসল হানির কারণে বছর শেষে তাদের মেরুদ- যতোটা ক্ষয়ে যাবে সেটুকু পরের দশ বছরওÑ যদি পরিপূর্ণ ফসল হয়, তাহলেও কাটিয়ে উঠা সম্ভব হবে না। সুনামগঞ্জের যারা জনগণের নেতা, যারা মানুষের পক্ষে কথা বলেন, তাঁরা এই বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেন বলে আমাদের জানা নেই। তারপরেও সমাজে সবসময়ই ক্ষুদ্র একটি অংশ থাকে যারা সর্বদাই বিতর্ক তৈরি করতে মুখিয়ে থাকে। এদের থেকে সাবধান থাকতে হবে সবাইকে।
বর্তমান সরকার মানবিক বৈশিষ্ট্যে পরিপূর্ণ। তৃণমূলের কিছু দুষ্ট মানুষের কারণে সরকারের এই বৈশিষ্ট্য ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে বারবার। সরকারের সতর্ক হওয়ার প্রকৃষ্ট সময় এখন। ফসলহারা দুর্গত মানুষের পাশে থেকে দুষ্টসৃষ্ট কলঙ্কচিহ্নগুলোকে আজ দূর করতে হবে। সহযোগিতা পাওয়া মানুষের অশেষ আশীর্বাদে সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। এজন্য সবার আগে দরকার ভাটি সুনামগঞ্জকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা।

  • [১]