প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া পাহাড় বা টিলা কাটা দেশের প্রচলিত আইন অনুসারে নিষিদ্ধ। তারপরেও নানা স্থানে পাহাড়-টিলা কাটার খবর পাওয়া যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামে সাম্প্রতিককালে পাহাড় ধসে বহু মানুষের মৃত্যু এই অবৈধ কর্মকা-ের একেবারে জলজ্ব্যন্ত উদাহরণ। সিলেটের নানা স্থানে টিলা কেটে মাটি অপসারণের খবরাখবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে অনুরুপ একটি উদ্বেগজনক খবর বেরিয়েছে। ছাতক উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের ধনীটিলায় টিলা কেটে দীর্ঘদিন ধরে দেদারসে পাথর আহরণ করা হচ্ছে বলে ওই খবরে দেখা যায়। স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন বলেছেন, তারা টিলা কাটা বন্ধ করে দিয়েছেন। এই নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও যথারীতি টিলা কেটে পাথর আহরণ করা হচ্ছে বলে সংবাদপত্রে তথ্য দেয়া হয়েছে। ধনীটিলার অবৈধ পাথর আহরণের সাথে জনৈক ব্রজেন্দ্র কুমার সিংহের নাম উঠে এসেছে। তার ভাষ্য মোতাবেক টিলাটি তিনি লিজ নিয়েছেন এবং বৈধভাবেই পাথর উত্তোলন করছেন। আমরা জানি পাথর বা মাটি কাটার জন্য কোন টিলা লিজ দেয়া হয় না। ব্রজেন্দ্র বাবু যে এক্ষেত্রে অসত্য কথা বলছেন তা বেশ বুঝা যায়। তিনি হয়ত অন্য কোন কারণে যেমন আনারস চাষ বা বৃক্ষ রোপণ; বন্দোবস্থ নিয়ে থাকতে পারেন। এক্ষেত্রে তার লিজ পেপার দেখলে প্রকৃত সত্য জানা যাবে। স্থানীয় প্রশাসন যেহেতু পাথর আহরণকে অবৈধ বলে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন তার পর ব্রজেন্দ্র সিংহের সাফাই’র আর কোন অর্থ থাকতে পারে না। এমতাবস্থায় স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব হলো নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পাথর আহরণের জন্য ব্রজেন্দ্র সিংহ সহ অন্য সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া। আমরা জানি না প্রশাসন এই কাজটি দ্রুত সম্পাদন করে কথিত অবৈধ কর্মকা-টি বন্ধ করবেন কিনা।
গতকালের সংবাদ থেকে জানা যায় ধনীটিলায় একটি মসজিদ, স্কুল, বিজিবির হ্যালিপেড, ঈদগাহ, ক্লাবঘর ও মন্দির এমন বেশকিছু স্থাপনা রয়েছে। পাথর আহরণের ফলে এইসব স্থাপনা ক্রমশ হুমকির সামনে পড়ে গিয়েছে বলে আশংকা স্থানীয়দের। এছাড়া টিলায় বা টিলার পাদদেশে গড়ে উঠা প্রাচীন মনিপুরি বসতিগুলো পাহাড় ধসের শিকার হয়ে বিলীন হয়ে যেতে পারে। এই আশংকা থেকেই স্থানীয় অধিবাসীরা অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধের জন্য ক্রমাগত বিভিন্ন মহলে ধর্না দিয়ে চলেছেন। এরকম বাধা দেয়ায় স্থানীয় অধিবাসী অনন্তমনি সিংহ নামক এক ব্যক্তি পাথরখেকোদের ভয়ে নাকি এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে আছেন। ধনিটিলা এলাকাটি মনিপুরি অধ্যূষিত একটি আদিবাসী এলাকা। আদিবাসীরা বৈচিত্রময় বাংলাদেশের নৃতাত্ত্বিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। এই বসতি টিকিয়ে রাখা আমাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্রময়তার জন্য জরুরি। কিন্তু কিছু মানবসৃষ্ট প্রকৃতি ধ্বংসের কারণে যদি আবহমান কালের এই মনিপুরি বসতিটি তার চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলে তা হলে সেটি হবে চরম দুঃখজনক। স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনিকে মামুলি ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী ব্যবস্থা গ্রহণের দিকে অগ্রসর হতে হবে। আমরা জানি এখন সামাজিক অপরাধীরা নানাভাবে প্রভাবশালী ও দাপুটে হয়ে থাকে। কিন্তু আমরা এও বিশ্বাস করি আইনের থেকে কারও হাতই লম্বা নয়, নাকও উঁচু নয়। আইনের যথাযথ প্রয়োগ ঘটলে ঐতিহ্যবাহী এই জনপদে সংঘটিত হতে থাকা বেআইনি কর্মকা-টি বন্ধ করতে সময় বেশি লাগার কথা নয়। ছাতকের উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাছির উল্লাহ খান যেমনটি বলেছেন, যদি কেউ চোরাইপথে পাথর উত্তোলনের চেষ্টা করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমরা উপজেলার প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের এই প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়ন দেখতে চাই।