বাল্যবিয়ে আমাদের সমাজ জীবনের এক ভয়ানক ব্যাধি। কন্যা সন্তান হলেই সাবালকত্ব অর্জনের আগে তার বিয়ে দিয়ে দিতে পাগল হয়ে যান অভিভাবকরা। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এই প্রবণতা অনেক বেশি। সরকার আইন করে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ে নিষিদ্ধ করেছেন। অর্থাৎ এর কম বয়সী মেয়েদের বিয়ে বাল্যবিয়ে হিসাবে বিবেচিত হবে যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু সরকার আইন করলেও গোপনে এরকম বাল্যবিয়ে হরহামেশাই হয়ে চলেছে। মাঝেমধ্যে কিছু অগ্রগামী মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তির উদ্যোগে এরকম বিয়ে প্রতিহত করা সম্ভব হয়। তবে তার পরিমাণ খুবই কম। অনেক সময় প্রশাসনিক উদ্যোগের ফলে বিয়ে ভেঙে গেলেও অল্পদিনের ব্যবধানে ওই বিয়েটি আবার হয়ে যায়। সমাজ গ্রহণ না করলে আইন দিয়ে যে কোনো প্রথা বন্ধ করা যায় না আমাদের সমাজে অবাধে বাল্যবিয়ের ঘটনা এর প্রমাণ। অসচেতন সমাজ-মানসকে পরিবর্তন ভিন্ন এর অন্য কোনো সহজ পথ খোলা নেই। এরকম এক প্রেক্ষাপটে আলোর ঝলকানির মতো একটি খবর দেখা গেল গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে। এক সাহসী বালিকা নিজেই নিজের বিয়ে আটকে দেয়ার মতো এক কা- ঘটিয়ে বসেছে। নবম শ্রেণির ওই ছাত্রিটি তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের অধিবাসী। তার বিয়ে ঠিক ছিলো শুক্রবার। এই অবস্থায় সে সমাজসেবা অধিদপ্তরের হটলাইন নম্বর ১০৯৮ এ কল করে এই বিয়ে আটকানোর অনুরোধ জানায়। কলসেন্টার থেকে তাৎক্ষণিকভাবে তাহিরপুর উপজেলার সমাজসেবা কর্মকর্তাকে জানিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। এরপর প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে মেয়েটির অভিভাবকরা বিয়ে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। আপাতত মেয়েটি বেঁচে গেল। তবে কতদিন এভাবে সাহসী মেয়েটি নিজেকে রক্ষা করতে পারবে আমরা জানি না। এই সাহস ও সচেতনতা দেখানোয় তাকে আমাদের অনেক অভিনন্দন। এই সাহস তার এসেছে এক অদম্য সংকল্প থেকে যে সংকল্প নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রামের সাথে সম্পর্কিত। আমাদের বিশ্বাস এই সংকল্পই তাকে রক্ষা করবে।
ওই মেয়েটির অভিভাবকদের উদ্দেশ্য আমরা শুধু বলতে চাই, আপনাদের মেয়ে পড়াশোনা করে নিজের যোগ্যতায় একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলতে চায়। মেয়েটি যখন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে তখন এই সুনামের ভাগীদার হবেন আপনারাও। তার গর্বিত পরিচয়ে গৌরবান্বিত হবে পুরো পরিবার। সুতরাং তাঁকে এই অপরিণত বয়সে বিয়ে দিয়ে তার সম্ভাবনাকে নষ্ট করবেন না দয়া করে। মেয়ে হলেও সে মানুষ, এই বিবেচনাবোধ খাটান। তাকে পরিবারের বোঝা মনে করবেন না। এখনকার যুগে ছেলে-মেয়ে কোনো প্রভেদ নেই। অনেক ক্ষেত্রে মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় বরং এগিয়ে গেছে। নারীদের এই অগ্রগতিকে মেনে নিন এবং ছেলে-মেয়ে নিয়ে যে বৈষম্যবোধ মগজে গেঁথে আছে তাকে ঝেড়ে ফেলুন। দেখবেন এক ছেলে যেমন তার পরিবারের ভরসা হয় তেমনি এক মেয়েও অনুরূপ বা এর চাইতে বেশি ভরসাস্থল হয়ে উঠতে পারে।
অপরিণত বয়সে ছেলে-মেয়ের বিয়ে দিলে শারীরিক-মানসিক-সামাজিক কী ধরনের সমস্যা হয় প্রচার প্রচারণার কারণে আমরা তা জানি। কেন নিজের সন্তানকে এমন ভয়ানক অবস্থায় ঠেলে দিব আমরা? সন্তান তো অতি আদরের। তার সবধরনের বিকাশের সহযোগী হওয়া উচিৎ অভিভাবকদের। কে বলতে পারে তার ভিতর কোন্ অমিত সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সম্ভাবনার দরোজা বন্ধ করে না দেয়ার মতো এক স্বাস্থ্যবান সমাজ মানস আমাদের কাম্য। এজন্য ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে যে অন্ধবিশ্বাস ও অপ-ধারণা রয়েছে তা দূর হওয়া দরকার। এই কাজে নেতৃত্ব দিতে হবে সমাজের অগ্রসর অংশকে। সামনে আমরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে প্রবেশ করার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছি। ওই প্রস্তুতির সাথে বাল্যবিয়ে সহ আরও কিছু সামাজিক কুপ্রথা বড় প্রতিবন্ধকতা। এই কুপ্রথাগুলো আমাদের জাতীয় বিকাশের সম্ভাবনাকে পিছিয়ে দিবে। সুতরাং সামাজিক অন্ধত্বের বিরুদ্ধে সামাজিক লড়াই জারি রাখতে হবে ঠিক ওই সাহসী মেয়েটির মতো।