ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ
বাস থেকে নেমে হাঁটতে থাকে ওরা, পা ভেজা ঘাসে ডুবে যায়, স্যান্ডেল দুর্বাঘাস-বালিতে একাকার হয়ে গেছে, তবু হাঁটতে ভালো লাগলে ওদের। কী শীতল আর মায়াময় স্পর্শ এই ভেজা মাটি ও ঘাসের! সামনেই টলটলে পুকুর, ডুব-সাঁতার দিচ্ছে ছোট্ট ছেলেরা।
আনোয়ার মিয়া হাত তুলে বলে, এসে গেছি, ওই তো আমাদের বাড়ি।
রূপমঞ্জুরী, নাফিসা আর রতœা-এ তিনটি মেয়ে বালাগঞ্জ থেকে সবেমাত্র বাসে করে ইলাশপুর এসেছে। ওদের এনজিও অফিসটি সিলেট সদরে। সেখান থেকে গ্রাম-গ্রামান্তরে কাজ করে ওরা, এবারে ওদের টার্গেট ইলাশপুর গাঁ।
মা ও শিশুদের স্বাস্থ্য, ওদের জীবন-পরিচর্যা, শিশু সন্তানদের প্রারম্ভিক শিক্ষার সহজ কায়দা-কানুন, স্বাস্থ্যসম্মতভাবে বেড়ে ওঠা, বৃহত্তর পৃথিবীর জীবনাচরণের সাথে আক্ষরিক অর্থে ওদের পরিচয় করিয়ে দেয়া-মূলত এসবই ওদের কাজ।
কাজগুলো নেশায় বুঁদ হয়ে যাওয়ার মতো। খুব ভালো লাগে ওদের। নতুন নতুন জায়গা দেখতে, অচেনা পরিবারের সাথে পরিচিত হতে, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার কথা শুনতে দারুণ লাগে ওদের। সম্ভ্রান্ত মিয়া পরিবারে প্রয়োজনমতো দু’চার দিন থেকে কাজগুলো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা, তারপর আবার নতুন পথে যাত্রা।
সন্ধ্যা নেমে এসেছে। আগামীকাল সকাল থেকে ওরা কাজে নেমে পড়বে। রাতের খাবারের চমৎকার আয়োজন করেছে মিয়া পরিবার। বরাবরের অতিথি-বৎসল ওরা। ক্ষেতের টাটকা সবজি, নদীর বড় মাছ, ডেগি মুরগি ভুন ও ঘন দুধের ফিরনি। নফিসা সংকোচের সুরে বলে, খালাম্মা, আমরা ক’দিন থাকব পরিবারের আপনজন হয়ে, আমাদের জন্য বিশেষ আয়োজনের প্রয়োজন নেই।
রতœা বলে, মনে রাখবেন খালাম্মা, আমরা মেহমান নই। ডাল-ভাত আর মাছ খাব।
আনোয়ারের আম্মা বলেন, তা-ই হবে মা।
সযতœ পরিপাটি বিছানায় শুয়ে অনেকক্ষণ গল্প করে ওরা। নতুন জয়গা, ঘুম একেবারেই আসছে না। অনেকক্ষণ এলেবেলে গল্প করার পর রতœা হঠাৎ বলে ওঠে, এ বাড়িতে একটিও ছোট মেয়ে নেই, ব্যাপারটি খেয়াল করেছ?
নাফিসা জোরে হেসে ওঠে-স্কুপ নিউজ দিলি মনে হয়।
রতœা খানিকটা লজ্জা পেয়ে বলে, সেই তখন থেকে একটি ছোট মেয়েও চোখে পড়েনি। বাস থেমে নেমে হেঁটে আসার সময় মেয়ে বা কিশোরী দেখিনি। যতই হাসিস নাফিসা, খুব একটা মিথ্যা বলিনি।
রূপমঞ্জুরী মৃদু স্বরে বলে, আমিও ব্যাপারটি খেয়াল করেছি রে। কী জানি! এ বাড়িতেও তো এক দঙ্গল ছেলে ছোটাছুটি করছে, মেয়ে একটিও দেখিনি। চোখের ভুলও হতে পারে। বর্ষার বিকেল তো, হয়তো ঘর থেকে বের হয়নি কিংবা মাযের সাথে থেকে সংসারের কাজে সাহায্য করছে।
এতক্ষণে নাফিসার ঘুম পেয়েছে। মোছা মোছা গলায় সে বলে, হয়তো তা-ই।
বাইরে বর্ষার রাত গাঢ় হতে থাকে।
দুই
সেই
শুরু। এ প্রসঙ্গটি উত্থাপন করে ওরা। এরপর থেকে আশ্চর্য হয়ে ভাবতে থাকে গাঁয়ের লোক। এও কী হয়, না হতে পারে!
একেবারেই সব অন্য রকম। উঠানের তারে ঝুলে আছে ভেজা পাজামা-পাঞ্জাবি, শার্ট-প্যান্ট, বধূদের শাড়ি; কিন্তু কন্যা সন্তানের ছোট ফ্রক নেই, সালোয়ার-কামিজ নেই, ছোট শাড়ি নেই। এতদিন ব্যাপারটি নিয়ে গ্রামবাসীর মনে কোনো প্রশ্ন জাগেনি। স্বাভাবিকই মনে হয়েছে সব কিছু। মায়েরা শুধু ছেলে সন্তানের জন্ম দিচ্ছে। এ তো হতেই পারে। হাসপাতাল-ক্লিনিকে কোনোদিন শুধু ছেলে সন্তান কিংবা কোনোদিন শুধু কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। এ নিয়ে এত ভাবাভাবির কী আছে! কিন্তু দিনের পর দিন, পক্ষের পর পক্ষ, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে থাকে এ গাঁয়ে-আতঙ্কিত হয়ে ওঠে গ্রামবাসী। ঘটনাটি কি কোনো অশনি সংকেতের বার্তাবহ হয়ে আসছে না?
বরাবর এ গাঁয়ে পুত্র সন্তান বা কখনো কন্যা সন্তান জন্ম নিত। কিশোরী-তরুণীরা হেসে-খেলে পুকুরঘাট, বুনোঝোপ, মেঠোপথ ভরিয়ে রাখত, প্রেম-ভালোবাসার মধুর মুখরোচক কাহিনীর জন্ম হতো, বিয়ে হতো আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে। বেশ কিছুদিন থেকে এমন আর ঘটে না। কারণ কন্যা সন্তান শূন্য হয়ে গেছে ইলাশপুরের গাঁ।
এ গাঁয়ের ওপর বারবার অপঘাত নেমে এসেছে। একাত্তরের সেই দুঃসহ সময়ে এ গাঁয়ে মিছিল করে ঢুকে পড়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ওদের দোসররাও ছিল তাদের পেছনের সারিতে। এক সাথে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এই গাঁয়ের ওপর। সারিবদ্ধ করে দাঁড় করেছিল সব পুরুষকে। মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল খান সেনারা। প্রাকদুপুরের সেই আলোয় ওদের মাথার হ্যাট ঝলসে ওঠেছিল ইস্পাতের মতো। জলপাই রঙের পোশাক যেন বলে দিয়েছিল-ওরা মৃত্যুদূত।
গাঁয়ের ঘরে ঘরে কান্নার রোল। স্বামী-সন্তান হারানোর সম্ভাব্য আতঙ্কে আর্তচিৎকারে ফেটে পড়েছিল মেয়েরা। এক সাথে অগুনতি বুলেটের তীব্র আওয়াজে গাছের শাখা থেকে সব পাখিরা উড়ে গিয়ে আকাশের সীমানায় কালির বিন্দুর মতো হারিয়ে গেছে সেদিন। ইলাশপুর গাঁয়ের সেই বিশাল মাঠে ঝাঁঝরা বুক নিয়ে লুটিয়ে পড়েছিল কর্মদক্ষ মানুষজন।
এতেই শেষ নয়, নিষ্ঠুর হানাদার বাহিনীর দোসররা ঘর থেকে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে এসেছে সদ্য স্বামীহারা তরুণী-যুবতী মেয়েদের।
হেসে উঠেছে পাকিস্তান সেনারা।
‘আইয়ে আইয়ে মেরে জান, তসরিফ লিজিয়ে’ খুবলে খেয়েছে সারা নবনীত শরীর। তীক্ষè বেয়নেট দিয়ে গোপনাঙ্গ খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে পৈশাচিক উল্লাসে মেতে উঠেছিল নির্মম পাকিস্তানি সেনারা।
‘খুশিভরা গলায় বলেছে, আভি কামসিন (অল্পবয়সী, অনাঘ্রাতা) হো, বহুত খু-উ-ব।’
একাত্তরের সেই বিষণœ কান্নার রোল স্বাভাবিক নিয়মে একদিন থেমে যায়। উঠে দাঁড়িয়েছে বিধবারা। আশাবাদী মেয়েরা আবার জেগে উঠেছে বুকে একরাশ জীবনীশক্তি নিয়ে।
একাত্তরের কথা তো কোনোদিনও ভোলার নয়। সেই দুঃস্বপ্নের দিনগুলো বারবার মনে আঘাত হানে, বুকের ভেতরটা নিঃশব্দে পুড়ে যেতে থাকে। তবে স্বাধীনতার কথা মনে হতেই স্বরচিত সান্তনায় নিজেকে প্রবোধ দেয় এই বলে, কিছু পেতে হলে হারাতেও হয় অনেক কিছু।
ঘর-গেরস্থালির তুচ্ছতায়, সন্তান লালন-পালনের ব্যস্ততায়, আর্থিক অভাব-অনটনের দৈন্যতায় ভাবারও সময় কেউ পায় নি-পুুরুষশাসিত এই সমাজে লক্ষণবৃন্তের সুকঠিন রেখায় জীবনবন্দি হয়ে আছে। একঘেয়ে হয়ে উঠেছে দৈনন্দিন জীবনযাপন। নারীজীবন তো অঙ্ক কষে মেলানো যায় না, সে যে স্বতন্ত্রসত্তার অভিযাত্রী, তা তো স্বামী-পুত্র কেউ জানতেও চায় না, এমনকি নিজেও ওদের মনকে ডিসেকশন করে জানতে পারে না।
তিনটি মেয়ে-রূপমঞ্জরী, নাফিসা ও রতœা অঙ্গুলি হেলনে দেখিয়ে দিয়ে গেছে সংসার ও সমাজের অপূর্ণতা। তোমাদের সংসারে, এ গাঁয়ে কোনো কন্যা সন্তান নেই-এ যে অবিশ্বাস্য ঘটনা!
তিন
অল্পদিনেই গোটা দেশে চাউর হয়ে যায় ব্যাপারটি। এ কী শুধু ইলাশপুর গাঁয়েই ঘটেছে, নাকি বাংলাদেশের আরো শহর-গাঁয়ে মেয়েচিহ্ন নিয়ে আর কোনো সন্তান জন্মাচ্ছে না। এ সূত্র নিয়ে বোঁদ্ধা গবেষকরা একত্র হলেন। গবেষক ড. রাহমান ‘সংসার-সীমান্তে নারী’-এ ব্যাপারে নতুন করে গবেষণা শুরু করেছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত-ভূমিহীন নারীদের নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন দেশে ও বিদেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। তিনি বললেন, হ্যাঁ, মেয়েরা যুগের পর যুগ নিগৃহীত, নিপীড়িত, অবহেলিত, শোষিত। এ তো নির্জল সত্যি। কেউ ওদের মনের খবর রাখে না।
ভারসাম্যহীন প্রকৃতি, জলবায়ু বিপর্যয় ও চলমান বিশ্বমন্দার সাথে যুক্ত হলো আরেকটি নতুন সমস্যা-কন্যা সন্তানবিহীন ইলাশপুর গাঁয়ের কথা। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী এ গাঁযের ওপর অমানুষিক নিপীড়ন করেছে। তাই কি পৃথিবীর মাটিতে আসতে অনাগ্রহ তাদের।
এখনো খবরের কাগজে মেয়েদের নির্যাতনের খবর প্রতিদিন আসছে। নারী নিপীড়নের খবর যেন ডাল-ভাতের মতো। দৌলতপুর উপজেলার কলিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমানের স্ত্রী রাশেদা বেগমের কাহিনী সবার জানা হয়ে গেছে। এই দম্পতির সংসারে তিনটি সন্তান থাকায় সিদ্দিকুর গোপনে আরো কয়েকটি বিয়ে করে। এছাড়া সে নানা মেয়েঘটিত অপকর্মে জড়িত। এসব কাজে স্ত্রী রাশিদা বেগম বাধা দিলে মারদাঙ্গা প্রকৃতির স্বামী অমানুষিক নির্যাতন করে স্ত্রীর ওপর। শিকল দিয়ে বেঁধে রাখে স্ত্রীকে। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা রাশিদা এখন আপনমনে শুধু বিড়বিড় করে।
এ তো অগুণতি ঘটনার একটি মাত্র। আরো দু’একটি ঘটনা শুনুন। তবেই বুঝতে পারবেন কীভাবে দিনের পর দিন নির্যাতিত হচ্ছে মেয়েরা। ড. রাহমান বর্ণনা করেন কিশোরগঞ্জ উপজেলার রণচ-ীপাড়া গ্রামের দু’টি বোনের কাহিনী। আবদুল মান্নানের ২৫ বছরের মেয়ে মাসুদা বেগম সান্ত¡না ও ষোল বছরের মাহমুদা আকতার শিমুর ওপর এসিড ছুঁড়ে মারে মাইক্রোবাস চালক আসাদুল।
আমেরিকার নারী গবেষক উইলিয়াম স্টোন অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন, ‘ওহ মাই গড, পুওর বেবিজ। কিন্তু এসিড ছুঁড়ে মারল কেন? হোয়াটস দ্য কজ অব ইট।’
‘বিয়ে করতে রাজি হয়নি তাই।’
মি. স্টোন অবাক হয়ে বলেন, হাজব্যান্ড চুজ করার স্বাধীনতা প্রতিটি মেয়েরই রয়েছে। তারপরও এসব কেন?
এসব কারণ কারোরই জানা নেই।
বৃটেনের মি. জন অস্টিন বলেন, তোমাদের এখানে র্যাপিস্টকে মুক্তি দিয়ে রেপ করার জন্য মেয়ে ও মাকে অভিযুক্ত করা হয়। ‘ড. রাহমান, অ্যাম আই রাইট? হোয়াট ইজ দিজ? আই ওয়ান্ডার, রিয়ালি ওয়ান্ডার।’
মি. রাহমান নতমুখে বসে থাকেন।
সত্যি কী লজ্জা আর অপমানের কথা! গ্রাম্য সালিশ-বিচারের ভার থাকে মোড়ল অথবা গ্রাম্য মাতব্বরের ওপর। সবাই তাকিয়ে আছে। মুখে কিছু বলছে না। কিন্তু ড. রাহমানের মনে হয়, দূরদেশের গবেষকরা তাকে যেন ‘শেম অন ইউ’ বলে ধিক্কার দিচ্ছে। ছিঃ ধিক্কারে ভরে উঠেছে চারপাশ। দায়িত্বশীল শ্রোতাদের একজন অন্য একটি খবর পরিবেশন করে।
-বগুড়ার একটি মেয়ের পরিবারকে বেধড়ক পেটানো হয়েছে এই কিছুদিন হলো।
ববি স্টোন প্রশ্ন রাখেন, ‘হোয়াটস দ্য কস্ট অব হার ফ্যামিলি?’
-মেয়েটি মডেলিং করত, স্যার।
‘দ্যাটস এপ্রিসিয়েবল।’ ওয়ার্ল্ডের প্রতিটি মানুষের তার নিজের প্রফেশন চুজ করার অধিকার রয়েছে। বোম্বের মি. কিরমানি বলেন, তোমরা সেই কখন থেকে কত কিছু বলছ। আমার বেটিরা যখন কোনো কারণে ঘরে থাকে না, খুব শূন্য শূন্য লাগে। মনে হয় দিল টুটে গেছে আমার। এই যে তোমাদের হিলাশপুর গাঁয়ে এতদিন কোনো বেবি গার্ল জন্ম নেয়নি, এতদিন ভাবনি তোমরা? মাই গড, সো স্যাড। মেয়ে বেবিকে তোমরা কতদিন বুকে জড়িয়ে ধরোনি। পুওর গাই, ‘জুদাই কা এক রোজ ক্যায়া, এক বরষ ক্যায়া।’ আমি তো আমার লাড়কির সাথে এক রোজেরও জুদাই বরদাশত করতে পারি না। আঁসু চিকচিক করে উঠে ড. কিরমানির চশমা পরা চোখে। বিষণœ এই পরিবেশ হালকা করে মি. ইয়াশিকি বলেন, কোন দেশে মেয়েদের ওপর অত্যাচার হয় না, তা-ই বলো। আমাদের দেশে, আই মিন জাপানের কিকো হোন্ডা নামে মেয়েটি কি বলেছে, তা তো তোমরা জানো না। পড়াশোনা শেষ করে ড্রিম দেখতে দেখতে মেযেটি গিয়ে দাঁড়াল চাকরির ইন্টারভিউ দিতে। সেখান থেকে ফিরে কিকো হোন্ডা ভীষণ মেলাংকলি হযে বলেছে, নিয়োগকর্তা আমার স্নাতক সার্টিফিকেটের ব্যাপারে মোটেই আগ্রহী ছিলেন না।
চেঁচিয়ে ওঠেন জন অস্টিন, হোয়াট? আই সে হোয়াট? ইয়াশিকি বলেন, নিয়োগকর্তা পরামর্শ দেন কিকোকে-চাকরি পেতে হলে স্নাতক সার্টিফিকেটেরে চেয়ে বেশি জরুরি হলো মিনি স্কার্ট পরা।
সবাই সমস্বরে চিৎকার করে ওঠে, হোয়াট আ শেম। ড. রাহমান এই তো কিছুদিন আগে খবরের কাগজ পড়তে পড়তে স্তম্ভিত হয়ে যান। তিনি জানেন, মানুষ নিষ্ঠুর, মানুষ নির্মম-তাই বলে এত? কারা যেন একটি মেয়েকে খুন করে কমলাপুর রেললাইনের ধারে বস্তাবন্দি করে ফেলে রেখেছে। রিপোর্টার বর্ণনা দিয়েছে এভাবে-অপূর্ব সুন্দরী এক মেয়ের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। মেয়েটির পরনে কমলা রঙের সায়া, লাল রঙের ব্লাউজ, ব্রা গোলাপি রঙের।
খবরটি পড়ে সে রাতে চোখের জলে ভেসে গেছেন ড. রাহমান। ভেবেছেন, এই মেয়েদের ভবিতব্য। শুধু কি ইলাশপুর গাঁয়ে? তা তো নয়, পৃথিবীর সব দেশেই অদৃশ্য এক লক্ষণবৃত্তের মাঝে বন্দি হয়ে আছে মেয়েদের জীবন।
চার
আমেরিকার পিটার ম্যাডফ যিনি ড. ম্যাডফ নামে পরিচিত, তিনি শোনালেন চমৎকার একটি গল্প। গল্প নয় সত্যি, গবেষণায় উঠে এসেছে চমৎকার তথ্য। স্টিকলব্যাক মাছই হলো গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু।
-বিহ্যাভিওরঅল ইকোলজি জার্নালে প্রকাশিত একটি নিবদ্ধ পড়ে আমি চমকে গেছি। এই যে তোমাদের ইলাশপুর গাঁয়ে কোনো কন্যা সন্তান জন্ম নিচ্ছে না-প্রাকৃতিক এই ব্যাপারে আমরা কতটুকু বুঝি। প্রকৃতির কাছে আমাদের হার মানতেই হয়। গবেষণা করলে হয়তো ব্যাপারটি খানিকটা পরিষ্কার হবে। ব্যাপারটি নিয়ে নিশ্চয়ই আমি চিন্তা-ভাবনা করব।
যা বলছিলাম, স্টিকলব্যাক মাছ নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে। এ মাছ সাধারণত ইউরোপের দেশগুলোয় পাওয়া যায়। সামাজিক বিষয়-আশয় রপ্ত করার আশ্চর্য ক্ষমতা রয়েছে এই মাছের-গবেষকদের তা-ই ধারণা।
গবেষকদের প্রধান ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেরেমি কেন্ডেল। তিনি বলেছেন, ছোট এই মাছের মস্তিষ্ক ছোট হতে পারে; কিন্তু তার ক্ষমতা বিস্ময়কর। ক্যান ইউ ইমাজিন?
গবেষণার জন্য ২৭০টি মাছ ধরে গবেষণাগারের অ্যাকুরিয়ামে রাখা হয়েছিল। মাছগুলোকে চারটি দলে ভাগ করে ওদের দু’পাশে দু’রকমের খাবার দেয়া হয়েছিল। একটি পাত্রে রাখা হয়েছিল কিছু পোকা-মাকড়, যা মাছগুলোর জন্য খুব উপাদেয় খাবার, অন্য পাত্রে রাখা খাবার তেমন উপাদেয় ছিল না। মাছগুলো যাতে ঘুরে ঘুরে খাবার খেতে পারে, সে রকম সুব্যবস্থা ছিল। ৭৫ শতাংশ স্টিকলব্যাক মাছ উপাদেয় খাবারের পাত্রটি খুঁজে বের করতে সক্ষম হয়েছে।
জার্মান দেশের ড. জেরহার্ড, ইংল্যান্ডের জন অস্টিন ও জাপানের ইয়াশিকি অবাক হয়ে বলেন, ওকে টিপার ম্যাডফ, স্কিলব্যাক মাছের বুদ্ধিমত্তার গল্প শোনালেন বলে অসংখ্য ধন্যবাদ। কিন্তু এটার সাথে ইলাশপুর গাঁয়ে কন্যা সন্তান জন্ম না নেয়া কিংবা দেশের সার্বিক নারী নির্যাতনের সাথে এর সম্পর্ক কোথায়?
ড. রাহমান বলেন, আছে, নিশ্চয়ই আছে। নিশ্চয়ই আছে। মাছ বুদ্ধিমান কি না, এ ব্যাপার নিয়ে কখনোই আমরা ভাবি না; বরং এগুলো সুস্বাদু কি না এটাই আমরা বেশি করে ভাবি। বড়শিতে ভাত গেঁথে পুকুরে ফেললে দেখা যায় তেলাপিয়া, টাকি টপাটপ গিলে ফেলে। মাছ বোকা বলেই আমরা জানি। স্টিকলব্যাক মাছের ওপর গবেষণা করে দেখা গেল, মাছেরও বুদ্ধিমত্তা আছে। সারা জীবন স্মলবোন বা অপেক্ষাকৃত দুর্বল বলে মেয়েদের ভাবি, তারা যে কোনোদিন নিপীড়ন-নির্যাতন আর অবহেলা উপলব্ধি করবে না, তা কিন্তু নয়। ড. রাহমানের পিঠে মৃদু চাপড় দিয়ে পিটার ম্যাডফ বলেন, অ্যাকজ্যাকটলি সো। এক সময় মেয়েদের মনে অভিমান, বেদনা-দুঃখ, আত্মসম্মানবোধ পুঞ্জীভূত হতে হতে বিদ্রোহের আকারে রূপ নিতে পারে। ধীরে ধীরে তা এপিডেমিকের পর্যায়ে চলে যেতে পারে। আই থিংক সো। উৎসুক সাংবাদিক জিজ্ঞেস করে, তা কি শুধু ইলাশপুর গাঁ থেকে বাংলাদেশে ছড়াবে, নাকি গোটা পৃথিবীতেই দেখা দেবে?
পিটার ম্যাডফ বলেন, এ ব্যাপারে আই অ্যাম নট শিওর। এখনই কিছু বলা যাবে না। আই থিংক, বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়লে বৃহত্তর জগতে কন্যারা আর জন্ম নিতে চাইবে না। এভাবেই আরো ইলাশপুর গ্রাম তৈরি হবে। মাই গড! তাহলে পৃথিবীর অবস্থা কী হবে?
কনফারেন্স টেবিল ঘিরে বসে বিজ্ঞ চিন্তাবিদ মানুষজন এর গুরুত্ব উপলব্ধি করে ভাবতে থাকে। স্টিকলব্যাক মাছের মতো তাদের সুখ-শান্তিময়, বন্ধনমুক্ত জীবন এবং অন্যদিকে লক্ষণবৃত্তের মধ্যে তাদের যদি একটিকে বেছে নিতে বলা হয়, তাহলে দেখা যাবে-স্বস্তিকর, আনন্দময় ও স্বাধীন জীবনকেই তারা বেছে নিয়েছে। বোদ্ধা চিন্তাবিদ ও গবেষকরা এ সিদ্ধান্তে একমত হন।
পাঁচ
জটিল এই দুঃসময়ে আবির্ভূত হন পুরুষোত্তম। তাকে ঘিরে রয়েছে বরুণ, অম্বর, পৃথিবী, দ্যুতি ও অগ্নি। গাঢ়কণ্ঠে পুরুষোত্তম বলেন, মেয়েরা চিরকালই জনমদুঃখিনী। রামায়ণের গীতা সারা জীবন রামকে ভেবেছেন, তবু তিনি সতী কি না এ জন্য তাকে অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছে বার বার। নারীত্বের অবমানরা সে যুগেও কি হযনি? মা বসুমতী তাকে বক্ষে ধারণ করেছেন বলেই তো অসহনীয় জীবন থেকে মুক্তি পেয়েছেন গীতা।
পরিবেষ্টিত সঙ্গীদের প্রতি দৃষ্টিপাত করে পুরুষোত্তম বলেন,
-যাজ্ঞসেনীর কথাই মনে করো।
-যাজ্ঞসেনী! সে কে? দ্যুতির প্রশ্ন।
-কেন দ্রৌপদী। তার কথা ভাবো একবার। পাঁচজনের ঘরণি হয়ে দিনযাপন করতে হয়েছে তার। তাই তো তার নাম পাহতালী। ভেবে দেখো, কী অসহনীয় জীবন তিনি কাটিয়েছেন!
বিস্ময়ে আমি হতবাক হয়ে যাই।
পৃথ্বী যেন তাদের বেদনার ভার আর বইতে পারছে না। কেঁপে ওঠে পৃথিবী।
-আর খনা?
-হ্যাঁ খনা, সেও আরেক দুঃখিনী। ভূত-ভবিষ্যৎ সঠিকভাবে গণনা করে বলার আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তার। অসামান্য এই নারীর বাকচাতুর্যে শ্বশুর বরাহ ভীষণ অপমানিতবোধ করেন। মহারাজ বিক্রমাদিত্য তার সভার গুণবর্ধনের জন্য নবরতেœর সাথে দশম রতœ নির্বাচিত করেন খনাকে। কুলবধূ রাজসভায় বসবে-এ তো ভারী অসঙ্গত ব্যাপার। বরাহ ছেলে মিহিরের সাথে পরামর্শ করলেন, খনার বাকশক্তি হরণ করতে হবে। পিতার আদেশে ছেলে মিচির তীক্ষèধার ছুরি দিয়ে খনার জিহ্বা কেটে ফেলে। রক্তগঙ্গা বয়ে যায়। তবু এখনো আমরা খনার সেই জিহ্বার কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। চারপাশে প্রগাঢ় নিস্তব্ধতা। নারীর অপমান, অসম্মান আর বেদনাময় জীবন কথা বলে পুরুষোত্তম এখন ক্লান্ত, স্তব্ধবাক প্রায়।
অম্বর বলে, হে পুরুষোত্তম, কথা বলুন আপনি। আমিও বেদনায় ভারাক্রান্ত। এই তো শহরে সন্ধ্যার দিকে সুবেশা এক তরুণীকে জমজমাট ভিড়ের মাঝ থেকে তুলে নিয়ে গেল পাঁচ-ছয়টি তরুণ। অসহায় মেয়েটি গাড়ির গ্লাসে মাথা কুটে কেঁদেছিল। বলেছিল, বাঁচাও বাঁচাও আমাকে। অম্বর একটু থেমে বলতে থাকে, আমি আমার বুকের সব ব্যথা অশ্রুজলে পরিবর্তিত করে অঝোরধারায় বৃষ্টি হয়ে ঝরেছি। বাদলা হাওয়ায় মহাশূন্যে মাথা কুটেছি। পৃথ্বী বলে, আমি থরথর করে শুধু কেঁপেছি; কিন্তু মেয়েটিকে তো ওদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারিনি।
আবার নিস্তব্ধতা।
আশার প্রদীপ আচমকা জ্বালিয়ে ধরে অম্বর।
-এখন ওরা আর অবনত হয়ে থাকে না। মেয়েরাও ধীরে ধীরে জেগে উঠছে প্রভু।
পুরুষোত্তম অবাক হয়ে খুশিভরা স্বরে বলেন, জেগে উঠছে ওরা! তাই কি?
দ্যুতি, অগ্নি, জ্যোতি, বরুণ, পৃথ্বী যেন জেগে ওঠে। পৃথ্বী বলে, হ্যাঁ, কলারোয়া উপজেলার গোপিনাথপুর গ্রামের সাইফুলের সাথে ইন্দিরা গাঁয়ের একটি মেয়ের এক লাখ টকা দেনমোহরে বিয়ে হয়।
-তারপর? তারপর কি হলো? দ্যুতি উদ্গ্রীব হয়ে প্রশ্ন করে।
পৃথ্বী বলে, বিয়ের আসরে অতিথিদের খাওয়ার সময় বর না খেয়ে শহরে চলে যায়। পরে নেশা করে এলে সদ্য বিয়ে করা বউ বিয়ের আসরে বরকে তালাক দেয়। ভাবা যায়!
অগ্নি হাসিমুখে বলে, ওরা জেগে উঠছে, এ তো শুভলক্ষণ। পুরুষোত্তম বলে, এ তো বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা মাত্র। সার্বিকভাবে তো জেগে উঠতে হবে। তারা নাভিমূল থেকে উত্থিল হওয়া করুণ নিঃশ্বাস বাতাসে মিশে যায়।
ছয়
ইলাশপুর গাঁ তেমনই বিষণœ হয়ে রইল। কোনো কন্যা সন্তান জন্ম নিল না। এ কেমন রহস্যময় প্রকৃতি। গ্রীষ্ম এলো।
কেউ থালায় ধোঁয়া ওড়া গরম ভাত-তরকারি বেড়ে দেয় না। নকশা করা তালপাখা হাতে কেউ পাশে বসে না। বর্ষার ধারাজলে কেউ ভেজে না। দোলনচাঁপা খোঁপায় গোঁজে না। বিনুনি দুলিয়ে কেউ ছুটে পালিয়ে যায় না। কোথাও রঙিন জামা দোলে না। রঙিন ফিতে, চুড়ির গোছার আওয়াজ শোনা যায় না। অবগুণ্ঠনে কেউ মুখটি ঢেকে সরে যায় না। গাঁয়ের কোনো প্রান্তে শোনা যায় না হাসির মিষ্টি রিনিরিনি সুর। পায়ের শিঞ্জিনী কোথাও বেজে ওঠে না।
সত্যিই কি এ অসুখের নাম বিদ্রোহ? এপিডেমিকের মতো ছড়িয়ে পড়বে কি দেশ-দেশান্তরে?
রুখু-সুখু চারপাশে। শুষ্ক মরুভূমির মতো সংসার। কোথাও এক ফোঁটা আনন্দ নেই, কোথাও গানের কলি ভেসে আসে না। কিশোর-তরুণ-যুবক-পৌঢ়ের ইলাশপুর গাঁয়ে কেটে যায় নিস্তরঙ্গ জীবন।
পুরুষোত্তমের কণ্ঠে বজ্রনিনাদে স্ত্রোত্রধ্বনি উচ্চারিত হয়। অপমানহীন, অসম্মানহীন এক পৃথিবী গড়ে উঠবে একদিন। ভালোবাসা-স্নেহ-মমতায় ভরা থাকবে এ সংসার। হে দুহিতা-আত্মজা-তনয়া-নন্দিনী-তোমরা এসো, আবাহন করছি, তোমরা ফিরে এসো। এই মরুসংসারে রসধারা নিয়ে তোমরা এসো। পৃথিবী নামে এই গ্রহে-বরুণ-অগ্নি-অম্বর পৃথ্বী-জ্যোতি আনন্দধ্বনি করে ওঠে।
রুক্ষ মেঘহীন আকাশে পলকে মেঘ দল সাজে। মুহূর্তে মসীকৃষ্ণ হয়ে উঠে বর্ণিল আকাশ। মধুর নিনাদে গেয়ে ওঠে বৃষ্টিকণা।