সাইদুর রহমান আসাদ
সুনামগঞ্জের সীমান্তবর্তী উপজেলা তাহিরপুরে গেল বছরের ৫ জুলাই (সোমবার) ৬ জন করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা যায়। এই ৬ জন উপজেলার বাদাঘাট ও বড়দল উত্তর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা। সাধারণ জ্বর-সর্দি আক্রান্ত হলেও তাদের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধির কোনো বালাই ছিলো না। এমন কি মারা যাওয়ার পরেও তারা উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মাঝে কোনো সচেতনতা ছিলো না।
নিহতরা হলেন-উপজেলার বাদাঘাট উত্তর ইউনিয়নের ইউনুছপুর গ্রামের মৃত আব্দুল জব্বারের ছেলে বাদাঘাট বাজারের কাপড় ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম (৬২), একই ইউনিয়নের ননাই গ্রামের মৃত ইসমাইল মিয়ার ছেলে ব্যবসায়ী কাঞ্চন মিয়া, নাগরপুর গ্রামের মৃত হায়দর আলীর ছেলে ব্যবসায়ী তোলা মিয়া (৩২), উপজেলার বড়দল উত্তর ইউনিয়নের পৈলনপুর গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুস ছাত্তারের ছেলে বাদাঘাট বাজারের দর্জি ব্যবসায়ী জুলহাস মিয়া (২৮), একই ইউনিয়নের মাণিগাঁও গ্রামের আল আমিনের স্ত্রী জবা বেগম (২৫) ও বোরোখাড়া গ্রামের মৃত তোতা মিয়ার ছেলে নুরুল আমিন (৫২)।
গেল বছরে সুনামগঞ্জের গ্রাম পর্যায়ে করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন অনেকেই। ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময়ে গ্রামে মৃতের সংখ্যা বাড়লেও পরীক্ষা না হওয়াতে সরকারি পরিসংখ্যানে তা উঠে আসে নি। যে কারণে গ্রামের মানুষ পরিস্থিতি আঁচ করতে পারে নি তখন। গ্রামের লোকেরা বলছেন, বর্ষাকালে জ্বর, কাশি সবারই হয়। এটা তেমন কিছু নয়।
শুধু তাহিরপুরের ৬ জন নন, জেলার অন্যান্য উপজেলার গ্রামগুলোতে করোনার উপসর্গ নিয়ে এমন অনেকেই মারা গেছেন। তবে করোনায় মৃত্যু তালিকায় তাদের নাম আসে নি। শুধু যারা হাসপাতালে করোনা পজেটিভ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় যারা মারা গেছেন, সেই সংখ্যাটিই করোনায় নিহত বলে লিপিবদ্ধ হয়েছে।
সুনামগঞ্জের প্রবাসি অধ্যুষিত জগন্নাথপুর উপজেলার মীরপুর ইউনিয়নের আটঘর গ্রামে গেল বছরের জুনে করোনা উপসর্গ নিয়ে ২০ দিনের ব্যবধানে তিন জন মারা গেছেন। পরে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে গ্রামের ৫ টি বাড়ি লকডাউন করে গ্রামের ঘরে ঘরে স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়।
২০২১ সালের ৪ জুন করোনা আক্রান্ত হয়ে আটঘর গ্রামের যুবক লিতু খান (৩০) মারা যান। ২০ দিনের মধ্যে ২৩ জুন (বুধবার) রাতে করোনা উপসর্গ নিয়ে তার মা হায়ারুনেছা (৬৫) মারা যান। এর আগে ২২ জুন (মঙ্গলবার) করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যান একই গ্রামের নুর উদ্দিন (৬৫)।
গ্রামে উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিরা কেউ করোনা পরীক্ষা করাতে চায় নি। তবে যারা মারা গেছেন তাদের আগ্রহের ঘাটতি ছিলো তা নয়। গ্রামের মানুষের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ছাড়া নমুনা পরীক্ষা করার কোনো জায়গা ছিলো না। আর গ্রাম থেকে উপজেলা সদরে আসতে অনেকটা দুভোর্গ শিকার হতে হয়। অনুন্নত সড়ক ব্যবস্থা, বর্ষায় গ্রামের সঙ্গে উপজেলা সদরের সড়ক পথ না থাকা ও দারিদ্রতার কারণে জ¦র—সর্দিতে আক্রান্ত হয়ে উপজেলা সদরে এসে পরীক্ষা করাতে আসেনি নিম্ন আয়ের মানুষ। যে কারণে অনেকেই ঘরে বসে স্থানীয় ফামের্সী থেকে ওষুধ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। যাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো তারা কিছুদিন পর সুস্থ হয়ে উঠছেন। এভাবেই গ্রামে গ্রামে করোনার সঙ্গে লড়াই হয়েছে হাওরাঞ্চলের মানুষের।
দুর্গম উপজেলা মধ্যনগরের চামরদানি ইউনিয়নের নন্দীপাড়া গ্রামের বাসিন্দা টিটু সরকার বললেন, শুরুর দিকে আমাদের গ্রামের মানুষ করোনা ভাইরাস বিশ^াস করে নি। তারা মনে করে জ¦র— সর্দি ও শ^াসকষ্ট স্বাভাবিক ব্যাপার। জ¦র—সর্দি হলে শ^াসকষ্ট হবে, এটাই স্বাভাবিক। গ্রামের মানুষদের সচেতন করতে প্রশাসনের যেরকম তৎপরতা দরকার ছিলো সেরকম আমরা দেখিনি। শুধু শহর কেন্দ্রীক প্রচারণা হয়েছে সেগুলো আমরা ফেসবুকে দেখেছি। গ্রামে গ্রামে করোনার বিষয়ে যদি প্রচারণ করা হতো তাহলে মানুষ কিছুটা হলেও সচেতন হতো।
জগন্নাথপুরের মীরপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য খলিল মিয়া জানান, আটঘর গ্রামে করোনার উপসর্গ নিয়ে ২০ দিনের ব্যবধানে এক পরিবারের মা—ছেলে ও একই গ্রামের নুর উদ্দিন নামের এক প্রবাসির মৃত্যু হয়। এদের মধ্যে লিতু খান (৩০) সিলেটে একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যায় প্রথমে। তার পরিবার লিতু খানের মৃত্যুর কারণ ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করে। তার মৃত্যুর একদিন পর আমরা জানতে পারি সে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। পরে আমরা তাদের বাড়িতে লকডাউন করি। কয়েকদিন পরেই তার মা করোনা উপসর্গ নিয়ে সিলেটের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। আরেক প্রবাসি তার পরিবার নিয়ে দেশে এসেছিলেন। গ্রামের বাড়িতে হঠাৎ অসুস্থ্য হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় হাসপাতালে করোনার নমুনা দিয়ে আসেন। পরদিন রিপোর্ট পজেটিভ আসায় দ্রুত সিলেট যাওয়ার পথে তিনিও মারা যান।
তিনি আরও বলেন, করোনা মহামারি প্রকট আকারে গ্রামে ধাক্কা দেয়ার আগে আমাদেরকে প্রশাসন সম্পৃক্ত করেন নি। ফলে মানুষকে সচেতন করতে অনেক সময় লেগেছে আমাদের। গ্রামের লোকেরা তখন বলতো, ‘বর্ষাকালে জ্বর, কাশি সবারই হয়। এটা তেমন কিছু নয়। বেশিরভাগ মানুষের তখন জ¦র সর্দি হয়ে ভালো হয়ে গেছে। যারা অসুস্থ্য হয়েছে তাদের মধ্যেও কোনো সচেতনতা ছিলো না। একারণেই গেল বছরের মাঝামাঝি সময়ে ঘরে ঘরে জ¦র—শর্দিতে আক্রান্ত ছিলো মানুষ। তারা কোভিড পরীক্ষা করাতে চাইতো না। এই অবস্থাতেও আমরা যতটুকু পেরেছি মানুষকে সচেতন করেছি।
চলতি মাসের ১৭ তারিখ পর্যন্ত জেলা সিভিল সার্জন অফিস থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, করোনার শুরু থেকে এ পর্যন্ত সীমান্ত জেলা সুনামগঞ্জে করোনায় পজেটিভ হয়েছেন ৭ হাজার ৫৩ জন। আরোগ্য লাভ করেছেন ৬ হাজার ৭৪৯ জন। আর মারা গেছেন ৭৫ জন। মোট পজেটিভ রয়েছেন ২২৯ জন।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ২৯ লক্ষ ১৬ হাজার ৩২৭ জন মানুষ রয়েছে। এদের মধ্যে প্রথম ডোজ টিকা নিয়েছেন ১৮ লক্ষ ৪৩ হাজার ৫৯৮ জন, দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন ১২ লক্ষ ৩২ হাজার ৮০১ ও তৃতীয় ডোজ নিয়েছেন ৩৩ হাজার ২৬৯ জন মানুষ।
সুনামগঞ্জ জেলার সিভিল সার্জন ডা. আহম্মদ হোসেন বলেন, মানুষ মাস্ক পড়তে চায় না। শুরু থেকেই এই উদাসীনতা ছিলো। গ্রামের দিকে মাস্ক না পড়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। মানুষের মধ্যে উদাসীনতা রয়েছে। মানুষের জীব বৈশিষ্ট্য এরকমই। সচরাচর মানুষ যা দেখে আসছে এর বাইরে কিছু হলে বুঝাতে হবে। মানুষকে বুঝাতে সরকার সফল হয়েছে। কিছু মানুষ উদাসীনতা দেখা গেলেও বেশির ভাগ মানুষ স্বাস্থ্য সচেতন ছিলো। একারণেই সরকার যখন যা বলেছে তা মেনেছে।
উন্নত বিশে^র দেশগুলো থেকে দেশে করোনায় মৃত্যুও হার অনেক কম। মৃত্যুর হার কম হওয়ার পেছনের কারণ হলো মানুষ সরকারের নির্দেশনা মেনেছে। সরকারের সব বিভাগেই কাজ করেছে কোভিড মোকাবেলায়। জনগণও সরকারের কথা মেনেছে। যার কারণে এখানে অনেক কম মৃত্যু হার ছিলো।
সিভিল সার্জন বলেন, একটা সময়ে সিজনাল জ¦র মানুষের হয়। তখন প্রায় সবারই জ¦র শর্দিতে আক্রান্ত হয়। কোভিড চলাকালীন সময়েও হয়েছে। কোভিডের লক্ষণ ও সিজনাল জ¦রের লক্ষণ একই। পরীক্ষা না করলে কোভিড হয়েছে কিনা বলা যায় না। যোগাযোগ ব্যবস্থা সুনামগঞ্জ অন্য এলাকা থেকে ভিন্ন। এখানে বছরের ছয় মাস পানি ও বাকী ছয় মাস শুষ্কু থাকে। এজন্য কেউ মারাত্মক অসুস্থ্য না হলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পর্যন্ত আসতে চায় না। শুষ্কু মৌসুমে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। বর্ষায় নৌকা দিয়ে সহজে আসতে পারে। যারা সাধারণ জ¦র শর্দিতে মারা গেছেন তাদের তালিকা আমাদের কাছে নেই।
সিভিল সার্জন বলেন, করোনার তৃতীয় ঢেউ অমিক্রনের আগেই আমাদের বেশিরভাগ নাগরিক টিকার আওতায় চলে এসেছে। যার ফলে জ¦র শর্দি কারও যদি হয়েও থাকে মৃত্যু খুব একটা হয়নি। করোনার তৃতীয় ঢেউয়ে সুনামগঞ্জের কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায় নি। অন্য সময়েও সুনামগঞ্জে মৃত্যুও হার অন্যান্য জেলা থেকে অনেক কম। কিছু দিন আগে সারাদেশে এককোটি মানুষকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনা হয়েছে। আমাদের জেলায় যে লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছিলো তারচেয়ে বেশি মানুষকে টিকার আওতায় আনতে পেরেছি আমরা।
সুনামগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি অ্যাড. আইনুল ইসলাম বাবলু বললেন, উপসর্গ দেখা দিলেও গ্রামের মানুষ করোনা পরীক্ষা করাতে চান না। স্বাস্থ্যবিধি মানতে চান না। এর প্রধান কারণ হলো সচেতনতার অভাব। তবে এখন মানুষ টিকা নিতে আগ্রহী হয়েছে। কিছুটা হলেও বুঝতে পেরেছে ভ্যাকসিন নেয়া প্রয়োজন।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, অন্যান্য জেলা থেকে সুনামগঞ্জে করোনায় মৃত্যুও হার কম। এখনও নতুন করে সনাক্ত রোগী নেই বললেই চলে। তবে করোনার ধরণ পাল্টিয়ে আবার আসতে পারে। তাই আমাদেরকে সচেতন থাকতে হবে। সরকারি বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে।