হাওর দুর্নীতির অন্যতম মূল হোতা পাউবো, সুনামগঞ্জ জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী আফসার উদ্দিনকে বৃহস্পতিবার আদালতের নির্দেশক্রমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। এই সংবাদটি সংবাদপত্রে গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হয়েছে। দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে সংবাদের সাথে একটি ছবি ছাপা হয়েছে যেখানে আফসার উদ্দিনকে রুমাল দিয়ে মুখ ঢাকা অবস্থায় পুলিশ নিয়ে যাচ্ছে বলে দেখা যাচ্ছে। আফসার উদ্দিন রুমাল দিয়ে আসলে নিজের চেহারা ্আড়াল করার চেষ্টা করছেন। এই মুখ ঢাকার বিষয়টি আমাদের কাছে এক প্রতীকি ব্যঞ্জনায় ধরা পড়েছে। নির্বাহী প্রকৌশলী এমন এক জায়গায় অধিষ্টিত ছিলেন যেখানে থেকে তিনি স্বপ্নেও সম্ভবত কল্পনা করেন নি তার এই ধরনের পতন ঘটবে। তার দাপ্তরিক সংস্কৃতি তাকে এমন বেপরোয়া অবস্থায় নিয়ে গিয়েছিল যেখানে লুণ্ঠনকর্মে নিয়োজিত থেকেও তিনি নিজেকে যাবতীয় আইন-আদালতের উর্দ্ধে ভাবতে পছন্দ করতেন। কিন্তু কখনও কখনও বাস্তবতা নিজস্ব কল্পনার সমস্ত বৃত্ত ভেঙ্গে কাউকে কাউকে এমন নীচে নামিয়ে আনে যেখানে লজ্জায় মুখ ঢাকা ছাড়া আর কোন গত্যন্তর থাকে না। মহাপ্রতাপশালী এই নির্বাহী প্রকৌশলীর হয়েছে সেই অবস্থা যখন তিনি সকলের কাছ তেকে নিজেকে আড়াল রাখতে চান। গত ২ জুলাই দুদকের দায়ের করা মামলায় হাওর দুর্নীতির সাথে জড়িত ৬১ আসামীর মধ্যে আফসার উদ্দিনসহ দুই জন দুদকের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন। এই কয়দিন অন্তরালে আটক থাকাকালে একান্ত নির্জনে তিনি নিশ্চয়ই নিজে নিজের সাথে কিছু বুঝাপড়া করেছেন। এমনও হতে পারে তিনি এখন বুঝতে পারছেন একটি জেলার দুই লাখ কৃষকের সারা বছরের মুখের আহার ও বেঁচে থাকার অবলম্বন বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ার পিছনে অন্যতম অনুঘটক হিসেবে যা করেছেন তা ছিল বিশাল অন্যায়। এই আত্মপোলব্ধিজাত অপরাধবোধের কারণেও হতে পারে তার এই রুমালে মুখ ঢাকা অবস্থার নেপথ্য কারণ। তিনি লোকসমাজ থেকে নিজের মুখ লুকিয়ে আসলে এটিই প্রমাণ করতে চাইছেন, এ ধরনের কাজে নিয়োজিতরা সমাজে মুখ দেখানোর উপযুক্ত নয়। সুনামগঞ্জে একটি সফল দুর্নীতিবিরোধী সার্বজনীন প্রয়াস ও আইনের যথযথ প্রয়োগের মধ্য দিয়ে হাওর দুর্নীতিবাজদের যে এভাবে মুখ ঢাকতে বাধ্য করা গেল, এটি সকলের জন্য শিক্ষণীয়।
কিন্তু আদৌ কেউ কি কিছু শিক্ষা নেয়? আমাদের চোখের সামনের বাস্তবতা বলে, না, কেউ বিশেষ করে দুর্নীতির মহা¯্রােতে যারা গা ভাসিয়েছেন, তারা এখন পর্যন্ত এ থেকে তেমন কিছু শিক্ষা গ্রহণ করেন নি। কারণ সমাজে-প্রশাসনে-রাজনীতিতে-অর্থনীতিতে দুর্নীতিপ্রবণতা হ্রাস পাওয়ার কোন সুখকর লক্ষণ এখন পর্যন্ত অনুপস্থিত। তারপরেও সাধারণ মানুষ খুশি আইনের এই সুপ্রয়োগ দেখে। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, একটি সেক্টরের দুর্নীতি যখন বিচারিক ব্যবস্থার আওতায় আসা সম্ভব হয়েছে, তখন নিশ্চয়ই অপরাপর সেক্টরের দুর্নীতিপ্রবণতাগুলোও কোন এক সময়ে অনুরূপ বিচারের সন্মুখীন হবে। এ থেকে আরও শিক্ষণীয় যে, সকলে মিলে প্রতিবাদ করলে বিচার ব্যবস্থা যে সক্রিয় হয়, এটি প্রমাণিত হয়েছে।
আফসার উদ্দিন বা অভিযুক্ত অন্যরা এখনও আদালত কর্তৃক দোষী সাব্যস্থ হন নি। সেই পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছতে আরও দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, জটিল আইনি মারপ্যাঁচে আটকে গিয়ে সুবিচার মাঝপথে মুখ থুবড়ে পড়ে। এইক্ষেত্রে এমনটি হবে না তেমন ভবিষ্যৎবাণী করা দুরূহ বটে। একটা সময়ে অপরাধী বলে অভিযুক্ত এই ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমষ্টি লজ্জার সকল অন্তরাল দূরে ছুঁড়ে দিয়ে আবারও স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হবে না, এরকম করেও চিন্তা করা যায় না। তবে মানুষ জাগ্রত থাকলে, শুভশক্তির সম্মিলিত উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে শেষ পর্যন্ত অন্যায়ই পরাজিত হয়।