- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

দেশের বৃহৎ মিছাখালি রাবারড্যামে ধস-৬ শ্রমিক আহত

স্বপন কুমার বর্মণ ও কাজী সালেহ
দেশের সর্ববৃহৎ রাবারড্যামের নির্মাণ কাজ শেষ হবার আগেইে একটি অংশ ধসে পড়েছে। বৃহস্পতিবার বিকালে রাবার ড্যামের নির্মাণাধীন ব্রিজের শেষ অংশের একটি স্প্যান (৪৪ মিটার) হঠাৎ ধসে পরে। বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার দক্ষিণ বাদাঘাট ইউনিয়নের মিছাখালী নদীতে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে দেশের সর্ববৃহৎ এই রাবার ড্যাম। নি¤œমানের নির্মাণ সামগ্রী ও কাজে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি হওয়ার কাজ চলাকালীন সময়েই একটি অংশ ধসে পড়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা। ধসের ঘটনায় ৬ শ্রমিক আহত হয়েছেন। এঘটনায় রাবার ড্যাম এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল- সমাবেশ করেছেন স্থানীয় বিক্ষুব্ধ লোকজন। মিছিল-সমাবেশে ঠিকাদারের শাস্তি দাবি করা হয়। আহত শ্রমিকদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে গুরুতর আহত দুই শ্রমিক শুক্কুর নেচ্ছা রেখা (৩০) ও ইয়াছিন মিয়া (৩২)  কে সন্ধ্যার পর সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও রাবার ড্যাম নির্মাণকাজের তদারককারী প্রতিষ্ঠান বিএডিসির প্রকৌশলীগণ। বিএডিসির প্রকৌশলী একটি স্প্যান (৪৪ মিটার অংশ) ধসে পরার কথা জানালেও ঠিকাদার মস্তু মিয়ার দাবি ১১ মিটার ধসে পড়ছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসির) উদ্যোগে প্রায় ৭ হাজার হেক্টর জমির উপর ৫৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে বোরো ফসল অকাল বন্যা ও পাহাড়ী ঢল থেকে রক্ষা করতে ৫ স্প্যান বিশিষ্ট ২২০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৪ মিটার উচ্চতা সম্পন্ন দেশের বৃহৎ এই রাবারড্যামটি নির্মাণ হচ্ছে। নির্মাণ কাজ করছে ঢাকার সেগুন বাগিচার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স কেবিআইএমএমকে। রাবার ড্যামের            উপরে ৫ স্প্যান বিশিষ্ট ২২০ মিটার দৈর্ঘ্যরে ব্রিজ নির্মাণ হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ব্রিজের ঢালাই চলছিল। ঢালাইয়ে কাজ করছিল নারী-পুরুষ মিলে ২৭ জন শ্রমিক। ঢালাই দেয়ার কয়েক ঘণ্টা পর বিকাল প্রায় সোয়া ৩ টায় হঠাৎ বিকট শব্দে ব্রিজের এক অংশ (একটি স্প্যান) ধসে পরে। এসময় ব্রিজের উপরে থাকা ৮-১০ জন শ্রমিক ঢালাইয়ের নিচে পড়ে ও বাঁশ-রডের আঘাতে আহত হয়। ঢালাইয়ের মাঝে পড়ে ও রড-বাঁেশর আঘাতে আহত হয় উপজেলার উলাসনগর গ্রামের মফিজুল ইসলামের স্ত্রী নারী শ্রমিক শুক্কুর নেচ্ছা রেখা(৩০), ফতেপুর ইউনিয়নের রাজেন্দ্র নগর গ্রামের আব্দুল হকের স্ত্রী নাজমা বেগম (৩৫), সিরাজগঞ্জের ভ¤্রকাচা এলাকার শহীদুল ইসলামের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম (৩৫), একই জেলার শাহ আলীর ছেলে ইয়াছিন মিয়া (৩২), ভেউমারার আবু তাহেরের ছেলে আব্দুল খালেক (৩৪) ও কুড়িগ্রামের বকবান্ধা এলাকার ইনছান আলীর ছেলে মজলু মিয়া (৩২)। স্থানীয় লোকজন আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।
ঠিকাদারের শাস্তি ও রাবার ড্যামের ব্রিজ ধসের প্রতিবাদে তাৎক্ষণিক (বিকাল সাড়ে ৪ টায়) বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে স্থানীয় লোকজন। বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে বক্তব্য রাখেন এলাকার মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার, জমসেদ মিয়া, সাইফুল ইসলাম,কাউছার আলম প্রমুখ।
উপজেলার সিরাজপুর গ্রামের বাসিন্দা বাচ্চু মিয়া বলেন,‘আমি রাবার ড্যামের সামনে ছিলাম। বিকাল সোয়া ৩ টায় হঠাৎ বিকট শব্দ শুনতে পাই। দেখি ব্রিজের ঢালাই ধসে পড়ছে। এসময় ঢালাই কাজের শ্রমিকরা এর মাঝে পরে আহত হয়।’
ঢালাই কাজে নিয়োজিত শ্রমিক উলাসনগর গ্রামের নাজমা বেগম বলেন, টুকরিত কইরা মাল (বালি-পাথর-সিমেন্ট  মিশ্রিত) লইয়া ফালাইতে খালি রওনা দিছি, এর মাইজে দেখি বড় শব্দ কইরা বিরিজ ভাইঙ্গা পইড়া যারগি। একটুর লাগি আল্লাহ জান বাচাইছে। মালের তলে, রডের ও বাশের বারি খাইয়া অনেক কামলা (শ্রমিক) দুখ পাইছে। দুই জন জাগাতই অজ্ঞান হইয়া গেছে। হুনছি এরারে সুনামগঞ্জ পাঠাইছে।’
ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প দেখভালকারী উত্তম সরকার ও সাইফুল ইসলাম বলেন,‘রাবার ড্যাম ও ব্রিজ নির্মাণের কাজে আমরা উন্নত মানের রড-সিমেন্ট ও বালি পাথর ব্যবহার করছি। বৃহস্পতিবারে ঢালাইয়ে সাটারিং একটু দুর্বল ছিল তাই ধসে পড়েছে। আমাদের কাজে কোন ত্রুটি ছিল না।’
স্থানীয় মিরারচর গ্রামের বাসিন্দা লুৎফুর রহমান বলেন,‘এই রাবার ড্যাম নির্মাণের শুরু থেকে নিম্নমানের বালি-পাথর, রড সিমেন্ট দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। কিন্তু যখনই এলাকার লোকজন প্রতিবাদমুখর হতে চায় তখনই মিথ্যা-চাঁদাবাজির মামলা দিয়ে হয়রানীর হুমকি দেয় ঠিকাদার ও তার লোকজন। আমরা র‌্যাবার ড্যামের ব্রিজ ধসে পরার বিচার ও তদন্ত চাই। ’
স্থানীয় বাদাঘাট (দ.) ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান অ্যাড. ছবাব মিয়া বলেন,‘রাবার ড্যাম নির্মাণের শুরু থেকেই স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করে আসছিল মাটি মিশ্রিত বালি-পাথর, কাটা পাথরের সাথে সিঙ্গেল পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে, রড ও সিমেন্ট কম দেয়া হচ্ছিল। এসব কারণেই ঢালাই চলাকালীন সময়ে ব্রিজের এক অংশ ধসে পড়ছে। ব্রিজ ধসে পড়ার ঘটনায় সঠিক তদন্ত ও জড়িতদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।’
রাবার ড্যামের ঠিকাদার মস্তু মিয়া কাজে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,‘আমরা সঠিকভাবে নিয়ম-নীতি মেনেই কাজ করছি। ভাল-মানের রড-সিমেন্ট ও বালি পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সাটারিং’র কারণে ১১ মিটার ঢালাই ধসে পড়েছে। এটা আবার নতুন করে ঢালাই করা হবে।’
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন বলেন,‘রাবার ড্যামের ব্রিজ ধসে পড়ার খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করেছেন রাবার ড্যাম নির্মাণে নি¤œমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার ব্রিজ ঢালাইকাজে পুরাতন বাঁশ-কাঠ ব্যবহার করা হয়েছিল। তাই ব্রিজের একটি অংশ ধসে পড়েছে। ৬ জন শ্রমিক আহত হয়েছে। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগের বিষয়গুলি সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হবে।’
সুনামগঞ্জ বিএডিসি’র সহকারী প্রকৌশলী আবু আহমেদ মাহমুদুল হাসান বলেন,‘রাবার ড্যামের কাজে নি¤œমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহৃত হচ্ছে এধরনের অভিযোগ সঠিক নয়। উন্নত মানের রড-সিমেন্ট,বালি-পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে। স্প্যানের ঢালাইয়ের সাটারের নিচে বাঁেশর খুঁটিগুলো একটু বাঁকা হয়েছিল, তাই ঢালাই চলাকালীন অবস্থায় একটি স্প্যান ধসে পড়েছে। এতে রাবার ড্যামের কোন ক্ষতি হবে না নতুন করে আবার ঢালাই দেয়া যাবে। ৬-৭ জন শ্রমিক আহত হয়েছিল তাদের চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।’
উল্লেখ্য, গত বছরের ১৫ জানুয়ারি এই রাবার ড্যামের কাজ শুরু হয়। রাবার ড্যাম নির্মাণের শুরু থেকে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ও কাজে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ করছিল স্থানীয় লোকজন।

  • [১]