ইকবাল কাগজী
সম্প্রতি অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, এই ছোট্ট শহর সুনামগঞ্জের ঘাড়ে প্রায় প্রতিদিনই কোনও না কোনও, সরকারি কিংবা বেসরকারি, অনুষ্ঠান হামলে পড়ে। সাংবাদিকরা সব হন্তদন্ত হন, তারপর ক্যামেরার ক্লিকক্লিক ক্যারিশমার বৈদ্যুতিন ঝলমলের বাহা কী বাহারি চমক। বছর দশেক আগেও এমন অচলায়তনভাঙা সদম্ভ সাংবাদিকতার রমরমা অবস্থা সুনামগঞ্জে গড়হাজির ছিল বৈকি। সভাসেমিনার কিংবা নিদেনপক্ষে কোনও একটি চলনসই সম্মেলন করার জন্যে এখন সুনামগঞ্জে সেই পুরনো আবুল হোসেন মিলনায়তনের সঙ্গে যোগ হয়েছে শহিদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাঠাগারের দু’তলার ও নতুন শিল্পকলা একাডেমির অপেক্ষাকৃত আধুনিক সুবিধাসমৃদ্ধ মিলনায়তন। তাছাড়া আছে, সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাবের ও পুরাতন শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তন দু’টি। এগুলোতে যে-কোনও সময় যে-কোনও বৈঠক, সভা অর্থাৎ আলোচনা, মতবিনিময়, সাংবাদিক সম্মেলন কিংবা কোনও আবৃত্তি, বিতর্ক, চিত্রাঙ্কন, প্রতিযোগিতা, সাহিত্যসভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, কর্মশালা, প্রদর্শনী ইত্যাদি যাবতীয় আধুনিক কর্মকা- পরিচালনা করার সুবিধা আছে হাতের কাছেই, যে কোনওভাবে বন্দোবস্থ নিলেই হলো আর কি। এমনকি দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের কার্যালয়েও মোটমুটি হাল আমলের সুবিধাসম্পন্ন একটি মিলনায়তন আছে, যেখানে প্রায়ই সংক্ষিপ্ত পরিসরের বিভিন্ন সভা, আলোচনা, মতবিনিময় কিংবা সাংবাদিক সম্মেলন অনায়াসে করা যেতে পারে। কোণায়কানায় হয় তো আরও এমন সুবিধা তৈরি হয়েছে, যে-গুলোর খরব অনেকেরই গোচরে নেই।
এইসব অনুষ্ঠানে আমার সাধারণত তেমন একটা যাওয়া হয় না। নিমন্ত্রণই পাই না এবং আশাও করি না অবশ্য। আসল কথা আমি তো আর দাওয়াত না পেলেই নয় তেমন কোনও কেউকেটাও নই। সমাজে এমন কেউকেটা না হওয়াটা একদিক দিয়ে ভালোই বটে, না চাইতেই সেটা জীবনব্যাপী একধরনের নির্জনতাকে পাহারা দেবার কাজও করে ফেলে। যদিও বা কালেভদ্রে কোনওটাতে নিমন্ত্রণ থাকে, বিভিন্ন কারণে যাওয়া হয়ে উঠে না। একেবারেই যে যাই না তেমন নয়। কোনও কোনও সময় এড়ানো যায় না কীছুতেই, প্রকারান্তরে বিশেষ পরিস্থিতির কারণে মাঝেমধ্যে যেতে বাধ্য হই। কেন যেতে পারি না, তার কারণগুলো সঙ্গতকারণেই এখানে অনুল্লেখ্য অর্থাৎ আলোচনার বাইরে ফেলে ফেলনা করে রাখার মতো বিচ্ছিরি বিষয়। তবে এখানে একটি কথা বলে রাখি, গেলে পরে কোথাও কোথাও বিচিত্র সব বিন্যাসবিষয় প্রত্যক্ষ করে কারণে-অকারণে চোখ ঠাটায়, একই মঞ্চে মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকারের চমৎকার মেলবন্ধন দেখে মন খারাপের অচিকিৎসু বিষন্নতায় ভারাক্রান্ত হই। শুভ অশুভের এইরূপ বিসদৃশ অভিসার মনের ভেতরে বিস্তৃত পীড়নের আকার নিতে নিতে প্রচ- বিবমিষার উদ্রেক করে। উপস্থিত মুহূর্তে বিবৎসার (বসবাস করার ইচ্ছা) বিপরীতে জীবনজুড়া কী রকম এক কেবল প্রবল পলায়নপরতা জেগে থাকে আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর যে ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র অস্তিত্বের পূর্ণপরিসরে, সেটা হলো চিন্তার এক অনতিক্রম্য অসাড়তার আবির্ভাব। অর্থাৎ কোনও মানুষের তাৎক্ষণিক প্রজাতি বিলুপের মতো ঘটনা, অর্থাৎ যাকে বলে, সহসাই কী এক যাদুমন্ত্রে মূর্তিমান স্থিতপ্রাজ্ঞ কোনও মানুষের চমৎকার উনবুদ্ধির বানর হয়ে যাওয়া।
গত কদিন আগে একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম, না পারতে। একজনের অনুরোধ উপেক্ষা করতে না পেরে, অর্থাৎ অনুরোধে ঢেঁকি গিলতে যেতেই হলো এবং গিয়ে পরে ভাষণ নামের ভীষণ বাক্যবমির উদগীরণ করতে হলো। এখানে অবগত করে রাখা ভালো, তথাকথিত এই বাক্যোদগীরণ কম্মটির শুভসমাপন করতে অবশ্য আমার আন্তরিক অসম্মতি ছিল না, বরং কেন জানি না কীছুটা গুপ্ত ব্যগ্রতাই ছিল, মনে মনে। প্রস্তাব করতেই একবারে লুফে না নিলেও নিমরাজি হতে পিছপা হলাম না, এমনিতে যে-টা আমার স্বভাববিরুদ্ধ। এসব সভাসমিতি, আলোচনা-পর্যালোচনা
সংক্রান্ত অনুষ্ঠানে বাক্যোদগীরণে কেউ কেউ সত্যিকার অর্থেই বড় বেশি উদগ্রীব হয়ে থাকেন, তাঁরা বুঝেন না, কোথায় যাওয়া উচিৎ ও কোথায় নয়, কোথায় কীছু বলার তাঁদের অধিকার আছে কোথায় নেই। একটি সাহিত্যসভায় একজন প্রাজ্ঞ গরুব্যবসায়ী, যিনি অগাধ নগদনারায়ণের মালিকানাসহ সমাজে অর্থবিত্তসমেত প্রবলপ্রতাপ অর্জন করলেও তাঁর মগজের তহবিলে সাহিত্যের ‘স’-ও জমা পড়েনি এবং তিনি, ধরে নেওয়া যাক, জীবনানন্দ সম্পর্কে আলোচনায় পা-িত্য জাহির করতে নয়, বরং মেদসমৃদ্ধ চকচকে চেহারা প্রদর্শনের নিমিত্তে বীরবিক্রমে কোমর বেঁধে মঞ্চারোহণ করবেন, তেমনটা যেমন বেমানান তেমনি মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আলোচনায় একজন রাজাকারের মঞ্চারোহণও তেমনি বেমানান।
আমরা ভুলে যাই। অবশ্যই ভুলে গেলে চলবে না, এই কথা বার বার ভুলে যাই। ভুলে যাই যে, এই দেশ, যাকে বলি বাংলাদেশ, পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক নিপীড়ন রুখে দিতে জাতীয় মুক্তির আন্দোলনে ব্রতী হয়েছিল, পৃথিবীর ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল। আর এই বিরল ঘটনার অনিবার্য পরিণতি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ করে বাঙলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। বাংলাদেশের সে-মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীরা কেউ কেউ এখনও বাংলাদেশের প্রকৃতি ও সমাজে বেঁচে আছেন, তাঁরা স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে স্বাধীনতার প্রধান সেনানী রাষ্ট্রের স্থপতিকে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন এবং তৎপর বাংলাদেশের ভেতরে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর হয়েছিলেন। এককথায় বলতে গেলে তাঁরা পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তনের বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তার প্রতিনিধি। তাঁদের পক্ষে মানানসই তাঁরা আর যা-ই করুন, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা মুক্তিযোদ্ধা সম্পর্কিত কোনও অনুষ্ঠানে যেনো তাঁরা না যান, কারণ আর যা-ই হোক তাঁদেরকে সেখানে মানায় না। তাছাড়া ভুল পাল্টাবার চেষ্টা না করাই সমীচীন, যা ইতোমধ্যেই সাধারণ্যে চিহ্নিত হয়ে গেছে।
আসলে বিষয়টা এমন যে, যেখানে যাঁর/যাঁদের উপস্থিত থাকার কথা, যেখানে যাঁর/যাঁদের কথা বলার কথা, সেখানে তিনি/তাঁরা উপস্থিত নেই, তিনি/তাঁরা কথা বলছেন না। উপস্থিত আয়োজনটার সার্বিক বাস্তবতাটাই হয় তো এমন। সেখানে বাস্তবায়িত সকল পদের সকল আসন কিংবা ভাষণপ্রক্ষেপের সুযোগ ও সময় অগ্রিম তাঁদের দখলে চলে গেছে। যেমন দখলে চলে গেছে দেশের বিভিন্ন স্থানে খাল, বিল, জলাধার, সরকারি-বেসরকারি জমি এবং এমনকি বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক পদগুলোকে তোলা হয়েছে নিলামে ও শিক্ষাকে করা হয়েছে দামী পণ্য। সুনামগঞ্জে এই রকম দখলযজ্ঞের জলন্ত উদাহরণ হলো কামারখালির খাল ও যে-কোনও বক্তৃতার মঞ্চ। রাষ্ট্রচিন্তা সংক্রান্ত এক লেখায় চিন্তক আহমদ রফিক তার এক প্রবন্ধে বিশেষ একটি সংবাদসূত্র তোল ধরেছেন। সে সংবাদসূত্রে বলা হয়েছে, ‘দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ ধ্বংস করে দখলযজ্ঞ চালালেও সেদিকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো সংস্থার দৃষ্টি নেই। এ সুযোগে তারা ওই এলাকার পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে ফেলেছে। ফলে ঢাকার এ অংশে মারাত্মক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে…।’ কোনও এক স্থানের ‘পরিবেশ ধ্বংস করে দখলযজ্ঞ চালালে’ সেখানে সৃষ্ট ‘জলাবদ্ধতা’ অধিবাসী মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তোলে, কল্পনাতীতভাবে ডাঙ্গায় বসয়ীদের করে তোলে নিদারুণ বন্যার্ত, জল দখল করে নেয় তাদের ঘরবাড়ি। বিল শুকিয়ে মৎস্যনিধনে ব্যপৃত হলে পরবর্তীতে মাছের প্রজাতির বিলুপ্তিসাধন ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হয়ে মানুষের প্রোটিন সংগ্রহপ্রক্রিয়ায় সংঙ্কট সৃষ্টি করে কিংবা নদী থেকে বালু তোলে ফেললে জনবসতি নদীভাঙনের শিকার হয়। এমন অনেক অনেক উদাহরণ দেওয়া সম্ভব। ইনিয়েবিনিয়ে এত কীছু বলার একটাই অভিপ্রায়, বলতে চাই, দেখেশুনে মনে হচ্ছে, সম্পূর্ণ সংস্কৃতি নষ্টদের দখলে চলে গেছে। বাক্যটা বোধ করি চিন্তক হুমায়ুন আজাদের কোনও একটি সুপরিচিত ও বিখ্যাত বাক্যের অনুগবয়ন হয়ে পড়েছে। তা হোক, তাতে কীছু যায় আসে না। নষ্টদের দখলে চলে যাওয়ার উদাহারণ দিচ্ছি। এই কদিন আগে সুনামগঞ্জের সবকটি হাওরের, প্রায় না বলে বলা উচিৎ সম্পূর্ণ ধান, হাওররক্ষাবাঁধ উপচে-ভেঙে তলিয়ে গিয়েছিল, জেলাকে তাৎক্ষণিক মুহূর্তে করে তুলেছিল একেবারে আক্ষরিক অর্থেই খাদ্যনিরাপত্তাহীন। দাবি উঠেছিল সুনামগঞ্জকে দুর্গত ঘোষণা করার। এবং দাবি উঠতেই পারে, উঠাই স্বাভাবিক। জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে সে-জনদাবির বিপক্ষে দাঁড়িয়ে একজন সচিব বললেন, কোনও স্থানের অর্ধেক মানুষ মারা গেলে পর সে-এলাকাকে দুর্গত ঘোষণা করতে হয়, এটাই নাকি প্রতিষ্ঠিত নিয়ম। অথচ আমাদের দেশের সরকারি নিয়মের কোথাও এমন নিয়মের কোনও বালাই নেই। সত্যি বলতে কি, অবিমৃষ্যকারিতারও একটি সীমা থাকে, নষ্টরা কোনও সীমাই কখনও মানেন না, তাঁদের দখলের দাপটের দর্প এতোটাই ভীষণ।
কোনও দেশের সংস্কৃতির উপর উটকো দখলযজ্ঞ যখন চলে তখন বেমক্কা অনেক ঘটনা, যে-গুলো নিতান্তই সৃষ্টিছাড়া, দিনপুপুরে ঠাঠা রোদ্দুরে হঠাৎ বজ্রপাতের মতোÑ যদি কখনও এমন হয় আর কিÑ ঘটতে থাকে। যেমন ধরুন একটি কবিতা পাঠের আসরে যদি একজন ইউনিয়ন চেয়ারম্যান (যিনি জীবনে কখনও এক পংক্তি কবিতাও লেখেননি, অর্থাৎ একটি কবিতাও রচনা করেননি, আদপে হয় তো ব্যাকরণসম্মতভাবে কোনও একটি বাক্য লেখাও তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়, এমন একজন) সভাপতিত্ব করতে বসেন, যেহেতু কবিতাপাঠের আসরটি তাঁর ইউনিয়নের পরিসরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে কেবল সেই সুবাদে, তখন অনিবার্যভাবেই যা হয়, সে বাস্তবতাকে কী বলে বর্ণনা কার যায়, সহসা মাথায় আসে না, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হওয়া ছাড়া অন্য কোনও উপায় থাকে না।
এমন গভীর সর্বগ্রাসী ও সর্বাস্তৃত দখলের দৌরাত্ম্যকে জীবনানন্দ দাশ বোধ করি তাঁর ‘অদ্ভুত আঁধার এক’ কবিতায় প্রকৃষ্টরূপে প্রস্ফোটিত করতে পেরেছেন। কবিতাটি এরকম, ‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ,/ যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা,/ যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই, প্রীতি নেই, করুণার আলোড়ন নেই,/ পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।/ যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি,/ এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়/ মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা/ শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তারা।’ আর সেই আঁধারের আচ্ছন্নতায় যে সামাজবাসবতবতা তৈরি হয় তার সহজ বর্ণনা মেলে আহমদ রফিকের আর একটি কথায়। তিনি বলেছেন, ‘… সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের নিয়তি হলো বৈষম্যপীড়িত, দুর্নীতিগ্রস্ত, ব্যাপক মুনাফাবাজ পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় বসবাস। আপাতত এর কোনও বিকল্প দেখা যাচ্ছে না।’ সর্বাস্তৃত দখল প্রক্রিয়া বজায় রেখে সমাজের এই অবস্থা যারা করেছে তাদের সম্পর্কে অন্যত্র তিনি বলেছেন, ‘কারণ ওরা বিত্তবান, প্রতাপশালী, কখনও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ধন্য। তাদের চুলের ডগাটি স্পর্শ করার ক্ষমতা দুর্নীতি দমন বিধায়কদের নেই। শুধু রাজধানী ঢাকা শহরেই নয়, এদের প্রতাপ বন্দরে, শহরে, নগরে।’ সুনামগঞ্জও এর ব্যতিক্রম নয়।
কল্পনা করুন, একজন প্রখ্যাত মুক্তিযোদ্ধার শোকসভা, সে সভায় উপস্থিত হয়ে আপনি যদি দেখেন, কোনও এক চিহ্নিত রাজাকার সভামঞ্চ আলো করে বসে আছে, তা হলে কি আপনিÑ মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একজন মানুষ বা নিজে হয় তো একজন মুক্তিযোদ্ধাÑ সে সভায় ডাল মে কুচ কালা হয়ে বসে থাকার উপকরণ হয়ে উঠেন না? এই সব নানাবিধ কারণে কোনও সভায় যেতে আজকাল আর মন সরে না, এইভাবে যেচে গিয়ে নিজেকে তুচ্ছ করে তোলার কোনও মানে হতে পারে না।
সুতরাং যেখানে যা হবার তা হচ্ছে না বরং যা হচ্ছে তা হবার কোনও কথা ছিল না। সংস্কৃতিচর্চার এই জটিলতা চলছে সর্বত্র যত্রতত্র। একারণে, আগেই বলেছি, যেখানে সেখানে যেতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু তারওচেয়ে বড় কথা প্রায় সবখানেই কীভাবে যেনও জানি নাÑ হয় তো কোনও এক গূঢ় কারণে, সেটা হলেও হতে পারে দৃষ্টিভঙ্গিগত কিংবা আরও যথাযথভাবে শ্রেণিগত কোনও তারতম্যÑ আগে থেকেই অবাঞ্ছিত হয়েই আছি। ফলে একদিক থেকে সেটা শাপে বর হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ বলি, কোনও এক সাহিত্যবাসরে গিয়ে দেখা গেলো, সেখানে কোনও না কোনও জ্ঞাত/অজ্ঞাত কারণে সব আর্জিলেখক কিংবা কোনও না কোনও দলচর্চায় ভীষণ পারদর্শী সব জননমস্যজন এসে দারুণ ঝাঁকিয়ে বসেছেন, যাঁরা সাহিত্যচর্চার সঙ্গে আদপেই সম্পৃক্ত নন, তাঁদের কেউ কেউ হয় তো ‘আসামি’ লিখতে গিয়ে ‘আসামী’ লিখতেই কেবল বেশি অভ্যস্ত নন বরং কী কারণে জানি না বদ্ধপরিকর এবং যাঁরা ভুলটাকে পরিহার করে শুদ্ধটার প্রচলনে আগ্রহী তাদের উপর অকারণেই প্রবল পা-িত্যের প্রহরণপ্রবণ। ‘ভুল জানা’কে ‘শুদ্ধ জানা’ করে নিতে কেন যে তাঁদের এতো অনীহা সেটা কীছুতেই বোধগম্য নয়। এই ‘অকারণ’কে বলা যায় ‘ভুল পুরাতন’কে আঁকড়ে ধরার অনমনীয় জেদ থেকে নতুনকে জায়গা না দিয়ে প্রকারান্তরে সমাজের অগ্রগতিকে প্রতিহত করার প্রবণতা। শেষ পর্যন্ত যে প্রবণতাকে কোনও না কোনও সময় অবশ্যই পরাস্ত হতেই হয়, কালে কালে তা-ই হয়েছে। পুরাতনকে নতুনের জন্য স্থান ছেড়ে দিতেই হয়, এটাই জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম। পরিবর্তনের এই নিয়মের বিরোধিতা যারা করে, সকল সমাজের ইতিহাসেই তারা পশ্চাদপদ মানুষ হিসেবে এখন পর্যন্ত চিহ্নিত। সক্রেটিসকে মানুষ এখনও শ্রদ্ধা করে, তিনি এখনও মানুষের আলোকায়নের দিশারী কিন্তু সক্রেটিসের হন্তারকদের প্রতি মানুষ স্বভাবতই বীতশ্রদ্ধ। মুজিব মানুষের স্মরণীয় ও বরণীয় কিন্তু বিপরীতে তাঁর হন্তারকরা ঘৃণিত। ১৯৭২ সালের সংধিানের ‘সমাজতন্ত্র’ মুছে দিয়ে যারা ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’-এর নামে দেশের মানুষের সঙ্গে প্রতারণায় মেতে উঠে ‘সামাজিক বৈষম্যকে’ নিজেদের আরাধ্য করে তোলে এবং অবৈধকে বৈধ ও অন্যায়কে ন্যায় করে তোলে এবং শাসন-শোষণ-নিপীড়নের মাত্রাকে আরও প্রবল করে দিয়ে সমাজপ্রগতির লাগাম টেনে ধরে, মানবজীবনে স্থবিরতার অন্ধকার নামিয়ে আনতে চায় তারা পিছিয়ে পড়া মানুষ হিসেবেই কেবল নয় বরং এক অশুভ শক্তি ও বিশ্বাসঘাতক হিসেবে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে চিহ্নিত হয়ে থাকে।
এই অবস্থার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে আশায় বসতির স্বপ্ন বোনেন চিন্তক আবুল কাসেম ফজলুল হক। তিনি তাঁর এক প্রবন্ধে বলেন, ‘পৃথিবীটাকে সবার জন্য অনেক সুন্দর ও সুখময় করে তোলা সম্ভব। গণতন্ত্র সমাজতন্ত্রের নামে প্রগতিহীনতার সমাচার, সা¤্রাজ্যবাদী যুদ্ধবিগ্রহ, তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার, মাদক দ্রব্যের প্রসার, অসামাজিক কার্যকলাপ, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, অর্থনৈতিক বঞ্চনা, নৈতিক পতনশীলতা, জুলুম-জবরদস্তি, অপব্যবস্থা ও দুর্নীতি ইত্যাদি সমস্যার সমাধান করতে হবে।’ (কালের কণ্ঠ, ০৯ অক্টোবর ২০১৭, পৃষ্ঠা : ১৪, প্রবন্ধ : রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ)।
সমাজ-রাষ্ট্র পরিবেশ অর্থাৎ মানবিক পরিবেশ থেকে দূর হোক জীবনানন্দীয় ‘অদ্ভুত আঁধার’। সমাজ ও সংস্কৃতি মুক্ত হোক অশুভের নাগপাশ থেকে।