হঠাৎ করেই ১ জুলাই থেকে ১৫ টাকা কেজি দরে ওএমএস’র চাল বিক্রি বন্ধ করে দেয়ায় ফসলহারা কৃষক ও গরিব জেলে-দিনমজুর-শ্রমিক শ্রেণির লোকেরা চরম বিপাকে পড়েছেন। ওএমএস’র চাল বিক্রি বন্ধের বিষয়টি আগে থেকে না জানানোয় এখনও নানা স্থানে শেষ রাত থেকে লাইন ধরে থাকতে দেখা গেছে বলে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়। এমনিতে বাজারে যখন চালের দাম বেড়ে যায় তখন বাজারমূল্য স্থিতিশীল তথা স্বল্প আয়ের মানুষেদের খাদ্য নিরাপত্তা বিধানকল্পে খোলাবাজারে নির্ধারিত মূল্যে সরকার চাল বিক্রির ব্যবস্থা করে থাকেন। এই কর্মসূচী সরকারের মোটামোটি একটি নিয়মিত কর্মসূচী। তবে এবার সুনামগঞ্জ জেলার জন্য বিষয়টি ছিল ব্যতিক্রমী। স্মরণকালের ভয়াবহতম ফসলহানির পর সুনামগঞ্জের প্রায় দুই লাখ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোতে স্বল্পমূল্যে খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য ওএমএস’র মাধ্যমে গত ৬ এপ্রিল থেকে ৪২ জন ডিলারের মাধ্যমে প্রতিদিন ৪২ টন এবং ১ মে থেকে ১১০ জন ডিলারের মাধ্যমে প্রতিদিন ১১০ টন চাল বিক্রি করা হচ্ছিল। ১১০ টি ডিলার পয়েন্ট থেকে প্রতিদিন ২২ হাজার পরিবার ৫ কেজি করে চাল কিনতে পারতেন। ওএমএসে চাল বিতরণের এই পরিমাণ প্রকৃত ক্ষতির তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল ছিল। ওএমএস’র পরিধি আরও বাড়ানো ও পরবর্তী ফসল উঠার পূর্ব পর্যন্ত এই কর্মসূচী চালু রাখার জন্য সরকারের নিকট বিভিন্ন মহল থেকে জোরালো দাবি জানানো অব্যাহত ছিল। তারপরও অন্তত ২২ হাজার পরিবার তো খাদ্য নিরাপত্তা পেয়ে আসছিলেন। এখন হঠাৎ করে বিনা নোটিশে এই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়ায় এই ২২ হাজার পরিবারসহ জেলার দুই লাখ কৃষি পরিবার নতুন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। জানা যায়, সরকারি খাদ্য গোদামে হঠাৎ করে মজুদ ঘাটতি হওয়ায় নাকি ওএমএস কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকসূত্রে জানা গেছে বিদেশ থেকে চাল আমদানি হওয়ামাত্র ওএমএস কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা হবে।
ওএমএস চালু থাকা অবস্থায়ই খোলাবাজারে চালের দাম অত্যধিক বৃদ্ধি হচ্ছিল যা এখনও কমেনি। এই বোরো মৌসুমে প্রতি বছরই ধান-চালের দাম কমে থাকে। কিন্তু এবার হাওরাঞ্চলে ফসল না হওয়ায় বাজারে মৌসুমে চালের দাম হ্রাস পায় নি। সরকার এজন্য ব্যবসায়ীদের কারসাজিকে দায়ী করলেও এই কারসাজি বন্ধ করতে তেমন সফলতা দেখাতে পারে নি। এখন যখন ওএমএস বন্ধ হলো তখন বাজার আরও চড়ে যেতে পারে বলেই আশংকা ব্যক্ত করছেন বিভিন্ন মহল। এমন অবস্থায় সরকারকে বিদেশ থেকে চাল আমদানির বিষয়টি তরান্বিত করতে হবে। আমরা আশা করছি সরকার বসে নেই। দ্রুত চাল আমদানির মাধ্যমে চালের বাজারদর নিয়ন্ত্রণসহ পুনরায় ওএমএস কার্যক্রম চালু করবেন।
হাওরাঞ্চলের বোরো ফসল দেশের খাদ্যভা-ারে কী পরিমাণ ধান সরবরাহ করে থাকে এবারের বিপর্যয়ের পর সেটি ভালভাবে টের পাওয়া গেল। মূলত হাওরের এই অবদানকে এতদিন তেমনভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয় নি। সম্ভবত তথ্য কারচুপির ফলে সরকারের উচ্চমহল হাওরের সক্ষমতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখতে সক্ষম হন নি। স্পষ্ট তথ্য থাকলে হাওরের উন্নয়ন তথা সক্ষমতা বিঘিœত না হওয়ার বিষয়ে সরকারকে আরও মনোযোগি দেখা যেত। এবারের সংকটের পর আমরা আশা করব সরকারের টনক নড়েছে। আমরা অনুরোধ করব দেশের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জায়গায় হাওরের অবদানকে নিরুদবিগ্ন রাখতে এখন থেকেই করণীয় নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেয়া শুরু করা হবে।