- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে স্বাধীনতা বিরোধীদের অবস্থান

এলাকার চিহ্নিত রাজাকারদের নাম প্রকাশ না হওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করেছেন জগন্নাথপুরের মুক্তিযোদ্ধারা। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে তাঁদের এই হতাশার কথা জানা যায়। জগন্নাথপুরের মুক্তিযোদ্ধারা বলছিলেন, জেলার দুইটি প্রধান গণহত্যাযজ্ঞ হয়েছিল এই উপজেলায়। উপজেলার শ্রীরামসী ও রানীগঞ্জ বাজারে পাকা হানাদারদের গণহত্যায় শহীদ হয়েছিলেন যথাক্রমে ১২৬ ও শতাধিক সাধারণ বেসামরিক মানুষ। যুদ্ধে বেসামরিক মানুষকে হত্যা করা একটি বড় মাপের যুদ্ধাপরাধ রূপে গণ্য হয়। জগন্নাথপুরের মুক্তিযোদ্ধারা ওই দুই বৃহৎ গণহত্যাযজ্ঞে স্থানীয় কিছু স্বাধীনতা বিরোধী ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ এনেছেন। কিন্তু তাঁদের আক্ষেপ হলো, রাজাকারদের তালিকায় জগন্নাথপুরের দুইজন ব্যতীত আর কোনো স্বাধীনতা বিরোধীর নাম আসেনি। সম্প্রতি ১০ হাজার ৭৮৯ জনের নাম অন্তর্ভূক্ত করে রাজাকার তালিকার প্রথম দফা প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এই তালিকা পাঠ করে যে কেউ নির্দ্বিধায় বলতে পারবেন এই তালিকা অপূর্ণাঙ্গ এবং অযতেœ পরিপূর্ণ। ইতিহাস হিসেবে সংরক্ষণের জন্য তালিকায় ন্যূনতম যেসব তথ্যাদি থাকা দরকার ছিল তার বিন্দুবিসর্গও নেই ওই তালিকায়। বরং এক ধরনের সস্তা ক্রেডিট নেয়ার অদম্য আগ্রহে যেনতেনভাবে একটি তালিকা প্রকাশ করার মনোবৃত্তিই প্রকাশ পেয়েছে ওই তালিকায়। মানুষ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেখেছেন, একাত্তরে যারা এলাকায় স্বাধীনতা বিরোধী অবস্থান বজায় রেখেছিল তাদের অধিকাংশেরই নাম নেই এই তালিকায়। শুধু জগন্নাথপুর নয়, সুনামগঞ্জসহ সারা দেশেই একই অবস্থা দেখা যাবে। অন্যদিকে এই তালিকায় রাজাকারের বদলে কিছু মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধ সংগঠকের নাম অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। তালিকা প্রকাশের পর থেকেই এ নিয়ে সারা দেশ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার নাম আসা কোনো ভুলভ্রান্তির বিষয় হতে পারে না। এটি অবশ্যই ইচ্ছাকৃত। রাজাকার তালিকায় কারা মুক্তিযোদ্ধাদের নাম লিখে রেখেছে তার উত্তর অজানা। এটি এখন হয়েছে নাকি অতীতে যখন স্বাধীনতা বিরোধীরা ক্ষমতায় ছিল তখন হয়েছে সেটি তদন্তস্বাপেক্ষ। তবে এখন কেন তালিকার এই গুরুতর কলঙ্ক মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের নজর এড়িয়ে গেল তার জবাব অবশ্যই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রীকে দিতে হবে। জাতির সামনে একটি তালিকা প্রকাশ হবে আর সেটি কোনো এক পেনড্রাইভ থেকে এনে সামান্য যাচাই-বাছাই ছাড়া প্রকাশ করে ফেলা হবে, এমন ঘটনা যারা ঘটাতে পারেন তাদের মানসিকতা নিয়ে কারও কোনো সন্দেহ নেই। এরা প্রকারান্তরে স্বাধীনতার চেতনার পরিপন্থী অবস্থানেরই ধারক। রাজাকার তালিকার লেজে-গুবরে অবস্থা ও এ নিয়ে দেশব্যাপী ক্ষোভের মুখে ইতোমধ্যে তালিকাটি স্থগিত করা হয়েছে। কিন্তু এই অপরাধের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। আমরা মনে করি রাজাকার তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার নাম উঠানোর মতো গর্হিত অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়া কিছুতেই উচিত কাজ হবে না। এরকম একটি বিতর্কিত, অপূর্ণাঙ্গ, দায়-দায়িত্বহীন ও খামখেয়ালিতে ভরা তালিকায় চেনা রাজাকারদের নাম না থাকার কারণে তাই জগন্নাথপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হতাশ হওয়ার কিছু নেই। বরং এই তালিকা নিয়ে তাঁরা ক্ষুব্ধ হতে পারেন যাতে সরকার শীঘ্রই একটি সঠিক স্বাধীনতা বিরোধীদের তালিকা জাতির সামনে উপস্থাপন করতে পারে। দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে স্বাধীনতা বিরোধীদের অবস্থান। আমাদের কাছাকাছিই এরা অবস্থান করে, এরা হৃষ্টপুষ্ট হয় আমাদেরই পৃষ্ঠপোষকতায়। এরা রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রশাসন, প্রতিষ্ঠান সর্বত্র শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে বসে আছে। এরা সুযোগ পেলেই মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কের মধ্যে ঠেলে দেয়ার প্রয়াস করে। রাজাকার তালিকায় ক্ষমাহীন অপরাধটিও এরাই করেছে। এদের পরিচয় উদ্ঘাটন অতিশয় জরুরি। নতুবা ঘুনপোকার মতো এরা আমাদের রক্তে কেনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধূলিতে পরিণত করবে।

  • [১]