বলিহারি সাহস এদের। সরকার যখন দুর্নীতি বিরোধী অভিযানকে শক্ত করছে, যখন দুদকের ফাঁদজালে আটকা পড়ছে দুর্নীতিবাজরা, যখন সরকার দলীয়দের ছাড় দেয়া হচ্ছে না এক রত্তি; ঠিক এরকম সময়েও এরকম কা- ঘটতে পারে ভাবতে আশ্চর্য লাগে। ধন্য সাহস বটে এদের। গত দুই দিন দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে স্থানীয় পর্যায়ের দুইটি দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হয়েছে। একটিতে দোয়ারাবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভবন নির্মাণে নি¤œমানের ইট ব্যবহারের খবর, অন্যটিতে শাল্লা উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ১২ হাজার টাকা মূল্যমানের বায়োমেট্টিক হাজিরা মেশিন ২৬ হাজার টাকায় সরবরাহ করার বিষয়ে। দোয়ারাবাজার উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভবন নির্মাণের জন্য ঠিকাদার ২৩ হাজার নি¤œমানের ইট আনেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অথবা তদারকি প্রতিষ্ঠান ইটের নি¤œমানের বিষয়টি ধরেননি। স্থানীয়রা ধরেছেন। তারা এই ইট ব্যবহার করতে ঠিকাদারকে নিষেধ করেন। ঠিকাদার এই ইট সরিয়ে নেন। পরে গত রবিবার ঠিকাদার আবারও নি¤œমানের ইট নিয়ে এসে কাজ শুরু করতে চান। তখনও প্রতিবাদী হয়ে উঠেন স্থানীয় জনতা। একজন মুক্তিযোদ্ধার সাথে এ নিয়ে ঠিকাদারের লোকজনের বাকবিত-া হয়। স্থানীয়দের এই প্রতিবাদ কতটুকু আমলে নেয়া হবে আমরা জানি না। হয়তো এই খারাপ ইট দিয়েই ভবন নির্মিত হবে। শুধু ইট কেন, পরীক্ষা করলে দেখা যাবে কাজের অন্যান্য ক্ষেত্রেও মান রক্ষিত হয়নি। হয়তো যতটুকু রড লাগানোর কথা ততটুকু লাগানো হয়নি। বালু-পাথর ও সিমেন্টের মিশ্রণের অনুপাত ঠিক রাখা হয়নি। ঠিকাদার এইভাবে কাজ করেই বিল তোলে নিবেন। নির্মাণের পর একসময় ভবনটিতে ফাটল দেখা দিবে অথবা ভবনটি হেলেও পড়তে পারে। দুর্ঘটনা ঘটে ভবনের লোকজনের ক্ষয়-ক্ষতিও হতে পারে। কিন্তু জড়িত কারও কিছুই হবে না। মান যাচাইয়ের দায়িত্ব যাদের তারা কখনও সঠিক দায়িত্ব পালন করবেন না। ঠিকাদার-কর্তৃপক্ষ ভাই ভাই হয়ে কাজ করে যাবে, মাঝখানে এক মুক্তিযোদ্ধা হেনস্তা হবে। এই ধরনের বাস্তবতা থেকে দুর্নীতির ভয়াবহতার বিষয়টি প্রকটিত হয়।
শাল্লায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বায়োমেট্টিক হাজিরা মেশিন সরবরাহের দায়িত্ব পেয়েছেন মেঙ্গো টেকনোলজিস্ট। তারা বিদ্যালয়গুলোতে যে মেশিন লাগাচ্ছেন বাজারে সেই মেশিনের দাম ১২ হাজার টাকা। কিন্তু তিনি এই মেশিন বিদ্যালয়গুলোতে বিক্রি করছেন ২৬ হাজার টাকায়। শিক্ষকরা খোঁজ নিয়ে যখন জেনেছেন এই ডিভাইসের বাজার মূল্য ১২ হাজার টাকার বেশি নয় তখন তারা প্রতিবাদী হয়েছেন। কিন্তু এখানেও কর্তৃপক্ষ কোনো প্রতিকারমূলক ব্যবস্থায় অবতীর্ণ হননি।
উপরের দুইটি ঘটনা থেকেই সরকারি ক্রয় কর্মকা-ে পুকুর চুরির বদঅভ্যাসটি ফুটে উঠেছে। সরকারি ক্রয় কর্মকা-কে স্বচ্ছ করতে কত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কিন্তু দুর্নীতি দূর হলো কই? দুর্নীতি মূলত আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। এই অভ্যাস এমনই মজ্জাগত রূপ নিয়েছে যে তা কাটিয়ে উঠা কঠিন। নীতিবাক্যে এই অভ্যাস দূর করা সম্ভব নয়। দরকার পড়বে শৈল চিকিৎসার। কঠিন ও কঠোরতর শাস্তিই কতিপয় ব্যক্তির রক্তের সাথে মিশে যাওয়া দুর্নীতির জীবাণুকে ধ্বংস করতে পারে। সরকার নানা ক্ষেত্রে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হয়েছেন। কিন্তু এটিকে আদতে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করে এই মহামারির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক জাতীয় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। শুধুমাত্র দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা গেলেই এই দেশটি সোনার বাংলা হতে সময় লাগবে না, এই সত্য প্রতিষ্ঠিত সত্য। কেন আমরা দেশোন্নয়নকে দুর্নীতির হাতে সঁপে দেব?
উপরে বর্ণিত দোয়ারাবাজার ও শাল্লার ঘটনা দুইটি সিন্ধু মাঝে বিন্দুমাত্র। দুর্নীতিসিন্ধু দূর করতে বিন্দুগুলোকে শুকিয়ে মারতে হবে। এক একটি বিন্দু মারা যাওয়ার অর্থই হল বিশাল সিন্ধুর শরীর থেকে কিছু অংশ শুকিয়ে ফেলা। আমরা যে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ দেখতে চাই।