স্বামী হৃদয়ানন্দজী মহারাজ (লালন)
পদ্মফুল প্রস্ফুটিত হবার অপেক্ষায় অপেক্ষমাণ, শুধু দরকার প্রভাতের আলো, জ্ঞানের আলো কিন্তু বর্তমান সমাজে আমাদের হৃদয়ের জ্ঞান পদ্ম কি আসলেই প্রস্ফুটিত হচ্ছে? আদর্শ চরিত্র বা আদর্শ মানুষ না হলে সমাজের অবক্ষয় ঠেকানো সহজ হবে না। স্বামীজী বলেছিলেন “মানুষ চাই, মানুষ চাই, আর সব হইয়া যাইবে,” মূল্যবোধ সহকারে শিক্ষিত, বীর্যবান, তেজস্বী, আদর্শ মানুষই পারে আজকের সমাজের পথ প্রদর্শক হতে। মহাপুরুষদের বাণী রূপ রতœই পারে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে অধঃপতনের হাত থেকে রক্ষা করতে। স্বার্থপরতা আর সংকীর্ণতাকে আশ্রয় করে মানুষ যেন মৃত্যুকেই বরণ করছে। কাম, ক্রোধ, লোভ যেন অধিক মনুষত্বের পথে বিরাট বাধা স্বরূপ। দিনে দিনে মানুষ মূল্যবোধহীন হয়ে পড়ছে। কোন ব্যক্তির মনোভাব, দৃষ্টিভঙ্গিগত আচরণ মূল্যবোধ দ্বারা প্রভাবিত। মূল্যবোধহীন মানুষ প্রকৃতপক্ষেই মনুষ্যত্বহীন মানুষ। মূল্যবোধহীন পরিবার সমাজের জন্য ক্ষতিকর। শ্রদ্ধা, ভক্তি, বিশ্বাস যেন মানুষের মধ্যে থেকে উঠে যাচ্ছে, সব হয়ে পড়েছে এখন মুখোশের মতো, ভক্তি ভাবটা যেন গায়ে পড়ে আদায় করতে হয়। সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য আজ আমাদের সমাজের মানুষের কাছে সুদুর পরাহত। ভক্তিভাব আর পারিবারিক মূল্যবোধের কারণে আজ আমাদের চরিত্র ও হয়ে পড়েছে জর্জরিত। এখন আমরা নিজেদের বিবেক কে বিসর্জন দিয়ে যা ইচ্ছে তাই করছি। আর বিজ্ঞানের কল্যাণে মানুষ অতিদ্রুত যন্ত্রবৎ হয়ে পড়ছে, শিখছে তার অপব্যবহার, তাই যদি না হতো আমাদের মানষিক আসাধূতা আমাদের কিভাবে গ্রাস করে ফেলছে? এভাবে চলতে থাকলে আমাদের মনুষ্যত্ব ধ্বংস হতে বেশিদিন লাগবে না। আমাদের মহাপুরুষদের কিংবা সন্ন্যাসি বা পুরোহিত, বিদুষী মানুষের থেকে সমাজের সাধারণ জনসাধারণকে তাদের উচ্চ আদর্শের পথের সন্ধান পাওয়া উচিত।
সনাতনী মূল্যবোধের অভাবে আজকে আমাদের সন্তানদের মধ্যে সততার অভাব, নিষ্ঠার অভাব, নিঃস্বার্থভাবে কাজ করার অভাব, সত্যকে গোপন করা, অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া, মিথ্যাচার, ভন্ডামি, সঙ্কীর্ণ মনোবৃত্তি, কেবলমাত্র নিজের স্বার্থ আর আখের গোছানোর কাজে যেন তারা ব্যস্ত। এই সবকিছু থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য আমাদের পারিবারিক ভাবে সনাতনী মনোভাবকে আরো দৃঢ় করতে হবে, মনকে সুন্দর, সুশৃঙ্খল, সত্যাদৃষ্ট করে গড়ে তুলতে হবে। আজকের শিশুদের আচার আচরণ, শৃঙ্খলাবোধ, পরিচ্ছন্নতা, সময়ানুবর্তিতা, দায়িত্বশীলতা, কর্তব্যপরায়ণতা ইত্যাদি সদ্গুনগুলোর বিকাশ পরিবার থেকেই হওয়া উচিত। যেই শিশু এসব সুশিক্ষায় শিক্ষিত হবে সে কিন্তু বড় হয়ে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে সমাজে চিহ্নিত হবে এবং তার ছোটবেলার এই শিক্ষার আলোর মাধ্যমে সে অন্য মানুষকেও আলোকিত করে তুলতে সক্ষম হবে। এভাবেই একটি প্রদীপ থেকে
হাজারো প্রদীপ জ্বলে উঠবে। তাই আমাদের উচিত পারিবারিক ভাবেই সচেতন হওয়া। আজকাল এক অপরকে সামান্য “নমস্কার” অভিবাদন জানাতে লজ্জাবোধ করি। কোথায় গিয়ে ঠেকেছে আমাদের সমাজ এবং আমরা। আমরা কি পারি না সমাজের এই নোংরামি বন্ধ করে সুন্দর, সুষ্ঠ সমাজ উপহার দিতে। পূজার মূল সনাতনী ভাবকে সবার মধ্যে আবার ফিরিয়ে আনতে?
সুন্দর সংস্কৃতি থেকে আমরা কতটাই না দূরে চলে এসেচি। টিভিতে উৎশৃঙ্খল সিরিয়াল দেখে দেখে, ঘরের মা, বোন, কন্যারা আজকে কি শিখছে। এইসবের প্রভাবের কারণে কত সংসার যে ভেঙ্গে যাচ্ছে, কত মা যে আজ ঘরছারা। তাই বলতে হবে পুঁথিগত বিদ্যায় শিক্ষিত না হয়ে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে। ছেলেমেয়েদের সাথে, শ্রেষ্ঠ মনীষীদের জীবন সম্পর্কে চর্চা করতে হবে, জাগাতে হবে তাদের চরিত্রের পজিটিভ দিকগুলোকে, রাজা রামমোহন, বিদ্যাসাগর, শ্রীরামকৃষ্ণ, শ্রীমা সারদাদেবী, স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ আরো অন্যান্য মনীষীদের নিয়ে আলোচনা করলে তাদের দেখানো পথ অনুসরণ করলে হয়তো আমরা সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে আমাদের নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবো।
বৈদিক দেবতাদের মধ্যে আমরা যে কজন স্ত্রীদেবতার সাক্ষাৎ পাই। তার মধ্যে ঊষা, পৃথিবী, সরস্বতী, এছাড়া রাত্রি, অরণ্যানী, আপোদেবতা, লক্ষ্মী আরো কয়েক জন দেবীর নাম শুনি। পুরুষ দেবতার স্ত্রীরূপে কয়েকজন স্ত্রীদেবতার নাম পাওয়া যায় যেমন, ইন্দ্রপতœী- ইন্দ্রানী, রুদ্রপত্মী- রুদ্রানী, অগ্নিদেবতা স্ত্রী অগ্নায়ী ইত্যাদি। বহু পুরুষ দেবতার নামও আমরা জানি। যাস্কের নিরুক্তগ্রন্থে দেবতা বিষয়ে বলা হচ্ছে বেদের বহু দেবতা প্রকৃতপক্ষে একই সর্বশক্তিমান পরমাত্মার বিভিন্ন প্রকাশ বা অভিব্যক্তি মাত্র-‘দেবতায় এক আত্মা বহুধা স্তূয়তে’ ( নি:৭/৪)। আরো বলা হচ্ছে সকল দেবগন একই আত্মার ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ স্বরূপ -‘একম্যাত্মনোহন্যে দেবী: প্রত্যঙ্গাঁনি ভবন্তি’। আবার ‘একং সন্তং বহুধ্য কল্পয়ন্তি’- সেই এক শাশ্বত সত্তাকে ঋষিগণ বহুভাবে ধারণা করেন। সেই শাশ্বত সত্তাকেই আমরা দুর্গা, কালী, মহামায়া বলি।
বৈদিক যুগের ঋষিকন্যা ব্রহ্মবিদূষী বাক্ এই মহাশক্তিকে ভিতরে বাইরে উপলব্ধি পূর্বক আপনাকে এই মহাশক্তি হতে অভিন্ন অনুভব করে বলেছিলেন জীব সমূহ যে অন্নাদি আহার করে, দর্শন শ্রবনাদি ব্যাপার সম্পাদন করে, শ্বাস প্রশ্বাসাদি দ্বারা প্রাণ ধারণ করে, এ সমস্তই আমার দ্বারাই সম্পন্ন হয়। আমি ছাড়া বস্তুত কিছুই নাই। নানা দেবতার পুঞ্জিভূত তেজশক্তি নির্গত হয়ে, মহামায়ার সৃষ্টি হল। এখানে বিভিন্ন দেবতাগন ও সেই এক সত্তার থেকেই সৃষ্টি। যুগ যুগ ধরেই মানুষ এই শক্তির আরাধনায় ব্যস্ত। সাধনার দ্বারা মানুষ বিশ্বরূপিনী এই মহাসত্তার সহিত নিজের একত্ব উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। আর এই একত্ব উপলব্ধিতেই মানুষের সাধনার পরিসমাপ্তি,আত্মবিকাশের পরিপূর্ণতা। যুগে যুগে রামপ্রসাদ, কমলাকান্ত, বামাক্ষ্যাপা ও শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস তারই প্রমাণ রেখে গেছেন। আমরা এবার দুর্গোৎসব প্রসঙ্গেঁ ফিরে আসি।
স্বামীজী বুঝতে পেরেছিলেন সেই শাশ্বত মাতৃশক্তির আরাধনাই পারে আমাদের বর্তমান ক্রান্তিকাল কে পরিবর্তন করতে। শ্রীশ্রী মাতৃদর্শনে ব্রহ্মানন্দজী গেলে শ্রীশ্রীমা সারদা দেবী তাঁর জনৈকা সেবিকাকে দিয়ে বলে পাঠালেন রাখালকে গিয়ে জিজ্ঞাস করো -“মা জানতে চাইছেন অধ্যাত্ম পিপাসু সাধকের পক্ষে কেন মহামায়ার পূজা সর্বাগ্রে করা উচিৎ।” পূজনীয় রাখাল মহারাজ তার উত্তরে বললেন মহামায়ার হাতেই ব্রহ্মজ্ঞানের চাবিকাঠি। তিনি দ্বার খুলে না দিলে কোন সাধকের পক্ষেই ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করা সম্ভব নয়। মাতৃশক্তিকে কিভাবে সম্মান করতে হয় তা আমরা স্বামীজির একটি চিঠি থেকে জানতে পারি। শ্রীশ্রী সারদা মা সম্বন্ধে স্বামীজির নিজের ধারণা খুব আবেগ ভরে প্রকাশ করেছিলেন এভাবে-“মা ঠাকুরুণ কি বস্তু বুঝতে পারনি, এখন কেহই পারনা, ক্রমে পারবে। ভায়া, শক্তি বিনা জগতের উদ্ধার হবেনা। আমাদের দেশ সকলের অধম কেন, শক্তি হীন কেন? শক্তির অবমাননা সেখানে বলে। মা-ঠাকুরাণী এদেশে পুনরায় সেই মহাশক্তি জাগাতে এসেছেন, তাকে অবলম্বন করে আবার সব গার্গী, মৈত্রেয়ী জগতে জন্মাবে। দেখছ কি ভায়া, ক্রমে সব বুঝবে। এজন্য তাঁর মঠ প্রথমে চাই। … আমেরিকা ইউরোপে কি দেখছি? শক্তির পূজা, শক্তির পূজা। তবু এরা অজান্তে পূজা করে, কামের দ্বারা করে। আর যারা বিশুদ্ধ ভাবে, সাত্ত্বিকভাবে, মাতৃভাবে পূজা করবে, তাদের কি কল্যাণ না হবে! আমার চোখ খুলে যাচ্ছে। দিন দিন সব বুঝতে পারছি। সেজন্য আগে মায়ের মঠ করতে হবে। আগে মা আর মায়ের মেয়েরা, তারপর বাবা আর বাপের ছেলেরা, এই কথা বুঝতে পারকি?… এই দারুণ শীতে গায়ে গায়ে লেকচার করে লড়াই করে টাকার যোগাড় করছি মায়ের মঠ হবে।”
তাই আমাদের এখন একমাত্র দরকার আদর্শ চরিত্র, আমাদের ভাবতে হবে চরিত্র গঠনে আমরা কাকে আদর্শ করব। প্রয়োজন এখন ব্যক্তি থেকে পারিবারিক আদর্শ, সামাজিক আদর্শ, সাংগঠনিক আদর্শ। সূতরাং, ব্যাক্তি চরিত্রই পর্যায়ক্রমে পারিবারিক, সামাজিক তথা সাংগঠনিক আদর্শের মূল ভিত্তি তৈরী করবে, একটা নতুন প্রজন্মের জন্ম হবে। প্রশ্ন আসতে পারে আমরা কাকে আদর্শ করব-স্বার্থশূন্য, নিবেদিত যিনি বা যারা জাগতিক সকল বৈপরীত্যকে সেবা, অহিংসা ও ঐক্যের বাঁধনে আবদ্ধ করতে পারে। তাহলে সে আদর্শ আমরা কোথায় পাবো।
আমরা যদি স্বামীজীর জীবনী উপলব্ধি করি তা হলে দেখতে পাই স্বামীজি তৎকালীন সময়ে শিক্ষিত পরিবারের সন্তান। তিনি নিজেও ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত, ্আধুনিক চিন্তাসম্পন্ন, যুক্তিবাদী, দার্শনিক ও কুসংস্কার মুক্ত ব্যক্তিত্বের অধিকারী। সহজে কোন বিষয় তিনি মেনে নিতেন না। একবার হলো কি-সমাধির উচ্চতর অবস্থায় থাকতে থাকতে ঠাকুর কোন ধাতব বস্তু ছুতে বা তার স্পর্শ সহ্য করতে পারতেন না। ছুলেই মনে হতো, এই বুঝি শরীরে শিং মাগুরে কাঁটা দিচ্ছে। এমনি ভাবাবস্থায় ঠাকুর একদিন বিশ্রামের জন্য তাঁর খাটিয়ায় শুতে যাবেন অমনি তাঁর মনে হলো যেন গা জ্বলে যাচ্ছে। কি হলো- এই ভেবে যখন খাটিয়ার কাপড় তুলেছেন. দেখছেন একটি ধাতব মুদ্রা সঙ্গে সঙ্গে মুচকি হাসি এবং বুঝেই নিয়েছেন এটি কার কাজ হতে পারে। দরজার দিকে তাকিয়েছেন, দেখছেন-স্বামীজী আড়াল থেকে দেখার চেষ্টা করছেন। ঠাকুর হেসে বললেন-ঠিক আছে যাচাই করেই তো নিবি, তা নাহলে মানবি কেন? এমনকি মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্তেও ঠাকুরের নিজ মুখেই শুনতে চেয়েছেন যে, ঠাকুর সত্যি সত্যিই অবতার রূপে এসেছেন।
এহেন স্বামীজিকে এক বিদেশিনী বিয়ের প্রস্তাব দিলে স্বামীজি পাল্টা প্রশ্ন করেন, আপনি আমাকে বিয়ে করতে চান কেন? উত্তরে বিদেশিনী বলেছিল আমি আপনার মত সৌম্য দর্শনধারী পুত্র চাই। তার প্রতিউত্তরে স্বামীজী বলেছিলেন, তাহলে আজ থেকে আপনি আমাকে পুত্র বলে স্বীকার করুন, আমি আপনাকে মা বলেই ডাকব। আবার এই স্বামীজী শ্রীশ্রী মাকে ‘জ্যান্ত দুর্গা’ নামে আখ্যায়িত করেছেন। বলছেন “বাবুরামের মা’র বুড়ো বয়সে বুদ্ধির হানি হয়েছে। জ্যান্ত দুর্গা ছেড়ে মাটির দুর্গা পূজা করতে বসেছে। দাদা, বিশ্বাস বড় ধন, দাদা, জ্যান্ত দুর্গার পূজা দেখাবো, তবেই আমার নাম।
আবার এও শুনা যায়, স্বামীজী যখন বেলুড় মঠে দুর্গা পূজার চিন্তা করেছিলেন সেই সময় তার জনৈক সন্যœাসী ভ্রাতার অলৌকিক স্বপ্ন দর্শনও হয়েছিল। তিনি দেখেন যে, সাক্ষাত মা দশভূজা দক্ষিণেশ্বরের দিক থেকে গঙ্গার উপর দিয়ে বেলুড় মঠের দিকে আসছেন। গুরু ভ্রাতার মুখে এই স্বপ্ন বৃত্তান্ত শুনে স্বামীজী আরো উৎসাহিত হয়ে উঠেছিলেন। এর পর বেলুড় মঠের সেই প্রথম শারদীয়া দুর্গা পূজা মহা সমারোহেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ষষ্ঠীর দিন থেকে বেলুড় মঠে আনন্দ আর ধরেনা। বোধনের আগের দিন থেকেই স্বামীজীর ‘জ্যান্ত দুর্গা’ শ্রীশ্রীমা বেলুড় মঠের পাশেই একটি ভাড়াটে বাড়িতে এসে বাস করছিলেন। শ্রীশ্রীমা’র নামে পূজার সংকল্প করা হইয়াছিল। তাঁহার অনভিপ্রেত বলিয়া পূজায় পশু বলিদান হয় নাই। ভক্তেরা দেখিতেছেন-একদিকে দশপ্রহরণধারিনী সিংহবাহিনী অসুরদলনী দশভূজা-দক্ষিণে সর্বৈশ্বর্যদায়িনী লক্ষ্মী ও সিদ্ধিদাতা গণেশ-বামে পরাবিদ্যাস্বরূপিনী জ্ঞানদাত্রী কমলদলবাসিনী সরস্বতী ও দেব সেনাপতি কার্তিকেয়-মৃন্ময়ী মূর্তিতে চিন্ময়ী দেবীর আবির্ভাব, অপরদিকে স্বয়ং মহাশক্তি মানবীদেহে শ্রীশ্রীজগজ্জনী মার্তৃরূপে অবতীর্ণা-উপাস্য ও উপাসিকভাবে পূজামন্ডপে বিদ্যমানা। এই অপূর্ব ছবি দেখিয়া আনন্দরসে ভক্তদের হৃদয় পরিপ্লুত হইতেছিল।
বেলুড় মঠের দুর্গা পূজার একটি বিশেষ দিক হলো কুমারীপূজা, যা প্রথমাবধি অনুষ্ঠিত হযে আসছে। স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দও একাধিক কুমারীকে পূজা করেছিলেন। একটি জলজ্যান্ত কুমারীকে সাক্ষাত মা দুর্গা জ্ঞানে পূজা করে সকলের মধ্যে মার্তৃভাবের সঞ্চার করা হয়। কুমারীর মধ্যে দৈবীভাবের প্রকাশ দেখা বা তাকে জননী রূপে পূজা করা শুদ্ধসত্ত্বভাবেরই এক স্বার্থক প্রকাশ। অন্য অর্থে, বেলুড় মঠের দুর্গা পূজা তত্ত্বত ‘জ্যান্ত দুর্গা’রই পুজা।
পরিশেষে বলা যায় আজ চতুর্দিকে যে শুদ্ধ মানসিকতার ক্ষয়ের বিভীষিকা চলছে এই ক্ষয়কে জয় করতে হলে জগজ্জননী’র নামে তাঁহার সকল সন্তানকে এক হইতে হবে। মায়ের নামে সংকল্প গ্রহণ করিতে হইবে। বহু মত. বহু নীতির ব্যবধান দূর করিয়া সুনিয়ন্ত্রিত সংঘবদ্ধতায় সকলকে এক প্রাণ হইয়া কল্যাণের পথ অনুসরণ করিতে হইবে। আমাদের হইতে হইবে বীর্যবান, শ্রদ্ধাবান, চরিত্রবান তবেই মায়ের যোগ্য সন্তান বলিয়া যোগ্যতা অর্জন করিব। এই আদর্শই আমরা পাই স্বামী বিবেকানন্দ, শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, শ্রীসারদাদেবী’র জীবন থেকে।
লেখক: আশ্রম প্রধান, সুনামগঞ্জ শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রম।