- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

দেড় যুগ ধরে গজারিয়া স্লুইস গেইট বন্ধ- জলাবদ্ধতায় হাজারো কৃষকের জমি

বিন্দু তালুকদার
কানাইকালী নদী ভরাট জেলার জামালগঞ্জ উপজেলার একটা অতি পরিচিত শব্দ। এই নদী ভরাটের ফলে উপজেলার ফেনারবাঁক ও ভীমখালী ইউনিয়নের পাগনার হাওরে জলাবদ্ধতায় শত শত কৃষক জমি থেকে নিঃস্ব হয়েছেন।
বৃহত্তর পাগনার হাওরের জলাবদ্ধতার সমস্যা গত প্রায় এক যুগেরও বেশী সময়ের। পাগনার হাওরের জলাবদ্ধতা সৃষ্টির জন্য কানাইকালী নদী ভরাটের পাশাপাশি গজারিয়ার বন্ধ হওয়ায় স্লুইস গেইটকে দায়ী করছেন এলাকার কৃষকরা। কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্লুইস গেইট গত প্রায় ২০ বছর ধরে অকেজো হয়ে পড়েছে। স্লুইস গেইটের উজানে খাল পলি ভরাট হয়ে এই সমস্যা দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা।
স্থানীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন সম্প্রতি ফেনারবাঁক ইউপি ছয়হারা গ্রামে পল্লী বিদ্যুৎ সংযোগের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় কৃষকদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ভরাটকৃত কানাইকালী নদী খননের জন্য ৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের অনুমোদন হয়েছে। আগামী সপ্তাহে এই কাজের উদ্বোধন করা হবে। এই বছর হাওরে ফসল চাষাবাদের উপযোগি করতে ১ কোটি টাকার কাজ করা হবে। ভরাটকৃত গজারিয়া খাল খননেরও উদ্যোগ নেয়া হবে।
এদিকে, জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী খলিলুর রহমান জানিয়েছেন গজারিয়া খাল খনন ও বন্ধ হয়ে যাওয়া স্লুইস গেইট চালু করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
কৃষকরা জানান, গত ১৯৯২ সালে পাগনার হাওর থেকে সুরমা নদী পানি নিষ্কাশন ও নিয়ন্ত্রণে ফেনারবাঁক ইউনিয়নের গজারিয়া গ্রামের বাজারের উত্তরদিকে খালে প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি স্লুইস গেইট নির্মাণ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। গজারিয়া খালে স্লইস গেইট নির্মাণের   
পর কয়েক বছর হাওরের পানি নিষ্কাশন হয়েছে। এর সুরমা নদী পলি পড়ে স্লুইস গেইটের উজানের খাল ভরাট হয়ে যায়। এতে স্লুইস গেইট দিয়ে পানি নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে স্লুইস গেইটি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং খাল দিয়ে পানি নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে পড়ে। ভরাট হয়ে যাওয়া গজারিয়া খাল খনন ও স্লুইস গেইট চালু করার জন্য স্থানীয় কৃষক ও এলাকাবাসী পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করলেও পাউবো কোন উদ্যোগ নেয় নি।
এদিকে, গজারিয়া স্লুইস গেইট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বৃহত্তর পাগনার হাওরের মাঝদিয়ে প্রবাহিত কানাইকালী নদীও ভরাট হতে থাকে। কানাইকালী নদী ভরাট ও গজারিয়া খালের স্লুইস গেইট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পাগনার হাওরে স্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।
ভরাট হওয়া কাইনাইকালী নদী খননের জন্য পাগনার হাওরের পাড়ের বেশ কয়েকটি গ্রামের হাজারো কৃষক জোরালো আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন। স্থানীয় কৃষকরা একাধিকবার জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি ও আবেদন করেছেন। কিন্তু কৃষকদের আন্দোলন সংগ্রাম ও নদী খননের দাবি সফলতার মূখ দেখেনি। কানাইকালী নদী খনন এখনও হয়নি। পাগনার হাওরে জলাবদ্ধতার কারণে ফেনারবাঁক ইউনিয়নের রাজাবাজ, উজান দৌলতপুর, ভাটি দৌলতপুর, বিনাজুরা, ছয়হারা, গঙ্গাধরপুর, তেঘরিয়া, রাজাপুর, ইনাতনগর ও ফেনারবাঁক এবং ভীমখালী ইউনিয়নের রাজাবাজ, ভান্ডা ও মল্লিকপুর গ্রামের শত শত কৃষকের হাজার একর জমি জলাবদ্ধতা রয়েছে বছর বছর ধরে।
গত ৪-৫ বছর ধরে এলাকার কৃষকরা সংগঠিত হয়ে পাওয়ার পাম্প দিয়ে হাওরের পানি নিষ্কাশন করে বোরো ধান চাষাবাদ করছেন। তবে অনেক বছর হাওরে পানি বেশী জমে থাকায় সেচ খরচ বৃদ্ধি পায় এবং অসমেয় চাষাবাদ করলে অতিবৃষ্টির পানিতে আবার তলিয়ে যায় ধান।
উজান দৌলতপুর গ্রামের কৃষক গৌরাঙ্গ সরকার বলেন,‘ কানাইকালী নদী ও গজারিয়া খাল ভরাট এবং গজারিয়া স্লুইস গেইট বন্ধ থাকায় হাওরে জমি থাকার পরও আমরা দিনে দিনে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছি। তিন পুরুষের চাষাবাদের জমি এখন সারা বছরই পানির নিচে থাকে।’
ভান্ডা গ্রামের কৃষক সাবেক ইউপি সদস্য মোস্তফা মিয়া বলেন,‘ কানাইকালী নদী ও গজারিয়া খাল ভরাট এখন আমাদের গলার কাটা হয়ে দাড়িয়েছে। যার কারণে গত প্রায় দেড় যুগ ধরে হাওরের পানি সময় মত নিষ্কাশন হয় না। আমাদের গ্রামের সব গৃহস্তের জমিই পানি নিচে থাকে। অসময়ে পানি সেচে ধান চাষ করতে হয়। এতে চাষাবাদের খরচ অনেক বেড়ে যায়। সময় মত জমি চাষ না করতে পারে অনেক কৃষক দরিদ্র হয়ে পড়েছে। নদী ও খাল খননেন দাবি নিয়ে আমরা আনেক আন্দোলন সংগ্রাম করেছি কিন্তু কোন কাজ হয়নি। ’
গঙ্গাধরপুর গ্রামের বাসিন্দা স্বাবলম্বী কৃষক জীতেন্দ্র তালুকদার পিন্টু বলেন,‘গজারিয়া খাল ভরাট ও স্লুইস গেইট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পাগনার হাওরের পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না। গজারিয়া খালের পাশাপাশি কানাইকালী নদীও ভরাট হয়েছে। হাওরের পানি সুরমা নদীতে প্রবাহিত হওয়ার রাস্তা বন্ধ হওয়ায় ২০ ধরেই এই হাওরে জলাবদ্ধতার সমস্যা বিরাজ করছে। এখন প্রতি বছরই পাম্প দিয়ে পানি সেচে ধান রোপন করতে হচ্ছে। হাওরের পানি নিষ্কাশনের সমস্যা এবার আরো প্রকট আকারে দেখা দিচ্ছে। বোরো মৌসুমের শুরুতেই হাওরের পানি অন্যান্য বছরের চেয়ে অনেক কম হ্রাস পাচ্ছে।’
এলাকার কামধরপুর গ্রামের বাসিন্দা গজারিয়া বাজারের পল্লী চিকিৎসক হারুনুর রশিদ বলেন,‘ যতদূর জানি গত ১৯৯২ সালে প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এই স্লুইস গেইট নির্মাণ করা হয়েছিল। এই স্লুইস গেইট নির্মাণের পর ৪-৫ বছর এটা খোলা ছিল। সে সময় বৃহত্তর পাগনার হাওরের পানি এই গেইট দিয়ে নিষ্কাষিত হত। এর স্লুইস গেইটের উজানে প্রায় আধা কিলোমিটার খাল পলি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। এর পর গত ২০ বছর ধরে এই স্লুইস গেইট বন্ধ রয়েছে। ফলে হাওরের পানি সময় মত নিষ্কাষিত হচ্ছে না। প্রতি বছরই হাওরে জলাবদ্ধ দেখা দিয়েছে।’
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এর উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী খলিলুর রহমান বলেন,‘পাগনার হাওরের গজারিয়া স্ল্ইুস গেইট পুনরায় চালু করার উদোগ নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে আইডব্লিউ নামের একটি প্রতিষ্ঠান এর মাঠ জরিপ করেছে। এবছরই গজারিয়া খাল খনন ও বন্ধ হয়ে পড়া স্ল্ইুস গেইট পুনরায় চালু করার জন্য টেন্ডার আহবান করা হবে। আমাদের আশা এইবার টেন্ডার হবে এবং আগামীতে খাল খনন ও স্লুইস গেইট বদলানোর কাজ হবে।’

  • [১]