ধর্মপাশা প্রতিনিধি
খেলার মাঠের পাশেই দীর্ঘ দেয়াল। শেওলা জমে সে দেয়াল সৌন্দর্য্য হারিয়েছে অনেক আগেই। তাই দেয়ালটির প্রতি কারো কোনো নজর নেই। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে সেই দেয়ালই হয়ে উঠেছে দৃষ্টিনন্দন। এখন খেলার মাঠের পাশ দিয়ে যাওয়া পথচারীদের অনেকেই থমকে দাঁড়ান এবং এগিয়ে যান দেয়ালের কাছে। আর কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে যান মুক্তিযুদ্ধের সেই সময়কার দিনগুলোতে। কারণ দীর্ঘ দেয়ালের ৬০০ বর্গফুট অংশ জুড়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ‘চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১’ নামের একটি বৃহৎ চিত্রকর্ম। যেখানে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণসহ মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বিভিন্ন চিত্র ও বিভিন্ন কবির লেখা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কবিতার পঙক্তি। ধর্মপাশা জনতা মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠের পূর্বপাশে দেয়ালে এমন দৃষ্টিনন্দন চিত্রকর্ম এঁকেছেন কাজী বর্ণাঢ্য (সজিব) নামের এক চিত্রশিল্পী। তিনি ধর্মপাশা উপজেলার সদর ইউনিয়নের নলগড়া গ্রামের মরহুম আক্তার হোসেনের ছেলে।
কাজী বর্ণাঢ্য দীর্ঘ বছর ধরে কাজের সুবাদে ঢাকায় ছিলেন। সম্প্রতি তিনি স্থায়ীভাবে নিজ বাড়িতে ফিরেছেন। একদিন তিনি ধর্মপাশা জনতা মডেল উচ্চ বিদ্যালয় খেলার মাঠের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দীর্ঘ দেয়ালটি তাঁর নজরে আসে। তিনি তাতে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চিত্রকর্ম ফুটিয়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে এ ব্যাপারে অনুমতি চান। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাৎক্ষণিক এমন সৃজনশীল কর্মের জন্য অনুমতি প্রদানহ সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। গত ১ ডিসেম্বর থেকে প্রশাসনের আর্থিক সহযোগিতায় টানা ১৪ দিন কাজ করার পর মঙ্গলবার দুপুরে কাজী বর্ণাঢ্য বৃহৎ চিত্রকর্মটি শেষ করেন। হাওরাঞ্চল ধর্মপাশায় এটিই প্রথম কোনো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চিত্রকর্ম। চিত্রকর্মটি দেখতে স্কুল কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গসহ নানা শ্রেণি পেশার মানুষ ভিড় করছেন প্রতিদিন।
মধ্যনগরের ফারুকনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আতিক ফারুকী বলেন, ‘দাপ্তরিক কাজে মাঠের পাশ দিয়ে উপজেলার দিকে যাচ্ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চিত্রকর্মটি দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম।’
নলগড়া গ্রামের শাহ আলম বলেন, ‘প্রতিদিন মাঠের পাশ দিয়ে উপজেলা সদরে যাতায়াত করতে হয়। কখনই দেয়ালটির প্রতি এভাবে দৃষ্টি পড়েনি। কিন্তু চিত্রকর্মটি দেয়ালে ফুটিয়ে তোলার পর যখনই এখান দিয়ে যাই তখনই হৃদয়ে মুক্তিযুদ্ধের এক চেতনা নাড়া দিয়ে যায়।’
কাজী বর্ণাঢ্য বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে আমি এ উদ্যোগ নিয়েছি। হাওরাঞ্চলের মানুষ চারু ও কারু শিল্প থেকে অনেকটা দূরে। সৃজনশীল ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলতে এ শিল্পের বিকল্প নেই। এই শিল্পকে হাওরাঞ্চলের সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে চাই।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মুনতাসির হাসান বলেন, ‘এই চিত্রকর্মটি নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে চেতনা জাগ্রত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তাই চিত্রশিল্পীকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হয়েছে।’